পাক-তুরস্ক-কাতার ‘জোটে’ দিল্লি থেকে ব্রহ্মস কেনা ইন্দোনেশিয়া! মুনিরের মাস্টারস্ট্রোক? না কি নেপথ্যে অন্য অঙ্ক?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির দু’মাসের মাথায় ফের নতুন সামরিক সমঝোতায় সই করল পাকিস্তান। এতে রয়েছে তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া। ইসলামাবাদের এ-হেন পদক্ষেপে চাপ বাড়ল নয়াদিল্লির?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পর বদর সমঝোতা। একের পর এক সামরিক জোটের সদস্যপদ নিয়েই চলেছে পাকিস্তান। ‘শুঁড়ির সাক্ষী মাতালের’ মতো ইসলামাবাদের সঙ্গী তুরস্কও। এ বার তাদের দলে ভিড়ল বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়া! তাদের আবার ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করছে ভারত। ফলে, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ভুরু কুঁচকোচ্ছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।
চলতি বছরের অগস্টে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। এই সমঝোতা অনুযায়ী, তিন দেশের মধ্যে কারও উপর বহিঃশত্রুর হামলা হলে, তাকে যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করবে সব পক্ষ। আর তাই সংশ্লিষ্ট জোটের নাম ‘ইসলামীয় নেটো’ দিয়েছে পশ্চিমি গণমাধ্যম। মক্কা চুক্তির দু’মাসের মাথায় সামরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বদর সমঝোতা স্মারকে সই করল ইসলামাবাদ।
গত ২১ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সামিল হয় চারটি রাষ্ট্র। আলোচনা শেষে একটি মউ-তে (মেমর্যান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই করে তারা, যার পোশাকি নাম বদর। এতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ, তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলার, কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুল রহমান এবং ইন্দোনেশিয়ার উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউসুফ জৌহারি।
মউ সই হওয়ার পর যৌথ বিবৃতিতে চারটি রাষ্ট্র জানিয়েছে, ‘‘আরবি ভাষায় বদর শব্দটির অর্থ হল পূর্ণিমা। এই স্মারক সমঝোতায় অংশগ্রহণকারী সকল সদস্যই একে অপরের পরিপূরক। এর উল্লেখ্যযোগ্য সামরিক ও আর্থিক গুরুত্ব রয়েছে।’’ সমঝোতাটির মূল্য লক্ষ্য সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও গবেষণায় সহযোগিতা ও সম্প্রসারণ বলে জানানো হয়েছে। ফলে বিষয়টি নয়াদিল্লির জন্য চিন্তার।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, বদর কোনও সৈন্যচুক্তি নয়। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষাশিল্প সম্প্রসারণের নীল নকশা ছকে ফেলেছে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া। ফলে, আগামী দিনে অত্যাধুনিক লড়াকু জেট, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের গবেষণা ও বাণিজ্যিক উৎপাদন যৌথ ভাবে করতে দেখা যেতে পারে তাদের। পাশাপাশি, হাতিয়ার প্রযুক্তির দেওয়া-নেওয়া যে এই চার রাষ্ট্রের মধ্যে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
আরও পড়ুন:
কাতার ও তুরস্ক আবার আলাদা করে এই মউয়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছে। দোহার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, বদর সমঝোতা স্মারকের উপর ভিত্তি করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াবে তারা। এ ব্যাপারে কারিগরি সহায়তা, অত্যাধুনিক হাতিয়ারের গবেষণা ও নির্মাণ এবং আধুনিক সামরিক ব্যবস্থা বিবর্তনের উপযোগী শিল্প-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অন্য দিকে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পতালুকের চেয়ারম্যান হালুক গোরগুন বলেছেন ‘‘বদর মউ যৌথ উৎপাদন ও সামরিক প্রযুক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করতে চলেছে। এই সমঝোতা স্মারকটি দোহা, ইসলামাবাদ, জাকার্তা ও আঙ্কারার পরিপূরক সক্ষমতাগুলিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তরিত হতে সাহায্য করবে।’’ তবে এর আওতায় সুনির্দিষ্ট কোনও হাতিয়ার বা প্রযুক্তি রাখা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটোর সদস্যপদ রয়েছে তুরস্কের। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম ফৌজের অধিকারী আঙ্কারা। অন্য দিকে, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধি কাতারের টাকার অভাব নেই। এ ছাড়া, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির গবেষণা ও উৎপাদনে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ইন্দোনেশিয়া। আর পাকিস্তানের হাতে আছে শ্রমিক।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই বদর মউতে সই করেছে চার মুসলিম রাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কাতারি গণমাধ্যম ‘আল জাজ়িরা’র কাছে মুখ খুলেছেন সামরিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘মারগেন অ্যানালিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরদা মেভলুতোগলু। তাঁর কথায়, ‘‘স্মারক সমঝোতাটি একটা সরবরাহ শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠা করবে, যার উপর দাঁড়িয়ে যৌথ ভাবে হাতিয়ার উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব।’’
আরও পড়ুন:
বদর মউ কী ভাবে কাজ করবে, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘মিডল ইস্ট আই’। তাদের দাবি, স্মারক সমঝোতায় সই করা চারটি দেশই পৃথক ভাবে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় নিজেদের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করবে। দ্বিতীয় ধাপে ঠিক হবে কোন কোন সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রের যৌথ গবেষণা ও উৎপাদন সম্ভব। সব শেষে সেই তালিকা যাবে ‘এগ্জ়িকিউটিভ বোর্ড’-এর কাছে।
হাতিয়ারের যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনের তালিকা ঠিক হলে ব্যয় বরাদ্দ ধার্য করবে মউ-তে সই করা চার দেশ। এর পর ‘কৌশলগত পর্ষদ’ তাতে সবুজ সঙ্কেত দিলে শুরু হবে কাজ। সূত্রের খবর, গোড়ার দিকে তুরস্কে তৈরি হতে পারে যৌথ উৎপাদনকেন্দ্র। কারণ, চার সদস্যের মধ্যে আঙ্কারার প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোকেই সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী। ভূ-রাজনীতির নিরিখে অত্যন্ত কঠিন সময়ে চুক্তিটি হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল। এর জেরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ। এ ছাড়া, ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে, আমেরিকার সামরিক ছাতার তলায় থেকেও নিজেদের সুরক্ষিত ভাবতে পারছে না কুয়েত, কাতার বা জর্ডনের মতো আরব রাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের দাবি, সেই কারণেই বিকল্প হিসাবে পশ্চিম এশিয়ায় গড়ে উঠছে নতুন সামরিক জোট। মক্কা চুক্তি বা বদর সমঝোতা এর মধ্যে অন্যতম। যদিও এই দু’টির মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটিতে আছে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু, দ্বিতীয়টিতে কোনও সৈন্য সহযোগিতার কথা বলা হয়নি। বরং এতে যৌথ প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উৎপাদনে জোর দিয়েছে চার সদস্য রাষ্ট্র।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, বদর সমঝোতায় দু’ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভারত। প্রথমত, এর মাধ্যমে অত্যাধুনিক হাতিয়ার পাওয়ার সুযোগ পাবে পাকিস্তান। বর্তমানে অস্ত্রের ব্যাপারে ইসলামাবাদ অনেকটাই চিনের উপর নির্ভরশীল। গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’কে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংঘাতে সেগুলির পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় সেই ঘটাতি পূরণের স্বপ্ন দেখছে রাওয়ালপিন্ডি।
দ্বিতীয়ত, এ বছরের জুলাইয়ে ভারতের সঙ্গে ৬৩ কোটি ডলারের একটি হাতিয়ার চুক্তি করে ইন্দোনেশিয়া। আগামী দিনে জাকার্তাকে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং অস্ত্র আকাশ থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে নয়াদিল্লি। অনেকেরই আশঙ্কা বদর সমঝোতার জন্য এগুলির তথ্য পাকিস্তান বা তুরস্কের সঙ্গে আদান-প্রদান করতে পারে মলাক্কা প্রণালীর কোলের ওই দ্বীপরাষ্ট্র। সেটা জাতীয় সুরক্ষায় বিপজ্জনক।
যদিও এই যুক্তি মানতে নারাজ ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও-র (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানেইজ়েশন) ইমেরিটাস চেয়ারম্যান ও ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেডের সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও সুধীরকুমার মিশ্র। তাঁর কথায়, ‘‘পর্যাপ্ত সুরক্ষার মাপকাঠির মধ্যেই জাকার্তার সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি করা হয়েছে। তারা শুধু ব্যবহারের নির্দেশিকা পাবে। ইন্দোনেশিয়াকে কোনও প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হচ্ছে না।’’
প্রসঙ্গত, আরব উপদ্বীপে মুসলিমদের প্রথম দিকের সংঘর্ষের মধ্যে অন্যতম হল বদরের যুদ্ধ। তাতে জয়ী হন ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মহম্মদ। ফলে ওই এলাকায় দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করে এই ধর্ম। ১৯৭৩ সালে ইয়মকিপ্পুর যুদ্ধে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে মিশরীয় সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন বদর’। ১৯৯৯ সালেও একই নামে কার্গিলে ফৌজি অভিযান চালায় পাকিস্তান। মউতে সেই নামটিই ব্যবহার হওয়ায় চিন্তিত পর্যবেক্ষক মহল।