যুদ্ধ বাধায় রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয়! আরবের ‘খুনি’ রাজপুত্রকে আর বাঁচাতে চাইছে না আমেরিকা?
হুথি আতঙ্কে দিশেহারা সৌদি আরবের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন। বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের নিয়ে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। তাঁর মাথার উপরে থাকা নিরাপত্তা ছাতা কি সরিয়ে নিচ্ছে আমেরিকা?
কখনও বিমানবন্দর। কখনও আবার খনিজ তেলের শোধনাগার। সৌদি আরবের একের পর এক কৌশলগত পরিকাঠামোকে লাগাতার নিশানা করছে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনি বিদ্রোহী হুথিরা। তাদের তাণ্ডবে ঘুম উড়েছে রিয়াধের যুবরাজের। প্রাণ বাঁচাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুধু ‘পা ধরতে’ বাকি রেখেছেন তিনি! কিন্তু, তা সত্ত্বেও হেলদোল নেই আমেরিকার। এ কি তাহলে বিপদে ‘বন্ধু’কে ফেলে পালানোর ছক? ওয়াশিংটনের আচরণে বাড়ছে জল্পনা।
চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর পূর্ব সৌদির ধাহরানে আছড়ে পড়ে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র। ওই শহরে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা আরামকোর সদর দফতর। ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের ছোড়া দূরপাল্লার হাতিয়ারের নিখুঁত হামলায় এর প্রশাসনিক ভবনে ধরে যায় আগুন। যদিও তাতে হতাহতের কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ৮-১০ অক্টোবরের মধ্যে ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোনে অন্তত তিন বার রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিশানা করে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ফলে তড়িঘড়ি সেটি বন্ধ করে সৌদি প্রশাসন। অন্য দিকে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জেরে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রটিতে উড়ান বাতিল করেছে ভারতের ‘ইন্ডিগো’, ‘এয়ার ইন্ডিয়া’, ‘এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস’ এবং ‘আকাশ এয়ার’-এর মতো শীর্ষ বিমান সংস্থা।
ইরানের মদতপুষ্ট ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়ানোয় চরম নিরাপত্তা সঙ্কটের মুখে পড়েছেন সৌদির যুবরাজ তথা প্রধামন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন (এমবিএস)। জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাঁকে। শুধু তাই নয়, ৬ অক্টোবরের পর থেকে ৪১ বছর বয়সী আরব রাজপুত্রকে একবারের জন্যেও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য, সৌদির আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে এমবিএসের একাধিক বিলাসবহুল বাংলো। যদিও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে চোখ ধাঁধানো রাজপ্রাসাদে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। কিন্তু, সেগুলিতে হুথি হামলার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাধ্য হয়ে বাঙ্কারে সরতে হয়েছে তাঁকে। সূত্রের খবর, সেখানে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি বাহিনী।
আরও পড়ুন:
বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সৌদিকে বাঁচাতে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রটিতে বিশাল ফৌজ ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন রেখেছে আমেরিকা। যদিও রিয়াধের অভিযোগ, হামলার সময় শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনকে মাঝ আকাশে ধ্বংস করার তেমন গরজ দেখাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। উল্টে, হুথিদের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের মনোভাব যথেষ্টই ঢিলেঢালা। যার জেরে ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের হাতে যখন তখন মার খেতে হচ্ছে রিয়াধকে।
বর্তমানে সৌদিতে দু’টি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলি হল, প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অলটিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড। চলতি বছরের অক্টোবরে হওয়া হুথিদের যাবতীয় হামলা আটকাতে ব্যর্থ হয় এই দুই হাতিয়ার। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াধের মাথায় উপর থেকে ধীরে ধীরে হাত সরাচ্ছে আমেরিকা। যার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে এমবিএসকে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার নয়। কারণ, সৌদিতে হুথি আক্রমণ শুরু হওয়া ইস্তক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়ে আসছেন যুবরাজ সলমন। ব্যক্তিগত স্তরে ‘পোটাস’-এর (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) যথেষ্ট সুসম্পর্ক রয়েছে তাঁর। কিন্তু, তার পরেও ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে ওয়াশিংটন।
অন্য দিকে, বিমান হামলায় হুথিদের সমূলে ধ্বংসের ছক কষছে ইজ়রায়েল। ইতিমধ্যেই সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তেল আভিভের সাহায্য নিতে হলে তাদের বায়ুসেনাকে আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে সৌদিকে। ধর্মীয় কারণে যাতে সিলমোহর দেওয়া এমবিএসের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। এতে গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে রাজপাট খোয়াতেও হতে পারে তাঁকে।
আরও পড়ুন:
১৯৪৮ সালে আরব দুনিয়ায় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ইজ়রায়েল। তার পর কেটে গিয়েছে ৭৮ বছর। কিন্তু, এখনও ছোট্ট এই ইহুদি দেশটিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়নি সৌদি আরব। ফলে, দু’তরফে নেই কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক। উল্টে, ধর্মীয় কারণে প্রথম দিন থেকেই প্যালেস্টাইনকে সমর্থন করে এসেছে রিয়াধ। শুধু তাই নয়, বারবার তেল আভিভের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাদের।
এই পরিস্থিতিতে হুথিদের ধ্বংস করেত ইজ়রায়েলের সাহায্য নেওয়া সৌদির কাছে ‘খাল কেটে কুমির আনা’র সামিল। শেষ পর্যন্ত এনবিএস তাতে সবুজ সঙ্কেত দিলে আরব রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরে জ্বলে উঠতে পারে বিদ্রোহের আগুন। আর তাই আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্যের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিশরের সুয়েজ় খালের ‘গ্রেট বিটার হ্রদে’ নোঙর ফেলে মার্কিন রণতরী ইউএসএস কুইন্সি। ওই যুদ্ধজাহাজে বসে আমেরিকার সঙ্গে একটি গোপন চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা তথা রাজা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ফ্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। সংশ্লিষ্ট সমঝোতার তারিখটা ছিল ১৯৪৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি।
সৌদি-মার্কিন কুইন্সি চুক্তির মূল ভিত্তি হল নিরাপত্তার বিনিময়ে তেল। এই সমঝোতা মেনে বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রকে সুলভ মূল্যে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে জ্বালানি সরবরাহ করে আসছে রিয়াধ। বিনিময়ে বহিঃশত্রুর হাত থেকে আরব রাষ্ট্রটির রাজপরিবারকে রক্ষার ব্যাপারে কোনও কার্পণ্য দেখায়নি আমেরিকা। গোড়ায় ৬০ বছরের জন্য এই পারস্পরিক সহযোগিতায় আবদ্ধ হয় এই দুই রাষ্ট্র।
২০০৫ সালে কুইন্সি চুক্তিকে আরও ৬০ বছরের জন্য পুনর্নবীকরণ করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এই সময়সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা সমঝোতায় আবদ্ধ হয় রিয়াধ। যার মধ্যে ১৯৫১ সালের ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহায়তা’ সমঝোতাটি গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া, ২০১৭ ও ২০২৫ সালে আমেরিকার সঙ্গে ১১,০০০ কোটি এবং ১৪,২০০ কোটির অস্ত্র চুক্তিতেও সই করেন এমবিএস।
এহেন সৌদি আরবের থেকে হঠাৎ করে মুখ ফেরালে পশ্চিম এশিয়ার এক বিশ্বস্ত ‘বন্ধু’কে হারাবে আমেরিকা। সেই ধাক্কা সামলানো ট্রাম্পের পক্ষে মোটেই সহজ নয়। আর তাই হুথিদের উপর বোমাবর্ষণের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। যা বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়া যুবরাজ সলমনকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।
২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তামবুলের সৌদি দূতাবাসে নৃশংস ভাবে খুন হন রিয়াধের একটি গণমাধ্যমের সম্পাদক তথা সাংবাদিক জামাল আহমদ হামজ়া খাশোগি। প্রমাণ লোপাট করতে খণ্ড খণ্ড করে ফেলা হয় তাঁর দেহ। আরব রাষ্ট্রটির রাজপরিবারের কট্টর সমালোচক ছিলেন তিনি। যার জেরে এমবিএসের বিরুদ্ধে ওঠে ‘সুপারি কিলিং’য়ের অভিযোগ। যদিও সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেন তিনি।
খাশোগি কাণ্ডে যুবরাজ সলমনের উপর ঝুলছিল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঢাল হয়ে দাঁড়ানোয় সে যাত্রা ফাঁড়া কাটিয়ে উঠতে তাঁর তেমন সমস্যা হয়নি। হুথিদের রোষানল থেকে তাঁকে বাঁচাতে কি একই রকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে আমেরিকা? নাকি সেখানে কাজ করবে অন্য অঙ্ক? তার উত্তর দেবে সময়।