মনের খিদে মেটাতে প্রেমিক ভাড়া! টাকা দিয়ে কেনা হচ্ছে সঙ্গ, জাপানের দেখানো পথে ভারতীয় মহিলারাও
‘বয়ফ্রেন্ড ভাড়া’ করার অর্থনীতির উৎপত্তি জাপানে। নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মানুষ কয়েক ঘণ্টার জন্য সঙ্গী ভাড়া করতে পারেন সে দেশে। বাস্তবজীবন যখন অস্বস্তিকর বা জটিল হয়ে ওঠে, তখন কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সামাজিক ভূমিকা ধার করাতেই স্বস্তি পাচ্ছেন বহু মহিলা।
মনখারাপ, কথা শোনার কেউ নেই। কিংবা সময়ের অভাবে সঙ্গ দিতে পারছেন না স্বামী বা প্রেমিক। মন খুলে কথা বলার জন্য সঙ্গীর প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য বহু ভারতীয় মহিলা এখন ঘণ্টা হিসাবে প্রেমিক বা সঙ্গী ভাড়া করছেন। আর সেই পরিষেবা নেওয়ায় নেই তেমন কোনও ঝঞ্ঝাটও।
যে ভাবে মানুষ ক্যাব, শরীরচর্চার প্রশিক্ষক বা পোশাকের জন্য ফ্রিল্যান্স ডিজ়াইনার বুক করেন, ঠিক ততটাই সহজ এই বিষয়টি। স্রেফ নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে একটি প্রোফাইল বেছে নিলেই হল। একাকিত্বে ভুগলে এখন আপনি চাইলে অনলাইনেই পেতে পারেন পুরুষ সঙ্গীর খোঁজ। না! তবে এই সঙ্গী আপনার জীবনসঙ্গী হবেন না। এক জন বন্ধুর মতো আপনার সুখ-দুঃখের সব কথা আপনি ভাগ করে নিতে পারেন অনলাইনের এই বন্ধুর সঙ্গে।
প্রথমেই আপনাকে ঠিক করতে হবে, ঠিক কী ধরনের সঙ্গ চান। কারও সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতে চান না কি কেনাকাটা করতে চান। ক্যাফেতে বসে কফি খেতে চান, না কি শুধু এমন কাউকে পাশে চান, যার উপস্থিতিতে একা বসে খাবার খাওয়ার অস্বস্তি দূর হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষেবাটি বেছে নিলেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এক জন ‘প্রেমিক’ ভাড়া করতে পারবেন গ্রাহক। তিনি সঙ্গী হয়ে সময় কাটাবেন। বুকিং শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকেই ঘণ্টার হিসাবে টাকা নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময় যত বাড়বে, খরচও তত বাড়তে থাকবে। এই পুরো ব্যবস্থাটাই অনেকটা ক্যাব বা অন্যান্য অন-ডিমান্ড পরিষেবা ব্যবহারের মতো।
কথাটি শুনতে আপাত খাপছাড়া বা বিদেশি কোনও নাটকের প্লট বলে মনে হলেও হতে পারে। এই ধরনের গ্রাহক পরিষেবার দিব্যি চল রয়েছে জাপানে। এখন ধীরে ধীরে ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমশ এটি জনপ্রিয় একটি পরিষেবায় পরিণত হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
‘বয়ফ্রেন্ড ভাড়া’ করার অর্থনীতির উৎপত্তি জাপানে। আর এই ধরনের পরিষেবার ধারণাটিও নতুন কোনও বিষয় নয়। এর শিকড় প্রোথিত আছে ১৯৯০ সালে জাপানের ‘ব্যক্তি ভাড়া অর্থনীতি’তে। জাপানি নাগরিকেরা কয়েক ঘণ্টার জন্য পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্রোতা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে সঙ্গী হিসাবে কোনও অপরিচিত ব্যক্তিকে ভাড়া করতেন।
২০১০ সালে এসে এই ধারণা নতুন মাত্রা পায়। ধীরে ধীরে এটি ‘প্রেমিক ও প্রেমিকা ভাড়া’র মতো পেশাদার পরিষেবার রূপ নেয়। সেখানে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মানুষ কয়েক ঘণ্টার জন্য সঙ্গী ভাড়া করতে পারেন। বাস্তবজীবন যখন অস্বস্তিকর বা জটিল হয়ে ওঠে, তখন কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সামাজিক ভূমিকা ধার করাতেই স্বস্তি পাচ্ছেন বহু মহিলা।
ঘণ্টাপ্রতি প্রেমিক ভাড়া করার ধারণাটি এখন আর শুধু টোকিয়োতেই সীমাবদ্ধ নেই। ফেসবুক গ্রুপ এবং ইনস্টাগ্রাম পেজ থেকে শুরু করে সঙ্গী খোঁজার অ্যাপ এবং অনলাইন প্রোফাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছে এই পরিষেবা।
এখনও মূলধারার ব্যবসা না হলেও, পরিষেবাটি ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ঘণ্টাপ্রতি নির্ধারিত মূল্যে সিনেমা দেখার সঙ্গী, কেনাকাটার সঙ্গী, এমনকি চিকিৎসার সময় হাসপাতালে সঙ্গে থাকার জন্য ‘মেডিক্যাল সাপোর্ট কম্প্যানিয়ন’ বুক করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এটি আর কেবল কোনও অদ্ভুত ধারণা নয়, বরং একটি সংগঠিত বাণিজ্যিক পরিষেবার আকার নিতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন:
জাপানে এই ধারণাটি জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ সে দেশটিতে খোলামেলা ভাবে অনুভূতি প্রকাশ করার চল খুব কম। সেখানে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে অন্যদের বিরক্ত না করার একটি সংস্কৃতি রয়েছে। এ ছাড়াও, একা বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি, কাজের চাপ, শহুরে জীবনের একাকিত্ব এবং চাপমুক্ত সামাজিক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা এই পরিষেবার চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনেকেই এখন বন্ধু বা পরিচিত সঙ্গীর চেয়ে টাকার বিনিময়ে অপরিচিত কারও সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কথা বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতে শুরু করেছেন। জাপানে বহুল প্রচলিত এই পরিষেবাটি নিতে হলে অবশ্যই বেশ কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হবে।
নাম শুনে অনেকের মনে হতে পারে, এটি একটি ডেটিং পরিষেবা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এই পরিষেবার মূল উদ্দেশ্য রোম্যান্টিক সম্পর্ক গড়ে তোলা নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এক জন সঙ্গী পাওয়া। গ্রাহক ও সঙ্গী সাধারণত ক্যাফে, পার্ক, রেস্তরাঁ, জাদুঘর, সিনেমাহল বা শপিং মলের মতো প্রকাশ্যে স্থানে দেখা করেন। সেখানে তাঁরা একসঙ্গে সময় কাটান, গল্প করেন, ঘুরে বেড়ান বা কোনও নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডে যোগ দেন।
গ্রাহকেরা মূলত আলাপচারিতা, বন্ধুত্বপূর্ণ সঙ্গ এবং সামাজিক উপস্থিতির জন্য অর্থ প্রদান করেন। প্রেম বা যৌনসম্পর্কের জন্য নয়। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের নীতি ও শর্তাবলিতে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা বা যৌন পরিষেবা স্পষ্ট ভাবে নিষিদ্ধ থাকে। কোনও যৌন কার্যকলাপের অনুমতি দেওয়া হয় না। হোটেলের ঘরে সঙ্গীকে নিয়ে যাওয়াও যায় না। নেই রাত্রিযাপনের অনুমতিও।
দু’পক্ষেরই সম্মানজনক আচরণ বাধ্যতামূলক। এই পরিষেবায় অর্থের বিনিময়ে কেনা হয় না কোনও প্রেম বা সম্পর্ক। বরং কেনা হয় কিছুটা সময়, মনোযোগ, আন্তরিক আলাপচারিতা এবং এক জন মানুষের সঙ্গ। কেনাকাটা, সিনেমা দেখা, কফি খাওয়া, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সঙ্গ দেওয়া কিংবা হাসপাতাল বা চিকিৎসার সময় সহায়তা করার মতো পরিষেবার জন্য ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিকের উদাহরণও রয়েছে।
ভারতে অবশ্য জাপানের এজেন্সিভিত্তিক ‘প্রেমিক বা সঙ্গী ভাড়া’র মডেলটি সরাসরি গড়ে ওঠেনি। বরং সমাজমাধ্যম, অনলাইন কমিউনিটি এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এর একটি ভিন্নধর্মী দিক নজরে এসেছে। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে ফেসবুকে এমন একাধিক গ্রুপের সন্ধান মিলেছে, যেখানে কিছু পুরুষ নিজেদের ‘ভাড়াটে প্রেমিক’ হিসাবে পরিচয় দিয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। সেখানে তাঁরা বেড়াতে যাওয়া, কোনও অনুষ্ঠানে সঙ্গ দেওয়া, সিনেমা দেখা, কফি খাওয়া বা সাধারণ ভাবে সময় কাটানোর মতো পরিষেবার প্রস্তাব দেন।
এ দেশে ভাড়া করা প্রেমিক হিসাবে প্রচার করার জন্য বেশ কিছু তরুণ সমাজমাধ্যম, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। কয়েকটি ব্র্যান্ডও তাদের পরিষেবার প্রচারের জন্য ইনস্টাগ্রামে যোগ দিয়েছে। সেখানে বিজ্ঞাপনী প্রচারে বলা হয়েছে, ‘‘কফি ডেটে যাওয়া, একসঙ্গে শপিং করা, গাড়িতে বসে সেলফি তোলা— এ সবের পাশাপাশি এক জন আকর্ষণীয় সঙ্গীর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। যিনি আপনার কথা মন দিয়ে শুনবেন, আড্ডা দেবেন এবং প্রয়োজনে আপনার ইনস্টাগ্রাম স্টোরি বা ছবির জন্যও হাসিমুখে পোজ দেবেন।’’
এই প্রবণতা নিয়ে মতভেদও কম নয়। কেউ এটিকে শহুরে জীবনের একাকিত্ব কমানোর একটি নতুন উপায় হিসাবে দেখছেন। আবার কেউ মনে করছেন, এটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আবেগকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করছে। তবে বিতর্ক যা-ই থাকুক, দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং সঙ্গী-পরিষেবার চাহিদার কারণে একটি নতুন সামাজিক প্রবণতা হিসাবে ক্রমেই আলোচনায় উঠে আসছে ‘ভাড়া করা প্রেমিকের পরিষেবা’।