সমাজমাধ্যমে ছবি বা ভিডিয়ো পোস্টে নিষেধাজ্ঞা সৌদি আরবে! সলমনের সিদ্ধান্তে ‘অস্বস্তি’তে প্রবাসী ভারতীয় সমাজ
সমাজমাধ্যমে ছবি বা ভিডিয়ো পোস্ট করা যাবে না। আচমকা কেন এমন নির্দেশিকা জারি করলেন সৌদি আরবের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন?
স্থিরচিত্র হোক বা ভিডিয়ো, তোলা যাবে না কিছুই। শুধু তা-ই নয়, ভুলবশত ক্যামেরাবন্দি কোনও বিষয় সমাজমাধ্যমে পোস্ট করলেই হবে কড়া শাস্তি। সৌদি আরবের এ-হেন নির্দেশিকায় দুনিয়া জুড়ে পড়েছে শোরগোল। যদিও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সেখানে বসবাসকারী ভারতীয়দের জন্য তড়িঘড়ি বিশেষ ‘অ্যাডভাইজ়রি’ জারি করতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করে সৌদির ভারতীয় দূতাবাস। সেখানে রিয়াদের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তিকে তুলে ধরে তারা। পাশাপাশি, আরব রাষ্ট্রটিতে বসবাসকারী এ দেশের নাগরিকদের স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংসের ভিডিয়ো তোলা ও তার তথ্য সরবরাহ।
গত সেপ্টেম্বর থেকে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার আক্রমণের জেরে তটস্থ সৌদি প্রশাসন। খনিজ তেলের শোধনাগার থেকে শুরু করে বিমানবন্দর— রিয়াদের প্রতিটা কৌশলগত এলাকাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে নিশানা করছে তারা। আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থার সাহায্যে সেগুলিকে আটকানোর চেষ্টা চালিয়েও কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে আরবের ফৌজ।
ইন্টারনেটের দৌলতে হুথি হামলার সেই সমস্ত ছবি সমাজমাধ্যমে নিমেষে ভাইরাল হয়ে যায়। এতে অনেকটাই বেআব্রু হয়ে পড়েছে খনিজ তেল সমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রটির সামরিক দুর্বলতা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সেই কারণেই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ হামলার ভিডিয়ো তোলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন রিয়াদের যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন। সে দেশের কাউকেই এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়নি।
সৌদির এ-হেন পদক্ষেপকে মোটেই বাঁকা চোখে দেখছেন না সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ। তাঁদের যুক্তি, সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া যুদ্ধের ভিডিয়ো শুধুমাত্র সাধারণ নেটাগরিকরা দেখছেন, এমনটা নয়, এর উপর কড়া নজর রয়েছে হুথিদেরও। ছবি, ভিডিয়ো বিশ্লেষণ করে আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেট কোথা থেকে ছোড়া হচ্ছে, তার আন্দাজ পাওয়া তাদের পক্ষে একেবারেই কঠিন নয়।
আরও পড়ুন:
রিয়াদের কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো বা এলাকায় হামলা চালাতে এমনিতেই মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর কৃত্রিম মেধা ‘ক্লড’-এর সাহায্য নিচ্ছে হুথি। বহু চেষ্টা করেও সেটা আটকাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এর উপর আকাশ প্রতিরক্ষার হাতিয়ার কোথায় কোথায় মোতায়েন আছে, সেটা জেনে গেলে পরিস্থিতি যে আরও খারাপ হবে, তা বলাই বাহুল্য। সেই ঝুঁকি এড়াতেই এই নির্দেশিকা জারি করেছেন যুবরাজ সলমন।
সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিলে আরও একটি কারণে হুথি হামলার ক্ষতচিহ্ন লুকোতে চাইছে সৌদি প্রশাসন। বর্তমানে শুধুমাত্র খনিজ তেলের ব্যবসায় নিজেদের আটকে রাখতে চাইছে না রিয়াদ। এর পাশাপাশি পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের উপর জোর দিয়েছে তারা। বিদেশি ধনকুবেরদের কাছে টানতে একাধিক ঝাঁ-চকচকে শহরও গড়ে তুলছেন যুবরাজ সলমন।
কিন্তু, ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের লাগাতার হামলার জেরে অনেকটাই ধাক্কা খেয়েছে সৌদির সেই ভাবমূর্তি। তাদের জনবহুল শহরগুলির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আছড়ে পড়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ। বিস্ফোরণ ও বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড দেখেছে রিয়াদের বিমানবন্দর। স্বাভাবিক ভাবেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই সমস্ত ভিডিয়োয় যথেষ্ট আতঙ্কিত বিদেশিরা। আর তাই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেরও চেষ্টা চালাচ্ছেন সলমন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সৌদির এই পদক্ষেপ নিজস্ব মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। অতীতে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকেও একই রাস্তায় হাঁটতে দেখা গিয়েছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে নামে আমেরিকা। লড়াই বাধতেই পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলিতে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে তেহরান। ফলে বিপদে পড়ে আবু ধাবি।
আরও পড়ুন:
পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আমিরশাহিতেও রয়েছে সুবিশাল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। যুদ্ধের গোড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে ওই এলাকায় হামলা চালায় ইরানি আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুবাই, আবু ধাবি বা শারজার মতো ঝাঁ-চকচকে শহরগুলিকে নিশানা করতে থাকে তারা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেখানকার বিলাসবহুল হোটেল, বিমানবন্দর থেকে কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার।
ইরানি আক্রমণ তীব্র হতেই আমিরশাহি ছাড়তে বিদেশিদের একাংশের মধ্যে পড়ে যায় হুড়োহুড়ি। অন্য দিকে, ইরানি হামলা কেন আটকানো যাচ্ছে না, তার চুলচেরা বিশ্লেষণে বসেন আবু ধাবির সেনাকর্তারা। এর পরই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাঝ-আকাশে ধ্বংসের ছবি বা ভিডিয়ো তোলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওই আরব রাষ্ট্র। ভাবমূর্তি মেরামতে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন সমাজমাধ্যমে পোস্ট করার উপরেও তালা লাগিয়ে দেয় তারা।
যদিও আমিরশাহির পথে হেঁটে সৌদি আরব কতটা সাফল্য পাবে, তা নিয়ে দানা বেঁধেছে সন্দেহ। হুথি হামলার জেরে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইতিমধ্যেই বাতিল বা স্থগিত হয়েছে সেখানকার একাধিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। তালিকায় নাম আছে ইউসিআই আরবান সাইক্লিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ, ফিফা ই-ফাইনাল্স, সিক্স কিংস স্ল্যাম টেনিস টুর্নামেন্ট এবং ষষ্ঠ এশিয়ান ইন্ডোর অ্যান্ড মার্শাল আর্টস গেমস।
২০৩৪ সালে পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নিয়েছে ফিফা। কিন্তু, তত দিন পর্যন্ত যুদ্ধ চললে অন্যত্র সরতে পারে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার এই মেগা ইভেন্ট। আর তাই জাতীয় সুরক্ষায় একাধিক দেশের সামরিক সাহায্য পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রিয়াদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্ককে সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার অনুরোধ করতে দেখা গিয়েছে যুবরাজ সলমনকে।
১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি প্রশাসন। সূত্রের খবর, ফাঁসি নয়, ধড়-মুণ্ড আলাদা করে চরম সাজা দেওয়া হয় তাঁদের। নিহতদের মধ্যে এক জন পুরুষ ও অন্য জন মহিলা। ইসলামের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজে লিপ্ত থাকায় অভিযুক্ত ছিলেন তাঁরা। যদিও সেটা কী, সরকারি ভাবে স্পষ্ট করেনি রিয়াধ।
বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশটি হল সৌদি আরব। বছরে গড়ে ৩৫০ জনকে প্রাণদণ্ড দিয়ে থাকে রিয়াদ। এর আবার দু’টি পদ্ধতি রয়েছে। একটি হল শিরচ্ছেদ। তা ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে গুলি করেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে থাকে তারা। আরব রাষ্ট্রটিতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আইন না মানলে তাদেরও হত্যা করার প্রবণতা রয়েছে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্রের।
সৌদিতে বর্তমানে প্রায় ২৭.৪৮ লক্ষ ভারতীয় রয়েছেন। ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তার মতো বহু উঁচু পদে কাজ করেন তাঁরা। স্থানীয় আইন না মানার জেরে যাতে কোনও রকম জটিলতার মুখে তাঁদের পড়তে না হয়, সেই কথা মাথায় রেখে বিশেষ ‘অ্যাডভাইজ়রি’ জারি করেছে সেখানকার ভারতীয় দূতাবাস। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রিয়াদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।