অপরাধ কি কপালে চুম্বন? ঢাকাকে না জানিয়ে বাংলাদেশি ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’র ধড়-মুণ্ড কেন আলাদা করল সৌদি আরব?
মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজ করার অপরাধে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ করল সৌদি আরব। ঢাকাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে উঠছে অভিযোগ।
কখনও হুথি হামলার কড়া নিন্দা। কখনও আবার মক্কা সামরিক চুক্তিতে যোগ দিতে চেয়ে ‘লাফালাফি’। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইস্তক সৌদি আরবকে প্রবল ভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে ঢাকা। এ-হেন পরিস্থিতিতে আচমকাই ছন্দপতন। সবাইকে চমকে দিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল রিয়াদ। শুধু তা-ই নয়, তাদের ‘সম্পূর্ণ অন্ধকারে’ রেখে এই পদক্ষেপ করায় বেজায় অস্বস্তিতে ভারতের পূর্বের প্রতিবেশী।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি প্রশাসন। সূত্রের খবর, ফাঁসি নয়, ধড়-মুণ্ড আলাদা করে চরম সাজা দেওয়া হয় তাঁদের। নিহতদের মধ্যে একজন পুরুষ ও অন্যজন মহিলা। ইসলামের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজে লিপ্ত থাকায় অভিযুক্ত ছিলেন তাঁরা। যদিও সেটা কী, সরকারি ভাবে স্পষ্ট করেনি রিয়াদ।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয় একাধিক ভিডিয়ো। সেগুলির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম। নেটাগরিকদের একাংশের দাবি, অভিযুক্ত পুরুষ মক্কার একটি মসজিদচত্বরে মহিলার কপালে চুম্বন করেন। কিছু ভিডিয়োয় আবার দু’জনকে মুখোমুখি বসে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। এগুলিকেই নাকি ‘অনৈতিক’ কাজের তকমা দিয়ে ওই যুগলকে চরম শাস্তি দিয়েছে সৌদি প্রশাসন।
বিশ্বের তাবড় ইসলামীয় রাষ্ট্রের মতোই শরিয়া আইন মেনে চলে সৌদি আরব। এতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মোট তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলি হল, কিসাস, হুদুদ এবং তাজ়ির। মূলত খুনের মামলার সাজা দিতে প্রথমটি ব্যবহারের রেওয়াজ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে হুদুদ প্রযোজ্য। এ ছাড়া, মাদকপাচার ও বিবেচনামূলক শাস্তি হয় তাজ়ির পদ্ধতিতে। এতে প্রাণদণ্ড অনেকটাই বিচারকের মর্জির উপর নির্ভরশীল।
উল্লেখ্য, সৌদির বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দিলে তা কার্যকরের অনুমোদনে জারি হয় রাজকীয় আদেশ। এর পরই মক্কার সুনির্দিষ্ট বধ্যভূমিতে অপরাধীদের নিয়ে যায় স্থানীয় প্রশাসন। সেখানে জনসমক্ষে তরবারি দিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয় তাঁদের। এ ছাড়া গুলি করে হত্যারও রেওয়াজ রয়েছে। সূত্রের খবর, তাজ়ির পদ্ধতিতে দুই বাংলাদেশির প্রাণদণ্ড কার্যকর করেছে রিয়াদ। যদিও এ ব্যাপারে বিশেষ কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
আরও পড়ুন:
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে উদ্ধৃত করে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেছে স্থানীয় গণমাধ্যম। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বশির এবং সিতি আখতার। সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশের দাবি, সম্পর্কে তাঁরা প্রেমিক-প্রেমিকা। তবে সরকারি বিবৃতি না আসায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। অন্য দিকে, ঢাকার সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দাবিগুলিকে অস্বীকার করেছে নজরুলের পরিবার।
২০২২ সালে সৌদি যান বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ব্রাহ্মণবেড়িয়া সদর উপজেলার বাসিন্দা আবদুল বশির ও রহিমা বেগমের বড় ছেলে নজরুল। পরিবার সূত্রে খবর, সেখানে ইসলামের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মক্কার মসজিদুল হারামে সাফাইকর্মীর কাজ করতেন তিনি। আট মাস পর হঠাৎই তাঁকে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। শিরশ্ছেদ হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে জেলবন্দি রাখে আরব রাষ্ট্রটির সরকার।
নিহতের আত্মীয়েরা ‘প্রথম আলো’কে জানিয়েছেন, গত ১১ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে শেষ বার কথা বলেন নজরুল। এর তিন দিনের মাথায় তাঁর প্রাণদণ্ড কার্যকর করে রিয়াদ প্রশাসন। সেই খবর শুনেই জ্ঞান হারান নজরুলের মাসি তথা বছর ৬৫-র আবেদা বেগম। পরে মৃত্যু হয় তাঁর। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সৌদিতে ২৪ বছর কর্মরত ছিলেন নজরুলের বাবা আবদুল বশির। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।
নজরুলের পরিবারের অভিযোগ, আগে থেকে কোনও নোটিস দেওয়া হয়নি তাঁদের। এ ব্যাপারে ঢাকার গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’কে বশির বলেন, ‘‘আমার ছেলেকে যদি বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকে, তবে আমি ন্যায়বিচার চাই।’’ অন্য দিকে, এই ঘটনায় এক পাকিস্তানি সহকর্মীর বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুলেছেন নিহতের দুই আত্মীয় মোস্তাকিম ভুঁইয়া ও ইমাম হাসান ভুঁইয়া।
আরও পড়ুন:
নজরুলের বাবা জানিয়েছেন, আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে কলেজে পড়াকালীনই বড় ছেলেকে সৌদি পাঠান তিনি। অন্য দিকে, সিতি আখতার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি। বশিরের কথায়, ‘‘আমরা মেয়েটিকে চিনি না। শুনেছি দু’জনে এক জায়গায় কাজ করত।’’ নজরুলের সঙ্গে সিতির প্রেম বা বিবাহের কথা উড়িয়ে দেন তিনি। যদিও সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি বাংলা’কে সম্পূর্ণ অন্য কথা বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবারের এক সদস্য।
ওই ব্যক্তির দাবি, সিতির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন নজরুল। একসময় নাকি সেটা স্বীকারও করেছিলেন তিনি। প্রাণদণ্ড কার্যকরের পর দু’জনেরই নিথর দেহ ফেরানো হয় বাংলাদেশে। ঢাকা-রিয়াদ বিমান পরিষেবা স্থগিত থাকায় এতে কিছুটা বাড়তি সময় লেগেছে বলে জানান তারেক সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এর পর রীতি মেনে সমাধিস্থ করা হয় তাঁদের।
দুই বাংলাদেশির এ ভাবে শিরশ্ছেদের ঘটনায় সৌদির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আমজনতার বাড়ছে ক্ষোভ। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেছেন সে দেশের আইনজীবী রায়হান রশিদ। সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে তিনি লেখেন, ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনও বিদেশি নাগরিককে আটক, গ্রেফতার বা মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম সাজা দিলে সেই দেশের দূতাবাসকে জানানো বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশি গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’ আবার জানিয়েছে, এ বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি সরকারের থেকে জেলবন্দি নাগরিকদের একটি তালিকা পায় জেড্ডায় অবস্থিত ঢাকার দূতাবাস। সেখানে নজরুল ও সিতির নাম ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ব্যাভিচার’-এর অভিযোগ থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়নি। তারেক সরকারের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অভিযোগ, শিরশ্ছেদের আগে কোনও কিছু জানায়নি রিয়াদ।
শামা ওবায়েদের দাবি, নজরুল ও সিতির প্রাণদণ্ড কার্যকরের খবর গণমাধ্যমের থেকে জানতে পারেন তিনি। ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জ়াফর এইচ বিন আবিয়াহের কাছে এই ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে তারেক সরকার। বাংলাদেশ বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন। ভিয়েনা কনভেনশনের নিয়ম কেন মানা হল না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
চলতি বছরে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিল সৌদির আদালত। সম্প্রতি, ধর্মীয় অবমাননার জন্য চরম শাস্তি পান শ্রীলঙ্কার আনোজনা সিভারাসা। যদিও কলম্বোর হস্তক্ষেপে সেটা বাতিল করে রিয়াদ। প্রাণদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে এই আরব রাষ্ট্র। মানবাধিকার নজরদার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, গত বছর (২০২৫ সালে) ৩৫৬টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তারা।
প্রতি বছর কাজের খোঁজে সৌদিতে পাড়ি দেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। মূলত নির্মাণশ্রমিক বা সাফাইকর্মীর কাজ করে থাকেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের দাবি, সেই কারণেই এঁদের সে ভাবে গুরুত্ব দিতে নারাজ রিয়াদ। নভেম্বরে আরব রাষ্ট্রটিতে সফরে যাবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক। ঠিক তার আগে নজরুল ও সিতির শিরশ্ছেদের ঘটনায় এই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনও ফাটল ধরে কি না, সেটাই এখন দেখার।