আস্ত আগ্নেয়গিরি থেকে মাঠ, সমুদ্রের নীচে গুহা! কাতারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রাসাদ আয়তনে ভ্যাটিকানের চেয়েও বড়
কাতারের রাজপরিবারের এক সদস্য ৩৯ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারে ইউরোপে এমন একটি ভিলা কিনেছেন, যা আয়তনে ভ্যাটিকান সিটির চেয়েও বড়। সার্ডিনিয়ায় অবস্থিত এই বিশাল ভিলায় আছে ১২৬টি বিলাসবহুল কক্ষ, রিমোটচালিত কৃত্রিম আগ্নেয়গিরি! ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে সমুদ্রের নীচে গোপন আস্তানাও নাকি রয়েছে সে বাড়িতে।
ভূমধ্যসাগরের বুকে ইটালির সার্ডিনিয়া দ্বীপ। সাদা বালির এই দ্বীপেই রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে জমকালো এবং বিলাসবহুল প্রাসাদ। আয়তনে তা গোল দেবে গোটা ভ্যাটিকান সিটিকেই। নাম ‘ভিলা চের্তোজ়া’। দাম ৩৯ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩৮০০ কোটি টাকা।
তবে কেবল আকাশছোঁয়া দাম আর বিশাল আয়তনই নয়, সার্ডিনিয়ায় অবস্থিত এই বিলাসবহুল প্রাসাদ ঘিরে শোরগোল পড়ে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একটি আগ্নেয়গিরি। প্রাসাদের মধ্যে রয়েছে সেই রিমোটচালিত কৃত্রিম আগ্নেয়গিরি। আর রয়েছে সমুদ্রের তলদেশে একটি গুহা। এর অবস্থান ভিলার অভ্যন্তরে। দাবি করা হচ্ছে, প্রাসাদটি আয়তনে ভ্যাটিকান সিটির চেয়েও বড়। ১২০ হেক্টর জমির উপর নির্মিত এই প্রাসাদে রয়েছে ১২৬টি কক্ষ, সুইমিং পুল, ফুটবল মাঠ এবং অন্যান্য বিলাসিতার মাধ্যম।
সম্প্রতি ইউরোপের এই অন্যতম বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল ‘প্রাইভেট এস্টেট’-এর মালিকানা পেয়েছেন কাতারের রাজপরিবারের অন্যতম ধনী সদস্য শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি। তিনি ‘এইচবিজে’ নামেই বেশি পরিচিত। ইটালির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বালাস্কিনির কাছ থেকে সার্ডিনিয়ার এই বিশাল ‘ভিলা চের্তোজ়া’ ভারতীয় মুদ্রার হিসাবে প্রায় ৩৮০০ কোটি টাকায় কিনে নিয়েছেন কাতারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচবিজে।
উভয় দেশের দুই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রায় ৩৮০০ কোটি টাকা মূল্যের এই চুক্তি বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। এর কারণ কেবল বাড়িটির দামই নয়, বরং তার অসাধারণ এবং চোখধাঁধানো সব বৈশিষ্ট্য। এই বিশাল প্রাসাদে রয়েছে একটি কৃত্রিম আগ্নেয়গিরি, ফুটবল খেলার মাঠ, সাতটি সুইমিং পুল, ১২৬টি কক্ষ এবং বিশাল একটি বাগান। এমনকি ড্রোন হামলার হাত থেকে বাঁচতে বাড়ি সংলগ্ন সমুদ্রের নীচে একটি গোপন গুহাও রয়েছে বলে খবরে প্রকাশ।
কিন্তু কে এই শেখ হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি? ৬৬ বছর বয়সি এই ধনকুবের ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাতারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী কালে তিনি ‘কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি’ (কিউআইএ)-র প্রধান হন।
আরও পড়ুন:
ফোর্বসের তথ্য বলছে, শেখ হামাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ টাকার হিসাবে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি। তিনি পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তি। দীর্ঘ সময় ধরে বিলাসবহুল রিয়্যাল এস্টেট, হোটেল এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের এক বিশাল এবং আকর্ষণীয় তালিকা গড়ে তুলেছেন কাতারের রাজপরিবারের ধনীতম সদস্য।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, শুরুতে এই সম্পত্তির দাম চাওয়া হয়েছিল ৫০০০ কোটি টাকা। পরে দাম কমানো হয়। দাম কমিয়ে কেনার পরেও, এই প্রাসাদটি ইউরোপের অন্যতম ব্যয়বহুল ব্যক্তিগত বাসভবন হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিলাসবহুল এই প্রাসাদের দেখভাল করতে প্রতি বছর খরচ হয় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। সেখানে এইচবিজে যে দামে এই প্রাসাদটি কিনেছেন, তা ‘সামান্য’ বলেই দাবি করছেন সমালোচকেরা।
এর নিয়মিত খরচের মধ্যে রয়েছে বার্ষিক প্রায় ১৪০০ কোটি টাকার বিদ্যুতের বিল। এ ছাড়া, জল সরবরাহের জন্য নিজস্ব জল বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, বাগান এবং অতিথিশালাগুলির দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের খরচও রয়েছে।
আরও পড়ুন:
সার্ডিনিয়ার কোস্টা স্মেরাল্ডায় অবস্থিত ‘ভিলা চের্তোজ়া’ প্রায় ১২০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা আয়তনে ভ্যাটিকান সিটির চেয়েও বড়। এই বিশাল প্রাসাদের আয়তন প্রায় ৮৩টি প্রমাণ মাপের ফুটবল মাঠের সমান।
প্রাসাদের মূল ভবনটিই ৪,৫০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে রয়েছে ১২৬টি কক্ষ। প্রখ্যাত ইটালীয় স্থপতি জিয়ান্নি গামন্ডি বাড়িটির নকশা তৈরি করেছেন। মূল ভবনের পাশাপাশি রয়েছে অতিথিদের জন্য পৃথক থাকার ব্যবস্থা, গ্রিন হাউস এবং বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রচুর ‘প্রাইভেট রিসর্ট’। অসাধারণ বিলাসিতার বৈশিষ্ট্যের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে প্রাসাদটি।
এর মধ্যে রয়েছে সাতটি সুইমিং পুল, ফুটবল মাঠ, টেনিস কোর্ট, বোচি কোর্ট, ব্যক্তিগত গল্ফ কোর্স, বিলাসবহুল স্পা, গ্রিক শৈলীর অ্যাম্ফিথিয়েটার, হেলিপ্যাড। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল একটি থ্যালাসোথেরাপি কমপ্লেক্স, যেখানে সুস্থতা এবং বিশ্রামের জন্য সমুদ্রের জলভর্তি পাঁচটি পরস্পর-সংযুক্ত পুল রয়েছে। এ ছাড়া, এই চত্বরে রয়েছে দু’টি কৃত্রিম হ্রদ—‘পাম লেক’ এবং ‘বায়ো লেক’। সেখানে ভাসমান দ্বীপ, রাজহাঁস এবং এমনকি একটি ভাসমান ‘টিকি বার’-এর ব্যবস্থাও রয়েছে।
এর অন্যতম এবং ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য সমুদ্রের নীচে পাথরে খোদাই করা একটি গোপন গুহা। শোনা যায়, একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ দিয়ে নৌকায় করে এখানে পৌঁছোতে হয়। এর ফলে বাইরের কারও নজর এড়িয়েই সেখানে প্রবেশ করা যায়।
বালাস্কিনির মালিকানাধীন থাকার সময়ে এই প্রাসাদটিতে একটি পরমাণু হামলা প্রতিরোধ করতে পারে এমন বাঙ্কারও তৈরি করা হয়েছিল। শোনা গিয়েছে, সেটি প্রাসাদের নীচে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের তালিকায় রয়েছে কৃত্রিম আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ব্যবস্থা।
হাজার হাজার দুর্লভ উদ্ভিদে ঘেরা এই প্রাসাদ কেবল একটি বিলাসবহুল অট্টালিকাই নয়, এটি ইটালির অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিগত উদ্ভিদ উদ্যানও বটে। এখানে রয়েছে ৫০০ প্রজাতির প্রায় ২,১০০টি সাকুলেন্ট উদ্ভিদ, প্রায় ১,২০০টি পাম গাছ, ৮৫০ প্রজাতির প্রায় ৫,০০০টি জবা গাছ, ১৬০ প্রজাতির প্রায় ৮০০টি লেবুজাতীয় গাছ এবং প্রায় ১৫০টি প্রাচীন জলপাই গাছ। এদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর কর্মী রয়েছেন যাঁরা পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার দুর্লভ উদ্ভিদের পরিচর্যায় নিবেদিত।
তবে প্রাসাদের প্রাক্তন মালিকের মতো ‘ভিলা চের্তোজ়া’কে কেবল ব্যক্তিগত বাসভবন হিসাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই এইচবিজে-র। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘কনস্টেলেশন হোটেলস’-এর মালিকানায় ইউরোপ জুড়ে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল এবং বিখ্যাত হোটেল রয়েছে।
জানা গিয়েছে, বর্তমানে ‘ভিলা চের্তোজ়া’কে একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল রিসর্টে রূপান্তর করার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে তিনি। তাতে বিত্তশালী পর্যটকেরা ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত এই প্রাসাদে থাকার অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারেন। দাবি করা হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একসময় কেবল রাজনৈতিক নেতা, তারকা এবং রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত এই প্রাসাদটি সাধারণ অতিথিদের জন্যও উন্মুক্ত হয়ে যাবে।