পাক-সৌদি-তুরস্কের সামরিক চুক্তিতে ‘ইসলামিক নেটো’র জন্ম! বিপদ বুঝে ইহুদিদের সঙ্গে ‘ষড়ভুজ জোটে’ ভারত?
পশ্চিম এশিয়ার পবিত্র শহর মক্কায় ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। এতে কতটা বিপদ বাড়ল ভারত ও ইজ়রায়েলের?
মুসলিম দুনিয়ায় ‘ত্রিশক্তি জোট’। যৌথ সামরিক সমঝোতায় সই করল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘ইসলামিক নেটো’ গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবেই দেখছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। শুধু তা-ই নয়, এর জেরে আগামী দিনে আরও কাছাকাছি আসতে পারে ভারত, ইজ়রায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস। ফলে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটবে নতুন ‘ষড়ভুজ জোটে’র? বাড়ছে সেই জল্পনাও।
‘ইসলামিক নেটো’র বীজ বপণ করা ওই চুক্তির পোশাকি নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট)। চলতি বছরের ৭ অগস্ট তাতে সই করেন সৌদির যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্ডোয়ান এবং পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে পবিত্র মক্কার গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে হওয়া সামরিক সমঝোতাকে তাই হালকা ভাবে নিচ্ছেন না কেউই।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটিতে সশস্ত্র আক্রমণ হলে, সেটিকে বাকিদের উপর হামলা হিসাবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি, এতে সামরিক সমঝোতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। আর সেটা শুধুমাত্র ফৌজি মহড়া, অস্ত্র কেনা-বেচা ও ত্রিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতায় আটকে থাকবে না। পাশাপাশি, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ‘বন্ধুত্ব’র আশ্বাস দিয়েছে ওই তিন রাষ্ট্র।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বহু বিষয় গোপন রাখা হয়েছে। তুরস্কের সূত্রকে উদ্ধৃত করে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘দ্য নিউ আরব’ নামের সংবাদসংস্থা। তাতে আবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আত্মরক্ষার কথা মাথায় রেখে সামরিক সমঝোতায় সম্মত হয়েছে তিন দেশ। উদ্দেশ্য, বহিরাগত আক্রমণের থেকে যৌথ আত্মরক্ষা।
গত বছরের (২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ করে পাকিস্তান। সেখানেও তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। ওই সামরিক সমঝোতার জেরে ইসলামাবাদের ‘পরমাণু অস্ত্রের সুরক্ষা’ রিয়াধ পাবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে শাহবাজ সরকার।
আরও পড়ুন:
আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে আণবিক সুরক্ষার প্রশ্নটিও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে এ ব্যাপারে কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে সামরিক প্রশিক্ষণ, সেনাঘাঁটি ব্যবহার, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ফৌজ ও হাতিয়ারের আদান-প্রদানের মতো সুবিধাকে সংশ্লিষ্ট সমঝোতার অন্তর্ভুক্ত করেছে তিনটি দেশ। সূত্রের খবর, এর পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যও সরবরাহ করছে রিয়াধ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ।
গত বছর (২০২৫ সাল) পাক-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার পর থেকেই ‘ইসলামিক নেটো’ তৈরির দাবিকে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো করে তোলে ইসলামাবাদ। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, তখনই অত্যন্ত সন্তর্পণে এতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করে তুরস্ক। এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে আজকের ‘ত্রিশক্তি জোট’। আগামী দিনে এতে যোগ দিতে পারে কাতারও। এই নিয়ে দোহার সঙ্গে আলোচনা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছে শাহবাজ় সরকার।
সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র নেপথ্য কারণ হিসাবে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। তাঁদের যুক্তি, দশকের পর দশক ধরে আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার তলায় রয়েছে সৌদি আরব। কিন্তু, এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযানে নামার পর থেকে আচমকা সেই পরিস্থিতিতে আসে বড় বদল। সংঘাত বাধতেই তেহরানের পাল্টা প্রত্যাঘাতের মুখে পড়ে রিয়াধ।
বর্তমানে ইরান যুদ্ধের জেরে ত্রিমুখী আক্রমণের শিকার হয়েছে সৌদি প্রশাসন। প্রথমত, দুই ‘সুপার পাওয়ার’কে প্রতিহত করতে পারস্য উপসাগরের হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করেছে তেহরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। অন্য দিকে, তাঁদের মদতপুষ্ট ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা আবার আটকেছে লোহিত সাগর সংলগ্ন বাব এল-মান্দেব প্রণালী। এই দুই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়েই সিংহভাগ খনিজ তেল সরবরাহ করে থাকে রিয়াধ।
আরও পড়ুন:
হরমুজ় ও বাব এল-মান্দেব অবরুদ্ধ হওয়ায় বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে সৌদির তরল সোনার বাণিজ্য। এর জেরে নিম্নমুখী হতে পারে রিয়াধের অর্থনীতির সূচক। গোদের উপর বিষফোড়ার মত, আরব রাষ্ট্রটির মার্কিন সেনাঘাঁটি ও তৈল শোধনাগারগুলিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে নিশানা করছে আইআরজিসি। পাশাপাশি, সৌদির সামরিক ছাউনিতে হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতায় প্রতিহত হচ্ছে না এই সমস্ত আক্রমণ।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র নেপথ্যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের আবার অন্য অঙ্ক রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে পুরনো ‘অটোমান সাম্রাজ্যে’র গরিমা ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন এর্ডোয়ান। একসময় যার অন্তর্ভুক্ত ছিল গ্রিস, সাইপ্রাস ও সিরিয়া-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-’১৮) শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিলুপ্তি ঘটে সেই অটোমান সাম্রাজ্যের। সেই জায়গায় আত্মপ্রকাশ ঘটে আজকের আঙ্কারার।
অন্য দিকে, গত বছর (২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’কে কেন্দ্র করে হওয়া ‘যুদ্ধে’ ফের এক বার ভারতের হাতে বেধড়ক মার খায় পাকিস্তান। ফলে নয়াদিল্লির সামরিক পরাক্রম নিয়ে নতুন করে ইসলামাবাদের মনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। তা ছাড়া গত কয়েক বছর ধরেই আর্থিক ভাবে প্রায় দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমের প্রতিবেশী। ফলে বিপুল খরচ করে আমেরিকা বা ইউরোপের হাতিয়ার আমদানি করতে পারছে না তারা।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের অর্থ এবং আঙ্কারার প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে পাকিস্তান। সম্প্রতি দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিরক্ষা রফতানিকারী রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে তুরস্ক। ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনও ইসলামাবাদকে অত্যাধুনিক বের্যাক্টার টিবি-২ নামের ‘ফিদায়েঁ’ ড্রোন পাঠিয়ে সাহায্য করেন এর্ডোয়ান। এ ছাড়া শক্তিশালী ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক নৌপ্রযুক্তিতে বেশ উন্নতি করেছে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের একাংশের দাবি, এর জেরে আগামী দিনে পাকিস্তানে কোনও ফৌজি অপারেশন চালাতে দু’বার ভাবতে হবে দিল্লিকে। কেউ কেউ আবার মনে করেন এই জোট ইহুদিদের জন্য বেশি বিপজ্জনক। তাই সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় সই হওয়ার ঠিক আগের দিন (পড়ুন ৬ অগস্ট) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একটি ‘ষড়ভুজ জোট’ তৈরির কথা বলতে শোনা যায় ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধানকে। ভারত, ইজ়রায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে নিয়ে যেটা গড়ে তুলতে চাইছেন নেতানিয়াহু। ওই জোটে ষষ্ঠ সদস্য হিসাবে আফ্রিকার কোনও সদস্যকে রাখার পক্ষপাতী তেল আভিভ। পাশাপাশি, নয়াদিল্লির সঙ্গে ক্রমাগত সামরিক ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার ওই ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্র।
পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে ইজ়রায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কিছু দিন আগে একটি অনুষ্ঠানে এ ব্যাপারে মুখ খোলেন সাবেক ইহুদি প্রধানমন্ত্রী ন্যাফতালি বেনেট। তিনি বলেন, ‘‘ক্রমাগত আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে আঙ্কারা। অবিলম্বে তাদের ঠেকাতে না পারলে আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের উপর এর্ডোয়ানের বিরুদ্ধে তেল আভিভ সামরিক অভিযানে নামবে বলে মনে করা হচ্ছিল। যদিও বাস্তবে তা হয়নি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বেঞ্জামিন প্রস্তাবিত ‘ষড়ভুজ জোট’ কখনওই কোনও সামরিক চুক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে না। বরং এতে যৌথ উদ্যোগে হাতিয়ার নির্মাণ, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অস্ত্র সরবরাহ এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদানের মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পেতে পারে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক ভাবে সেটা করে থাকে ভারত, ইজ়রায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি।
গত কয়েক দশক ধরেই তেল আভিভের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একাধিক হাতিয়ার তৈরি করছে নয়াদিল্লি। তার মধ্যে ‘আত্মঘাতী’ ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া যুদ্ধের মধ্যে আয়রন ডোম এয়ার ডিফেন্সের ইন্টারসেপ্টর রকেট ফুরিয়ে আসায়, জরুরি ভিত্তিতে সেগুলি ভারতে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইজ়রায়েল। পাশাপাশি, ইরানি ড্রোন হামলা ঠেকাতে আমিরশাহির হাতে ওই আকাশ প্রতিরক্ষা তুলে দিয়েছে তারা।
তবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির উপর ভিত্তি করে ‘ইসলামিক নেটো’ তৈরি হওয়ার ব্যাপারে সাবেক সেনাকর্তাদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ১৯৪৯ সালে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন নামের সামরিক চুক্তি করে আমেরিকা। সুনির্দিষ্ট সামরিক দফতর, কমান্ড কাঠামো এবং যৌথ বাহিনীও এর অন্তর্গত। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া বা আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে এই নেটো ফৌজ।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এই সব কিছুর অভাব রয়েছে। গত বছর (২০২৫ সাল) হওয়া সমঝোতা মেনে বর্তমানে সৌদি আরবে কিছু সেনা পাঠিয়েছে পাকিস্তান। তবে কোনও অবস্থাতেই সরাসরি তেহরানের বিরুদ্ধে লড়তে রাজি নয় ইসলামাবাদ। ফলে সংশ্লিষ্ট সমঝোতা ভারতের জাতীয় সুরক্ষাকে কখনও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।