মহাশূন্যে ভারতকে নিয়ে রুশ-মার্কিন দড়ি টানাটানি! হঠাৎ কেন ইসরোকে কাছে পেতে মরিয়া রসকসমস-নাসা?
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে নজিরবিহীন ভাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ভারতকে শুভেচ্ছাবার্তা দিল রুশ নভশ্চরদের দল। অন্য দিকে, চন্দ্রাভিযান মিশনে আচমকাই নয়াদিল্লিকে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকা। হঠাৎ কেন ইসরোকে নিয়ে দড়ি টানাটানি দুই সুপার পাওয়ারের?
মহাকাশের লড়াইতে ভারতকে নিয়ে দড়ি টানাটানি! এক দিকে রাশিয়া, আর অপর প্রাপ্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুযুধান দুই ‘সুপার পাওয়ার’-এর কাছে হঠাৎই ইসরোর (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজ়েশন) গুরুত্ব কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। কেন নয়াদিল্লির জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থাকে দলে টানতে চাইছে মস্কো আর ওয়াশিংটন? ইতিমধ্যেই সেই লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে শুরু করেছে কেন্দ্র।
চলতি বছরের ১০ অগস্ট আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন বা আইএসএস) একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে রাশিয়া। তাতে আসন্ন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতকে আগাম শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছেন মস্কোর নভশ্চরেরা। ওই সময় এ দেশের ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা ধরে ছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি, নয়াদিল্লি ও ক্রেমলিনের মধ্যে নানা ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁদের।
আইএসএস থেকে পাঠানো ভিডিয়োবার্তায় রুশ নভশ্চর পিয়োতর ধ্রুবরভ বলেন, ‘‘প্রিয় বন্ধুরা, আজ আমরা ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করছি।’’ সেই সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ইসরোর অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। তা ছাড়া, মহাকাশ গবেষণায় দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারির উপর জোর দিতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। ক্রেমলিনের এ-হেন পদক্ষেপকে নজিরবিহীন হিসাবেই দেখছে পর্যবেক্ষকমহল।
অন্য দিকে, সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত ভারত-মার্কিন অসামরিক মহাকাশ যৌথ কার্যনির্বাহী গোষ্ঠীর নবম বৈঠকে ভাষণ দেন এ দেশের নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর। সেখানেই নাসার (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অর্গানাইজ়েশন) চন্দ্রাভিযান মিশনে ভারতকে যোগ দেওয়ার জন্য সরাসরি আমন্ত্রণ জানান তিনি। উক্ত অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ইসরোর ইউ আর রাও উপগ্রহকেন্দ্রের ডিরেক্টর এম শঙ্করণ।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, মহাকাশের লড়াইতে নিজেদের স্বার্থেই ভারতকে পাশে চাইছে রাশিয়া ও আমেরিকা। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার নাগপাশে জড়িয়ে পড়ায় বর্তমানে অর্থসঙ্কটে ভুগছে মস্কো। চলতি অর্থবর্ষের (২০২৬-’২৭) প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) ঋণাত্মকে চলে গিয়েছে তাঁদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি)। এই পরিস্থিতিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল ও ব্যয়বহুল কাজকর্ম পরিচালনা করা ক্রেমলিনের একার পক্ষে অসম্ভব।
আরও পড়ুন:
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত কয়েক বছরে মহাকাশ গবেষণায় একের পর এক দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছে ইসরো। ২০১৩-’১৪ সালে প্রথম প্রচেষ্টাতেই মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনে সক্ষম হন এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এর পর ২০২৩ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরু জয় করে এই সংস্থা। ওই বছর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে সেখানে অবতরণ করে ভারতের মহাকাশযান। অবতরণস্থলের নাম ‘শিব শক্তি পয়েন্ট’ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ভারতের মহাকাশ গবেষণায় রুশ অবদান কম নয়। গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্যোগে মহাশূন্যে পা রাখেন ক্যাপ্টেন রাকেশ শর্মা। সয়ুজ় টি১১ নামের নভোযানে পৃথিবীর বাইরে যান তিনি। ক্যাপ্টেন শর্মাই ছিলেন এ দেশের প্রথম মহাকাশচারী। মহাবিশ্ব থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগও তাঁকে দিয়েছিল মস্কো। সেখানে আট দিন কাটিয়ে ঘরে ফেরেন রাকেশ।
১৯৬৯ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাইয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ইসরো। ওই সময়ে অর্থনীতির নিরিখে বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ ছিল ভারত। ফলে ব্যয়বহুল জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা চালাতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়ে নয়াদিল্লি। তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সোভিয়েত। মস্কোর প্রযুক্তিগত সহযোগিতার উপর ভর করে পরবর্তী কালে মহাকাশ অভিযানগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যান ইসরোর গবেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সেই পুরনো কথা মনে করিয়ে বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৌড়ে ভারতকে পাশে চাইছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইসরোকে নিয়ে আমেরিকার আবার অন্য হিসাব রয়েছে। বর্তমানে চাঁদে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। তাতে কোনওরকম ফাঁক রাখতে নারাজ ওয়াশিংটন। এর ফলেই যে তারা নয়াদিল্লির হাত ধরতে চাইছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন:
২১ শতকে নতুন করে চাঁদে মানুষ পাঠাতে আর্টেমিস কর্মসূচি চালু করেছে নাসা। সেই লক্ষ্যে ২০২২ সালের নভেম্বরে মনুষ্যহীন একটি অভিযান পরিচালনা করে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা। এ বছরের এপ্রিলে চাঁদ প্রদক্ষিণে পাঠানো হয় কৃত্রিম উপগ্রহ। সূত্রের খবর, ২০২৮ সাল নাগাদ সেখানে নামবে যুক্তরাষ্ট্রের নভশ্চর দল। এর পর ধীরে ধীরে শুরু হবে স্থায়ী বসতি তৈরির কাজ। এই কাজেই ভারতকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চাইছে আমেরিকা।
রাশিয়ার মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকেও নানা রকমের সাহায্যে পেয়েছে ইসরো। আগামী বছরের (২০২৭ সাল) শুরুতেই মহাকাশে নভশ্চর পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ভারত। অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ‘গগনযান মিশন’। এর জন্য নাসা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এ দেশের নভোচারীরা। তাঁদের স্পেস সুট তৈরিতেও প্রযুক্তিগত সহায়তা মিলেছে আমেরিকার। এই পরিস্থিতিতে দু’টি দেশেরই আমন্ত্রণ গ্রহণে রয়েছে কিছু কাঁটা।
১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে মহাকাশ গবেষণায় ধীরে ধীরে চিনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে রাশিয়া। ২০২৩ সালে চাঁদে নভোযান পাঠানোর চেষ্টা করে মস্কো। সেই অভিযানের অংশ হওয়ার ইচ্ছা ছিল ইসরোর। কিন্তু, পত্রপাঠ তাতে না বলে দেয় ক্রেমলিন। উল্টে বেজিঙের থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিতে দেখা যায় তাদের। যদিও তার ফল ভাল হয়নি। চাঁদে নামার মুখে ভেঙে পড়ে রুশ মহাকাশযান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আবার সমস্যাটা রাজনৈতিক। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চিড় ধরেছে আমেরিকার। এ দেশের অর্থনীতি নিয়ে কুমন্তব্য করতেও শোনা গিয়েছে তাঁকে। পাশাপাশি, নয়াদিল্লির উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ইচ্ছাও আছে তাঁর। ওয়াশিংটন শেষপর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত নিলে নাসার আহ্বানে দিল্লি কতটা সাড়া দেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট ধন্দ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের। লক্ষ্য স্থির রেখে ধীরে ধীরে সে দিকে এগোচ্ছে ইসরো। বর্তমানে মহাবিশ্বে সক্রিয় রয়েছে দু’টি মহাকাশ স্টেশন। একটি হল আইএসএস। এবং দ্বিতীয়টির পোশাকি নাম ‘তিয়াংগং’। মান্দারিন ভাষায় এর অর্থ ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’। এর সম্পূর্ণ মালিকানা রয়েছে বেজিঙের জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হাতে।
২০৩০ সালের শেষের দিকে পুরোপুরি বন্ধ হবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)। পরের বছর তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে প্রশান্ত মহাসাগরের নির্জন এলাকা ‘পয়েন্ট নিমো’তে ডুবিয়ে ধ্বংস করার পরিকল্পনা রয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। আর তাই এখন থেকেই নতুন মহাকাশ স্টেশন তৈরির ছক কষছে রাশিয়া ও আমেরিকা। এই নির্মাণকাজ বেশ ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। ভারতকে নিয়ে টানাটানির এটাও একটা কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
১৯৯৮ সালে শুরু হয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নির্মাণকাজ। সেটা শেষ হতে দু’বছর সময় লেগেছিল। এটি তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা নেয় যুক্তরাষ্ট্রের নাসা, রাশিয়ার রসকসমস, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইএসএ, জাপানের জাক্সা এবং কানাডার সিএসএ। ২০২০ সালের ২ নভেম্বর থেকে সেখানে লাগাতার নভোচারী পাঠিয়েছে বিশ্বের একাধিক দেশ। এর মধ্যে রয়েছে ভারতও।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তৈরিতে ওই সময় খরচ হয়েছিল ১৫,০০০ কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিপুল ব্যয় যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া, কারও একার পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ, প্রথম দেশটি এক দিকে ব্যস্ত ইরান যুদ্ধে। তা ছাড়া, চাঁদের মাটিতে নভোচারী পাঠানোকেই পাখির চোখ করেছে তারা। দ্বিতীয়টির আবার ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’ দশা।
তবে চিনের মতো পৃথক মহাকাশ স্টেশন তৈরিতে ইচ্ছুক আমেরিকা ও রাশিয়াও। ফলে যৌথ ভাবে সেটা তৈরির টোপ যে ভারত পেতে পারে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য হতে পারে রাজনৈতিক কারণ। শেষপর্যন্ত দিল্লি কী পদক্ষেপ করে, সেটাই এখন দেখার।