‘ত্রিশূলে’ই জব্দ জারিজুরি, তিন ভাগে ভাগ হয়ে বুলেট ফুঁড়বে ড্রোনকে! খেলা ঘোরাবে মস্কোর জাদু কার্তুজ?
ইউক্রেনীয় ড্রোন মোকাবিলার জন্য রুশ বাহিনীর হাতে নয়া ড্রোনঘাতী এক কার্তুজ বা গোলা তুলে দিয়েছেন রুশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা। ড্রোনের মতো ছোট বস্তুকে আঘাত করার জন্য বিশেষ প্রযুক্তি রয়েছে এই কার্তুজে।
আধুনিক যুগে যুদ্ধের রূপরেখা বদলে দেওয়ার অন্যতম ‘নায়ক’ মানববিহীন উড়ুক্কু যান বা ড্রোন। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে অপারেশন সিঁদুর কিংবা পশ্চিম এশিয়ার ইরান-আমেরিকা সংঘাতে খেলা ঘোরানোর কারিগর হল এই হাতিয়ার। শত্রু শিবিরে ঢুকে ‘ফিঁদায়ে’ হামলায় ঘুম কাড়তে ওস্তাদ আধুনিক এই যুদ্ধাস্ত্রটি।
ড্রোনের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় নতুন ব্যবস্থা আনছে রাশিয়া। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চোখে ধুলো দিয়ে মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ঢুকে যে ভাবে নিখুঁত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন, তাতে প্রমাদ গুনছে ভ্লাদিমির পুতিনের ফৌজ। ড্রোন দিয়ে একের পর এক নিশানা বানানো হয়েছে রুশ তৈল শোধনাগার-সহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গা।
রুশ প্রতিরক্ষা দফতর সূত্রে খবর, ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে মস্কোয়। হামলার কৌশল বদলাতে শুরু করেছে ইউক্রেন। কোনও বড় সামরিক অস্ত্র প্রয়োগ নয়, বরং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সস্তার ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর উপর জোর দিচ্ছে কিভ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই সেগুলিকে প্রতিহত করার নতুন প্রযুক্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে দুই দেশ। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন মোকাবিলায় নতুন কৌশল প্রয়োগ করতে রাশিয়া নাকি এক কদম এগিয়ে গিয়েছে। সে দেশের প্রতিরক্ষা দফতর সূত্রেই এমন খবর সামনে এসেছে।
ইউক্রেনীয় ড্রোন মোকাবিলার জন্য রুশ বাহিনীর হাতে নয়া ড্রোনঘাতী এক কার্তুজ বা গোলা তুলে দিয়েছেন রুশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা।মনোগোতোচিয়ে নামের একটি বিশেষ ধরনের নতুন ঘাতক কার্তুজ তৈরি করে ফেলেছে রুশ সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা। ব্যাপক ভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে সেটির।
আরও পড়ুন:
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা সংস্থা রোস্টেকের অধীনস্থ ‘ভিসোকোতোচনি কমপ্লেক্সি’ এই বিশেষ অ্যান্টি-ড্রোন কার্তুজ তৈরি করেছে। নতুন এই ড্রোন-বিধ্বংসী গোলাটি ছোড়ার পর তিনটি পৃথক প্রক্ষেপকে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে, বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ড্রোন ধ্বংস করার সম্ভাবনা বাড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন মোকাবিলায় রাশিয়ার হাত শক্ত করবে এই নতুন বন্দোবস্ত, এমনটাই মত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
ড্রোনের মতো ছোট বস্তুকে আঘাত করার জন্য বিশেষ প্রযুক্তি রয়েছে এই কার্তুজে। এর বিশেষত্ব হল, একটি গুলি বা গোলা ছোড়ার পর সেটির আঘাতকারী অংশ তিনটি পৃথক প্রক্ষেপকে বিভক্ত হয়ে যায়। এর ফলে ছোট ও দ্রুতগতির ড্রোনকে আঘাত করার সম্ভাবনা আরও বাড়ে বলে জানা গিয়েছে।
সাধারণ রাইফেলের গুলি লক্ষ্যবস্তুর দিকে একটি প্রধান প্রক্ষেপক পাঠায়। কিন্তু, মনোগোতোচিয়ে গুলি বা গোলার আঘাতকারী অংশটি তিনটি ভাগে বিভক্ত হওয়ার জন্য তৈরি থাকে। গুলি ছোড়ার পর এই তিনটি অংশ আলাদা হয়ে কিছুটা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই কার্তুজটি তৈরির প্রধান উদ্দেশ্যই হল, আকাশে উড়ন্ত ছোট একটি ড্রোনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর সময় নিখুঁত নিশানার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কিছুটা কমানো। কারণ, উড়ন্ত ড্রোনের গতিপথ দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাতে ছোট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত করা কঠিন হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
এই কার্তুজের ভিতরে থাকা বুলেটটি সাধারণ বুলেটের মতো একক কোনও বস্তু নয়, বরং এটি তিনটি উপাদানে গঠিত। বন্দুকের নল (ব্যারেল) থেকে বের হওয়ার পরই বুলেটটি ভেঙে তিনটি আলাদা টুকরো বা প্রজেক্টাইলে পরিণত হয়। তার পর বাতাসে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে দ্রুত গতিশীল ছোট ড্রোনগুলিতে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানার সম্ভাবনা প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে যায়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা রোস্টেকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়েই এই বিশেষ গোলাবারুদ বা কার্তুজের প্রথম ব্যাচটি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর দু’টি সংস্করণের কথা উল্লেখ করেছে প্রস্তুতকারী সংস্থা।
এই গোলাবারুদ ব্যবহারের জন্য রুশ সেনাদের আলাদা কোনও বিশেষ অস্ত্র বহন করতে হয় না। এটি রাশিয়ার সাধারণ কালাশনিকভ রাইফেল ও প্রচলিত মেশিনগানে সরাসরি ব্যবহার করা যায়।
প্রথম সংস্করণটি এসটি ২২৬, ৫.৪৫×৩৯ মিমি ক্যালিবার, এবং দ্বিতীয়টি এসটি ২২৮, ৭.৬২×৫৪ মিমি ক্যালিবারের। কার্তুজগুলি উপযুক্ত রাইফেল ও অ্যাসল্ট রাইফেলে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
দু’টি সংস্করণই প্রচলিত কার্তুজের খোল ও বারুদ ব্যবহার করে তৈরি। রাশিয়ার দাবি, তাদের সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অনুসারে প্রচলিত অস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ধরনের কার্তুজ তৈরি করা সম্ভব। ফলে, সেনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনও অস্ত্রের প্রশিক্ষণ চালু করার প্রয়োজনও নেই।
সহজ ভাবে বললে, কোনও ছোট ড্রোনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ক্ষেত্রে একটি মাত্র বিন্দুতে আঘাত করার পরিবর্তে তিনটি পৃথক প্রক্ষেপকের মাধ্যমে আঘাতের সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। তবে সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিকে এমন কোনও ব্যবস্থা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, যেখানে গুলি ছুড়লেই নিশ্চিত ভাবে ড্রোন ধ্বংস হয়ে যাবে। ড্রোনের দূরত্ব, গতি, গতিপথ এবং ব্যবহারকারীর দক্ষতা—সবই এর ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউক্রেনের বিমান ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আনাতোলি খ্রাপচিনস্কির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি সেনার হাতে ড্রোন মোকাবিলার আরও একটি বিকল্প তুলে দিতে পারে। তবে, এটি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি আমূল বদলে দেবে, এমন সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না বলেই ইউক্রেনীয় গণমাধ্যমে জানিয়েছেন।
তবে, একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনের দাবি, মনোগোতোচিয়ে-ই রাশিয়ার একমাত্র ড্রোন-বিধ্বংসী অস্ত্র নয়। ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ঠেকাতে নতুন নতুন অস্ত্র তৈরি করছে রাশিয়া। ২০২৬ সালের এপ্রিলেই রাশিয়ার কালাশনিকভ সংস্থা ড্রোন ধ্বংসের জন্য বিশেষ ধরনের বহু-প্রক্ষেপকযুক্ত কার্তুজ তৈরির কথা জানিয়েছিল।
অন্য দিকে, ইউক্রেনও ড্রোনের মোকাবিলায় আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এতে স্পষ্ট, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের বাড়তে থাকা দাপট ঠেকাতে দুই দেশই নতুন প্রযুক্তির উপর জোর দিচ্ছে। প্রচলিত রাইফেল ব্যবহার করে ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করাই মনোগোতোচিয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে, এই কার্তুজ বাস্তবে কতটা কাজে আসবে, তা নির্ধারিত হবে যুদ্ধক্ষেত্রে এর সাফল্য বা ব্যর্থতার উপর।