সলমনকে পরমাণু বোমার ‘ফাঁকা চেক’! ইরান যুদ্ধের মধ্যেই আরবে নতুন ‘শয়তানের’ জন্ম দিচ্ছেন ট্রাম্প?
সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু চুক্তির প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর জেরে পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব পুরোপুরি উল্টে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে পর্যবেক্ষক মহল।
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি! রিয়াধকে পরমাণু বোমার কাঁচামাল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের (এনরিচমেন্ট) অনুমতি দিতে চলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। উদ্দেশ্য অবশ্য আণবিক হাতিয়ার তৈরি নয়। বেসামরিক খাতে (যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন) ব্যবহার করা হবে ওই তেজ়স্ক্রিয়। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্তের জেরে পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় বদল আসতে চলেছে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞমহল।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রস্তাবিত পরমাণু চুক্তির বাস্তবায়নে মার্কিন কংগ্রেসের (পার্লামেন্ট) অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে ট্রাম্পের। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রস্তাবিত চুক্তিটিতে ‘সচেতন’ ভাবে দু’টি সুরক্ষা ব্যবস্থা বাদ রাখা হয়েছে। এত দিন ওয়াশিংটনের কাছে সেগুলি ছিল সংবেদনশীল শ্রেণিভুক্ত। সেই তালিকার প্রথমেই আছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ।
এ ছাড়া বেসামরিক পরমাণু চুক্তিতে সাধারণত ব্যবহৃত জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন সংক্রান্ত ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’-এর শর্ত আরোপ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সৌদি-মার্কিন সমঝোতা হয়ে গেলে সে দিক থেকেও ছাড় পাবে রিয়াধ। আর একেই পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রটির হাতে আণবিক অস্ত্র তৈরির ‘ফাঁকা চেক’ তুলে দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
আমেরিকার সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সেরে ফেলার চেষ্টা দীর্ঘ দিন ধরেই করছে সৌদি প্রশাসন। গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর এতে গতি আনেন রিয়াধের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন। সূত্রের খবর, প্রস্তাবিত সমঝোতায় সিলমোহর পড়লে পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রটিতে বিপুল লগ্নি করবে ওয়াশিংটন। হস্তান্তরিত হবে পরমাণু চুল্লি নির্মাণের প্রযুক্তিও।
রিয়াধের পরমাণু শক্তির প্রয়োজনীতার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেল রফতানিকারী দেশ হল সৌদি আরব। তরল সোনার ভান্ডার ফুরিয়ে গেলে অর্থনীতি যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা ভালই জানেন যুবরাজ সলমন। আর তাই সেখানে বৈচিত্র আনতে ‘ভিশন-২০৩০’ প্রকল্পে জোর দিচ্ছেন তিনি। এর জেরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আণবিক শক্তি ব্যবহার করতে চাইছে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্র।
আরও পড়ুন:
সৌদির তড়িৎশক্তি পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। খনিজ তেল পুড়িয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে রিয়াধ। এর সাহায্যে সেখানকার বাড়ি-ঘর, বহুতল বা সরকারি দফতরে জ্বলে আলো-পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র। পাশাপাশি, একই প্রক্রিয়ায় কলকারখানাতেও সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ। বেসামরিক পরমাণু চুক্তি কার্যকর হলে এতে আমূল বদল আনার সুযোগ পাবেন যুবরাজ সলমন।
বিশ্লেষকদের অনুমান, মার্কিন সহযোগিতায় আণবিক চুল্লি চালু হলে তেল নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে দাঁড়ি টানবে রিয়াধ। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি পরিমাণে তরল সোনা বিক্রির সুযোগ পাবে সৌদি প্রশাসন। পাশাপাশি, কার্বন নিঃসরণ জনিত জলবায়ুগত সমস্যা থেকেও বেরিয়ে আসতে চাইছেন যুবরাজ সলমন। এর জেরে সবুজ শক্তির (গ্রিন এনার্জি) উপর জোর দিতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে।
সৌদির সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তি আমেরিকার জন্য কম লাভজনক নয়। প্রথমত, এর জেরে পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত এবং বাণিজ্যিক উভয় সুবিধাই পাবে ওয়াশিংটন। কারণ, আগামী দিনে বেসামরিক পরমাণু চুল্লি নির্মাণের বরাত কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাকেই দেবে রিয়াধ। দ্বিতীয়ত, আণবিক সমঝোতাকে সামনে রেখে ইজ়রায়েলকে মান্যতা দিতে যুবরাজ সলমনের উপর চাপ তৈরি করতে পারবেন ট্রাম্প।
২০২৩ সালে চিনা মধ্যস্থতায় শত্রুতা ভুলে কাছাকাছি আসে ইরান ও সৌদি আরব। বেজিঙে হওয়া ঐতিহাসিক চুক্তির জেরে কয়েক দশক পর ফের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হয় তেহরান ও রিয়াধ। ফলে গোটা পশ্চিম এশিয়ায় প্রবল ভাবে ধাক্কা খায় মার্কিন আধিপত্য। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, প্রস্তাবিত পরমাণু চুক্তি দিনের আলো দেখলে পুরোপুরি উল্টে যাবে পাশার চাল। তখন উপসাগরীয় এলাকায় ড্রাগনের ‘অনুপ্রবেশ’ আটকাতে সক্ষম হবে ওয়াশিংটন।
আরও পড়ুন:
ইসলামিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানের কাছেই আছে পরমাণু হাতিয়ার। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলি গুপ্তচরদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরেই ওই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরির মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ইরান। সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে রিয়াধকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের অনুমতি দিয়ে উপসাগরীয় এলাকায় ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও প্রস্তাবিত চুক্তিতে সিলমোহর পড়া মোটেই সহজ নয়।
সৌদি-মার্কিন বেসামরিক পরমাণু সমঝোতার ব্যাপারে সর্বাধিক আপত্তি রয়েছে ইজ়রায়েলের। পশ্চিম এশিয়ার ছোট্ট ওই ইহুদি রাষ্ট্রটি আণবিক শক্তিধর। যদিও সরকারি ভাবে কখনওই গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেনি তেল আভিভ। ধর্মীয় কারণে গোড়া থেকেই প্যালেস্টাইনকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে সুন্নি রিয়াধ। ১৯৪৮, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধে মিশর ও জর্ডনের যৌথবাহিনীতে নানা ভাবে সাহায্য করতে দেখা গিয়েছিল তাদের।
১৯৬৭ সালে ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ কর্মসূচির আওতায় ইরানের হাতে আণবিক চুল্লি তুলে দেয় আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ডোয়াইট ডি আইজ়েনহাওয়ার। মার্কিনপন্থী তেহরানের রাজপরিবারের সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাঁর। ওই ঘটনার ১২ বছরের মাথায় পারস্য উপসাগরের শিয়া মুলুকটির রাজনীতিতে ঘটে যায় নাটকীয় পটপরিবর্তন, ইতিহাসে যা ইসলামীয় বিপ্লব নামে পরিচিত।
১৯৭৯ সালের ওই অভ্যুত্থানে পতন হয় তেহরানের রাজতন্ত্রের। সাবেক পারস্যের যাবতীয় ক্ষমতা হাতে পান কট্টরপন্থী ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমিনি। তাঁর নেতৃত্বে রাতারাতি একটি শিয়া ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রে বদলে যায় ইরান। ৮০-র দশকের শেষ দিকে অত্যন্ত গোপনে আণবিক অস্ত্র তৈরিতে নামে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্র। একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেও তা কখনওই পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি আমেরিকা।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রে যে একই ঘটনা ঘটবে না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। ইহুদিদের অস্তিত্বই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলতে চায় পশ্চিম এশিয়ার মৌলবাদী বহু ইসলামীয় সংগঠন। পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাজ শেষ হলে তাঁদের চাপের মুখে পড়তে পারে রিয়াধ। এখনও ইজ়রায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি তারা। প্রস্তাবিত পরমাণু চুক্তির জন্য এই সংক্রান্ত দাবি যুবরাজ সলমন কতটা মানবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বেসামরিক আণবিক সমঝোতা মার্কিন কংগ্রেসের কড়া পর্যবেক্ষণের মুখে যে পড়তে চলেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ১৯৫৪ সালে এই সংক্রান্ত একটি আইন পাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট। তার ১২৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, পরমাণু চুক্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে বেশ কিছু কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। তার উপর ভিত্তি করে এতে সবুজ সঙ্কেত দেবেন কংগ্রেসের সদস্যেরা।
কেউ কেউ মনে করেন প্রস্তাবিত চুক্তির জন্য কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযানে নেমেছেন তিনি। এর নেপথ্যে অন্যতম যুক্তি হল পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ করছে তেহরান। তা হলে কোন যুক্তিতে আণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ পাবে সৌদি? এই প্রশ্নও উঠতে চলেছে কংগ্রেসের অধিবেশনে।
২০১৮ এবং ২০২৩ সালে মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ় এবং ফক্স নিউজ়ে সাক্ষাৎকার দেন সলমন। সেখানে পরমাণু হাতিয়ার নিয়ে ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। বলেন, ‘‘তেহরান ওই গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করলে নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদেরও সেটা লাগবে।’’ প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে সেই স্বপ্ন পূরণের রাস্তায় যুবরাজ সলমনের হাঁটার আশঙ্কা যে ষোলো আনা, তা মানছে ওয়াকিবহাল মহল।
মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদিদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে ইজ়রায়েলের অন্ধ সমর্থক বলা যেতে পারে। প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর করলে তাঁদের বিরোধিতার মুখেও পড়বেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তা ছাড়া তেল অভিভের মতো ভরসাযোগ্য সহযোগীকে চিরতরে হারাতে পারে ওয়াশিংটন। পশ্চিম এশিয়ায় সেটা আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থী।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। ১৯৮৮ সালে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (নিউক্লিয়ার প্রলিফারেশন ট্রিটি বা এনপিটি) সই করে সৌদি আরব। ফলে বেসামরিক আণবিক সমঝোতাকে ঢাল করে আণবিক হাতিয়ার তৈরি করা রিয়াধের পক্ষে অসম্ভব। সেটা মাথায় রেখেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।
১৯৭১ সালে সোনার সঙ্গে ডলারের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি পুরোপুরি বদলে দেয় আমেরিকা। এর তিন বছরের মাথায় সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি সারে ওয়াশিংটন। সেই সমঝোতায় খনিজ তেল শুধুমাত্র ডলারে বিক্রি করতে সম্মত হয় রিয়াধ। এর জেরে বিশ্ব অর্থনীতির চাবিকাঠি একরকম চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। প্রস্তাবিত পরমাণু চুক্তিতেও দুনিয়া জুড়ে কোনও বড় বদল আসে কি না, সেটাই এখন দেখার।