প্রদীপের নীচেই অন্ধকার! ১০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে আইআইটি পড়ুয়াদের আত্মহত্যার সংখ্যা, শীর্ষে খড়্গপুর
ভারতে আইআইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের থেকে একটু আলাদা বলেই মনে করা হয়। আইআইটি বা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়াশোনার সুযোগ অত্যন্ত সম্মানের, এমনটাই ধারণা অধিকাংশের। কিন্তু আইআইটিগুলির সুনামের আড়ালে রয়েছে এর একটি অন্ধকারময় ও দুঃখজনক ইতিবৃত্ত।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া সাহিল ওয়াকোডের মৃত্যুর (যাকে আত্মহত্যা বলে প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ) ঘটনাকে কেন্দ্র করে শোরগোল দেশ জুড়ে। আইআইটি বম্বের ছাত্রের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার অন্ত নেই। গত ১৮ সেপ্টেম্বর আইআইটি বম্বের এনার্জি সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহিলের ঝুলন্ত দেহ তাঁর হস্টেলের ঘর থেকে উদ্ধার হয়। তার পর থেকেই উত্তাল ক্যাম্পাস।
সাহিলের মৃত্যুর পর আইআইটি বম্বে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন পড়ুয়ারা। এই নিয়ে গত সাত মাসে আইআইটি বম্বের পওয়াই ক্যাম্পাসে তৃতীয় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটল। সাহিলের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই উঠে এসেছে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি বা আইআইটি। এই ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং গবেষণা করা পড়ুয়াদের বিশাল চাহিদা দেশি-বিদেশি সংস্থায়। লাখ লাখ টাকা মাইনে দিয়ে তাঁদের নিজেদের সংস্থায় কাজ করাতে চায় বহু সংস্থা।
ভারতে আইআইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের থেকে একটু আলাদা বলেই মনে করা হয়। আইআইটি বা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়াশোনার সুযোগ অত্যন্ত সম্মানের, এমনটাই ধারণা অধিকাংশের। দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া প্রতি বছর আইআইটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। পরীক্ষায় ভাল ফল করা এবং আসন পাওয়ার জন্য প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয় পড়ুয়াদের।
গত কয়েক দশকে আইআইটি থেকে উঠে এসেছেন কৃতী ছাত্র-ছাত্রীরা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁদের সাফল্য চোখধাঁধানো। এই তালিকায় রয়েছেন গুগ্লের সিইও সুন্দর পিচাই এবং আইবিএমের সিইও অরবিন্দ কৃষ্ণের মতো বিশ্বখ্যাত কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। এ ছাড়াও, আইআইটির প্রাক্তনীদের মধ্যে ৩৫ জনেরও বেশি ভারতীয় ধনকুবের রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
শুধু প্রযুক্তি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেই নয়, আইআইটির প্রাক্তনীরা রাজনীতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং অন্যান্য পেশাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ফলে আইআইটি শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার জন্যই পরিচিত নয়, এর প্রাক্তনীদের সাফল্যের পরিধিও বেশ বিস্তৃত।
কিন্তু আইআইটিগুলির সুনামের আড়ালে রয়েছে এর একটি অন্ধকারময় ও দুঃখজনক ইতিবৃত্ত। আইআইটি বম্বের সাম্প্রতিক ঘটনার ফলে সেই অন্ধকার দিকটিতে আলোকপাত করেছে আইআইটিরই প্রাক্তনীর করা তথ্যের অধিকার আইনে একটি আবেদন (আরটিআই)। ওই আবেদনে উঠে এসেছে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান। আর সেই চিত্রটি সামগ্রিক ভাবে যথেষ্ট উদ্বেগের বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
আরটিআই বা তথ্যের অধিকার আইনে পাওয়া তথ্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি একটি সংকলনে আইআইটি ক্যাম্পাসগুলিতে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ওই তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ বছরে দেশের বিভিন্ন আইআইটি ক্যাম্পাসে মোট ১৭১টি আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এই তথ্য সংকলন করেছেন আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন ছাত্র ধীরজ সিংহ। তিনি বিভিন্ন আইআইটির প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। আরটিআই-এর মাধ্যমে পাওয়া সরকারি তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন সংগ্রহ করে তিনি এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছেন।
আরও পড়ুন:
আইআইটির পড়াশোনা, শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং বিভিন্ন সংস্থায় চাকরির সুযোগের কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি পড়ুয়া ও অভিভাবকদের আগ্রহ অনেক বেশি। তাই আইআইটি পড়ুয়াদের পড়াশোনা ও কেরিয়ারের সাফল্যের পাশাপাশি তাদের মানসিক চাপ, ক্যাম্পাসের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
ধীরজের আরটিআই-এর জবাব এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি করা একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। বিগত ২০ বছরের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, সেই সময়কালে ঘটনাগুলোর সংখ্যা সব বছরে সমান ছিল না। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে আইআইটি ক্যাম্পাসগুলিতে মোট ৫১ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।
অন্য দিকে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ বছরে এই সংখ্যা বেড়ে ১২০-তে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, আগের পর্বের তুলনায় পরবর্তী এক দশকে নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। আর এখানেই বিপদসঙ্কেত টের পাচ্ছে শিক্ষামহল।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানের দিকে নজর ফেরালে দেখা যাবে শেষ কয়েকটি বছরে হঠাৎ করে আত্মহত্যার সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। উদাহরণস্বরূপ ২০১৪ সালে ১৩ জন, ২০১৮ সালে ১১ জন এবং ২০১৯ সালে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিলেন বলে আরটিআই ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে প্রতি বারই ১৪ জন করে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা দেখা যায় ২০২৫ সালে, ওই বছরে মোট ১৬টি আত্মহত্যার বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। চলতি বছরেও ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে এ রাজ্যের আইআইটি খড়্গপুর। ২৯টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে। গুগ্ল এবং অ্যালফাবেটের প্রধান সুন্দর পিচাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনী। মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি রয়েছে সুন্দরের।
সুন্দরের মতোই খড়্গপুরের আর এক প্রাক্তনী হলেন দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাশ করেন তিনি। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ডিভি সুব্বারাও ছিলেন এই আইআইটির কৃতী ছাত্র। অথচ এই খ্যাতনামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে আইআইটি মাদ্রাজ এবং আইআইটি কানপুর। যথাক্রমে ২৬টি ও ২১টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে গত ২০ বছরে। আইআইটি দিল্লিতে ১৭ জন ছাত্রের আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আইআইটি বম্বে এবং আইআইটি গুয়াহাটিতে ১৪টি করে ঘটনা ঘটেছে। আইআইটি হায়দরাবাদে ন’টি, আইআইটি রুরকিতে আটটি এবং আইআইটি পটনায় সাতটি অস্বাভাবিক মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাকি মৃত্যুগুলি বিএইচইউ বারাণসী, ভুবনেশ্বর, আইআইটি-আইএসএম ধানবাদ, গাঁধীনগর, রোপার, মণ্ডী, জোধপুর, তিরুপতি, ধারওয়াদ, গোয়া এবং ইনদওর-সহ আরও কয়েকটি আইআইটির ক্যাম্পাসে ঘটেছে বলে খবর। তবে এই ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটা থেকে বাদ পড়েছে জম্মু, ভিলাই এবং পলক্কড়ের মতো নতুন আইআইটিগুলি।
বম্বে আইআইটিতে সাহিলের মৃত্যুর পর উঠে এসেছে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ। পরীক্ষার হলে গার্ড দেওয়ার সময় এবং বিগত কয়েক মাস ধরে অধ্যাপক তথা ‘ডিন অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাফেয়ার্স’ সূর্যনারায়ণ দুল্লা বার বার সাহিলের উদ্দেশে জাতিগত বৈষম্যমূলক মন্তব্য করছিলেন এবং হুমকি দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। পরিবারের অভিযোগ, এর জেরে সাহিল আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।
আইআইটিগুলোতে জাতিগত ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই বিভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা আইআইটির প্রাক্তনীরাও এই দাবি তুলেছেন। নথিভুক্ত হওয়া আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রান্তিক ও অনগ্রসর সামাজিক গোষ্ঠীর কিছু শিক্ষার্থীর নাম উঠে এসেছে। তবে এ সব ঘটনার ক্ষেত্রে জাতিগত বৈষম্যই আত্মহত্যার সরাসরি কারণ ছিল এমন কোনও প্রামাণ্য নথি নেই।
একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আইআইটি, আইআইএম, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়-সহ কেন্দ্রীয় সহযোগিতায় পরিচালিত বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট ১২২ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন তফসিলি জাতি (এসসি), ৩ জন তফসিলি উপজাতি (এসটি) এবং ৪১ জন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি)-র অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, এই তিন শ্রেণি মিলিয়ে মোট ৬৮ জন শিক্ষার্থী ছিলেন, যা মোট আত্মহত্যার প্রায় ৫৫ শতাংশ।