লন্ডভন্ড দেশ, ব্যাপক ক্ষতি ‘কফি অ্যাক্সিসে’! চারদিকে হাহাকার, কোলোম্বিয়ার ভূমিকম্পে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকায় এখন শুধুই স্বজনহারাদের কান্নার রোল। হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা চলছে অনেকের। যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন, তাঁদের খাবার, পানীয় জল ও ওষুধ সরবরাহ করার কাজে লেগেছেন উদ্ধারকর্মীরা।
লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে কোলোম্বিয়ার ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া অবধি মৃতের সংখ্যা ১৩০-এর গণ্ডি পার করেছে। আহত প্রায় ৬০০।
মৃত এবং আহতের সংখ্যা— দুই-ই আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোমবারের ভূমিকম্পে বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর।
ইউএস জিয়োলজিক্যাল সার্ভের বিবৃতি অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ ৭.৪ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কোলোম্বিয়া। রাজধানী বগোটার পশ্চিমে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার অন্দরে স্যান হোসে দে পামার এলাকায় মাটির প্রায় ১০৭ কিলোমিটার নীচে এই কম্পনের উৎস।
তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, পড়শি দেশ পানামা এবং ইকুয়েডরেও ভূকম্পন অনুভূত হয়। যদিও ওই দুই দেশে খুব একটা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের কারণে ধসে পড়েছে কোলোম্বিয়ার বহু ঘরবাড়ি। প্রশাসনের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নীচে বহু মানুষ চাপা পড়ে রয়েছেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতার সঙ্গে শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ।
আরও পড়ুন:
ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকায় এখন শুধুই স্বজনহারাদের কান্নার রোল। হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা চলছে অনেকের। যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন, তাঁদের খাবার, পানীয় জল ও ওষুধ সরবরাহ করার কাজে লেগেছেন উদ্ধারকর্মীরা।
ভূমিকম্পের কবলে পড়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে পশ্চিম কোলোম্বিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অনেক ঘরবাড়ি, দোকান। ভূমিকম্পে তছনছ বিস্তীর্ণ এলাকা। ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে রাস্তার উপর।
ভূমিকম্পের উৎসস্থলের কাছাকাছি অঞ্চলে প্রচুর বাড়ি ভেঙে পড়েছে বলে খবর। অনেকেই বাড়িঘর হারিয়ে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন, পর্যাপ্ত খাবার এবং জলও পাওয়া যাচ্ছে না বহু এলাকায়।
সেই ধ্বংস এবং অসহায়তার অনেক ছবি ও ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। সে সব দেখে উদ্বেগ এবং শোক প্রকাশ করেছেন অনেকে।
আরও পড়ুন:
ঘরবাড়ি হারানো মানুষের অসহায়তার কয়েকটি ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে হাল ছাড়তে রাজি নন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে হাত লাগিয়েছেন স্থানীয়েরাও। ধ্বংসস্তূপের নীচে কেউ চাপা পড়ে রয়েছেন কি না সেই খোঁজও চলছে।
রিখটার স্কেলে পশ্চিম কোলোম্বিয়ার ভূমিকম্পে কম্পনের মাত্রা ছিল প্রায় ৭.৪। আর তীব্র সেই কম্পনে বিপর্যয় নেমে এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে। লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে দেশের পশ্চিম প্রান্তের বিস্তীর্ণ অংশ। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে আরও অনেকে, ঘরছাড়া বহু। মৃত অন্ততপক্ষে ১৩০।
কোলোম্বিয়া প্রশাসন জানিয়েছে, ভূকম্পনের জেরে রিজারআল্ডা ডিপার্টমেন্টের পেরেইরা এলাকায় প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ভ্যালে ডেল কওকা ডিপার্টমেন্টে ২৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ম্যানিজ়েলস শহরে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ক্যালি এবং পেরেইরা। একে একবিংশ শতাব্দীতে দেশের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প বলে দাবি করেছে কোলোম্বিয়ার ভূবিজ্ঞান দফতর। এই দুই শহরে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে।
ক্যালি শহরে একটি বড় হাসপাতাল ভেঙে পড়েছে। ফলে বহু রোগী সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। শহরের ৩০ শতাংশ হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু হাসপাতালই নয়, স্কুল, কলেজ এবং সরকারি ভবনগুলিও গুঁড়িয়ে গিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ঘরবাড়িগুলিরও। প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, ১৫৭৭টি বড় এবং ছোট বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যে অন্তত ৩৭টি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে গিয়েছে।
সে দেশের ভূমিবিজ্ঞান দফতর জানিয়েছে, কম্পনের পর ২১ বার ‘আফটারশক’ হয়েছে। এই বিপর্যয়ের জেরে পশ্চিম কোলোম্বিয়ায় বিমান পরিষেবা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। পেরেইরা এবং ক্যালি ছাড়াও বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চোকে এবং কফি অ্যাক্সিস অঞ্চলে। সোমবারের এই কম্পনে ২০০০ জন নিখোঁজ বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
ভূমিকম্পের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে কোলোম্বিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল চোকোতেও। এর ফলে দেশটির ‘কফি অ্যাক্সিস’ (কফি উৎপাদনকারী প্রধান অঞ্চল) এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চোকোর জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন।
এ ছাড়াও ওই অঞ্চলের বিশাল অংশে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রিসারালদা অঞ্চলেও ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে ভূমিকম্প।
উল্লেখ্য, কম্পনের উৎসস্থল স্যান হোসে দে পামার এলাকাটি প্রশান্ত মহাসাগরের কুখ্যাত ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থান করার ফলে মহাসাগরকে ঘিরে থাকা ওই বলয়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকাগুলির মধ্যে একটি। কোলোম্বিয়া প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী এটি গত এক দশকে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।