বছরে গড়ে ৬৭ লক্ষ শিশুর জন্ম, নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধেই এ বার ‘যুদ্ধে’ নামছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনির!
পাকিস্তানের অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে এ বার আসরে নামলেন সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। কী ভাবে জন্মহার কমাবেন তিনি?
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ফের ‘পদোন্নতি’! এ বার তাঁর কাঁধে দেশের অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঠেকানোর দায়িত্ব তুলে দিল শাহবাজ় শরিফের সরকার। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত ঘোষণা করেন ইসলামাবাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সৈয়দ মুস্তফা কামাল। গত এক বছরে ক্ষমতা বাড়িয়ে যে ভাবে প্রশাসন কব্জায় মেতেছেন তিনি, তাতে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশে সামরিক শাসন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করা হচ্ছে।
পাক গণমাধ্যম দ্য ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ের গোড়ায় সিনেটের বৈঠকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মুনিরকে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল। ভারত, ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসলামাবাদের পার্লামেন্ট ‘মজলিস-ই-শোরা’ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। তারই উচ্চকক্ষের নামে সিনেট। নিম্নকক্ষটি জাতীয় পরিষদ বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি নামে পরিচিত।
এ-হেন সিনেটে শাহবাজ় সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে ২৫.৯০ কোটিতে পৌঁছেছে পাকিস্তানের জনসংখ্যা। এটি বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ। পরিস্থিতির বদল না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে ছাপিয়ে দুনিয়ার চতুর্থ জনবহুল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী। সেটা আর্থিক সঙ্কটে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের জন্য একটি জনতাত্ত্বিক বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই হবে না।
কামালের কথায়, ‘‘সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেই কারণে প্রশাসনের প্রতিটা স্তরে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।’’ জানা গিয়েছে, এই জটিল পরিস্থিতিতে ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন শাহবাজ়। প্রধানমন্ত্রীর মুঠোবন্দি ডিভাইসের কললিস্টের একেবারে শুরুতেই রয়েছে তাঁর নাম। এর পরই গোটা বিষয়টিতে শিলমোহর দেয় ইসলামাবাদের প্রশাসন।
দ্য ডন জানিয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে একটি কমিটি তৈরি করছেন শাহবাজ়। ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে তার সদস্য করা হয়েছে। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ট্রোলিং। বিষয়টিতে মুখ খুলেছেন জনপ্রিয় পাক সাংবাদিক আসাদ তুর। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যও যদি ফিল্ড মার্শালকে ডাকতে হয়, তা হলে সরকারের বাড়ি চলে যাওয়া উচিত।’’
আরও পড়ুন:
সমাজমাধ্যমের এই ট্রোলিংকে অবশ্য একেবারেই পাত্তা দিচ্ছে না পাক সরকার। উল্টে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে ইসলামাবাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রক। ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশে বছরে গড়ে ৬৭ লক্ষ শিশুর জন্ম হয়। কামালের দফতর মনে করে, গর্ভনিরোধক পণ্যের অভাব থাকার জেরেই ঘটছে এই ঘটনা। ফলে আগামী দিনে সেখানে কর ছাড়ের প্রস্তাব করতে পারে মুনিরের কমিটি।
দ্বিতীয়ত, পাক সরকারের রাজস্ব বণ্টন নীতির সঙ্গেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পৃক্ত। বর্তমানে জনসংখ্যার ভিত্তিতেই ৮০ শতাংশ সম্পদ প্রদেশগুলির মধ্যে বিলি করে থাকে ইসলামাবাদ। এর জেরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আমজনতাকে উৎসাহ দিয়ে থাকে প্রাদেশিক সরকার। এই নিয়মের বদল ঘটিয়ে ৫০ শতাংশের নীচে রাজস্ব বণ্টনের প্রস্তাব করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল। যদিও বিষয়টিতে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি শাহবাজ় প্রশাসন।
বিশ্লেষকদের দাবি, রাজস্ব বণ্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া ফিল্ড মার্শাল মুনিরের পক্ষে একেবারেই সহজ নয়। কারণ, চার প্রদেশের মধ্যে পাক পঞ্জাব সর্বাধিক জনবহুল। শুধু তা-ই নয়, এলাকাটি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়ের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন মরিয়ম নওয়াজ়। সম্পর্কে তিনি শাহবাজ়ের ভাইঝি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে।
পাক রাজনীতিতে পঞ্জাবের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই প্রদেশটিতেই লাহোর, ইসলামাবাদ এবং রাওয়ালপিন্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলি অবস্থিত। রাওয়ালপিন্ডিকে তাদের সামরিক বাহিনীর প্রাণকেন্দ্র বলা যেতে পারে। তা ছাড়া গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এবং প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সদর দফতরও গড়ে উঠেছে পাক পঞ্জাবে। আর তাই সেখানকার রাজস্ব হ্রাসের ফল হিতে বিপরীত হতে পারে।
আরও পড়ুন:
গত বছরের (২০২৫ সাল) মে মাসে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে জঙ্গি হামলার বদলা নিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানে নামে ভারত। এর সাঙ্কেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। ফলে চার দিনের ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ। এই সংঘাত পর্বে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পশ্চিমের প্রতিবেশীর ১১টি বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে এ দেশের ফৌজ। ফলে তড়িঘড়ি সংঘর্ষবিরতিতে বাধ্য হয় পাক সরকার।
‘অপারেশন সিঁদুর’ থামার কয়েক দিনের মাথায় জেনারেল থেকে ফিল্ড মার্শালে পদোন্নতি হয় মুনিরের। ২০২৫ সালের ২০ মে ইসলামাবাদের দ্বিতীয় সেনাপ্রধান হিসাবে সেটা অর্জন করেন তিনি। এর পরই দেশের বিদেশনীতিতে ‘নাক গলাতে’ দেখা যায় তাঁকে। সেখানে অবশ্য ভালই সাফল্য পেয়েছেন মুনির। তাঁর হাত ধরেই আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সক্ষম হয় পাকিস্তান। বহু বার প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বছরের (২০২৫) ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সেনাসর্বাধিনায়ক বা চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) হিসাবে মুনিরকে নিয়োগ করেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জ়ারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়। ফলে পাঁচ বছরের জন্য ফৌজের তিন শাখার নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যান তিনি। বাহিনীর পরমাণু হাতিয়ারও রয়েছে তাঁরই হাতে। অর্থাৎ সব দিক থেকে ফিল্ড মার্শালকেই ইসলামাবাদের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বললে অত্যুক্তি হবে না।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সারে পাকিস্তান। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুই দেশের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। আরব রাষ্ট্রটির সঙ্গে এই সমঝোতার নেপথ্যেও ফিল্ড মার্শাল মুনিরের হাত আছে ষোলো আনা।
গত বছরের অক্টোবরে প্যালেস্টাইনের গাজ়ায় শান্তি ফেরাতে মিশরের শার্ম আল শেখে হওয়া সম্মেলনে সই হয় চুক্তি। দুঁদে কূটনীতিকের মতো তারও অংশ হন ফিল্ড মার্শাল মুনির। প্যালেস্টাইনের ওই এলাকায় সেনা পাঠানোর কথাও বলতে শোনা যায় তাঁকে। যদিও এ ব্যাপারে ইজ়রায়েল আপত্তি তোলায় পরিকল্পনাটি সে ভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও এর জেরে ট্রাম্পের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয় তাঁর সম্পর্ক।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা যৌথ ভাবে ইরানে হামলা চালালে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। সেই লড়াই থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করে পাকিস্তান। দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থাও হয় ইসলামাবাদে। এর মূল কারিগর ছিলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। যদিও তাতে সংঘাত থেমেছে, এমনটা নয়।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কঠিন সময়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুদায়িত্ব হাতে পেলেন মুনির। গত দেড় বছর ধরে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে তাঁর ফৌজ। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ঘন ঘন হামলা চালাচ্ছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামের এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। পকিস্তানের থেকে ওই এলাকা পৃথক করার দাবি তুলেছে তারা।
এ ছাড়া বালোচিস্তান প্রদেশে তীব্র আকার ধারণ করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সেখানেও বালোচ লিবারেশন আর্মির হামলায় ঘন ঘন প্রাণ হারাচ্ছে পাক ফৌজ। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো সম্প্রতি উত্তাল হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর বা পিওকে। সরাসরি ভারতের সাহায্য চেয়ে সুর চড়িয়েছে সেখানকার আমজনতা। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আর্থিক ভাবেও বেহাল ইসলামাবাদ।
বর্তমানে বছরে ২.৫৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাকিস্তানের জনসংখ্যার সূচক। বিশ্লেষকদের দাবি, এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে আগামী দিনে সম্পদের নিরিখে আমজনতার ধারণক্ষমতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হবে ইসলামাবাদ। আর সেটা হলে সৌদি আরব এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের (আইএমএফ) ঋণে চলা পশ্চিমের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মহাবিপর্যয় আসতে পারে। দেশ বাঁচাতে ফিল্ড মার্শাল মুনির কোনও কঠোর পদক্ষেপ করেন কি না, সেটাই এখন দেখার।