টেস্টটিউব ভেঙে ‘প্লেগে’ মৃত্যু তরুণী গবেষকের, ফিরল সেই ভয়ঙ্কর সংক্রামক রোগ? বাড়ছে আতঙ্ক, পাত্তাই দিচ্ছে না মস্কো
দারিয়া শিপিলোভা নামের তরুণী গবেষক ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কর্মরত ছিলেন। হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীদের তিনি জানান, কাজের সময় ভুলবশত জীবন্ত ব্যাক্টেরিয়াভর্তি একটি টেস্টটিউব ভেঙে ফেলেছিলেন। ১ অক্টোবর মারা যান ওই তরুণী।
আবার কি সে এসেছে ফিরিয়া? প্লেগ কি হানা দিল ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ রাশিয়ায়? ভয়াবহ এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় কাঁটা রুশ জনগণ। একসময় গোটা ইউরোপ তছনছ করেছিল এই ভয়ঙ্কর মহামারি। ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেই রোগে। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সেই ক্ষত বহন করতে হয়েছিল।
সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে তাই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব ইউরোপের দেশটিতে। সাইবেরিয়ায় এক তরুণী গবেষকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে হঠাৎই বেড়েছে সতর্কতা। মাত্র ২৮ বছর বয়সে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে প্লেগ সংক্রান্ত গবেষণায় যুক্ত ওই বিজ্ঞানীর। মৃতের নাম দারিয়া শিপিলোভা।
পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষণাগারের টেস্টটিউব ভেঙে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ওই তরুণী গবেষকের। তার জেরেই প্লেগ সংক্রমণের আতঙ্ক ছড়িয়েছে রাশিয়ার সাইবেরিয়ায়। শিপিলোভার মৃত্যুর পরেই হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মীদের নিভৃতবাসের ব্যবস্থা করেছে রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রক। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বার করার কাজ শুরু করেছেন সে দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
তরুণী সাইবেরিয়ার শেলেকভের একটি গবেষণাগারে কর্মরত ছিলেন। ওই গবেষণাগারে প্লেগরোধক ওষুধ নিয়েই গবেষণা হয়। কিন্তু সেই কাজের সময়েই প্লেগের ব্যাক্টেরিয়াভর্তি একটি টেস্টটিউব ভেঙে শিপিলোভা আক্রান্ত হন বলে দাবি।
সংবাদমাধ্যম ডেলি মেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিপিলোভা ‘ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’ কর্মরত ছিলেন। হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীদের তিনি জানান, কাজের সময় ভুলবশত জীবন্ত ব্যাক্টেরিয়াভর্তি একটি টেস্টটিউব ভেঙে ফেলেছিলেন। মঙ্গোলিয়া সীমান্তের কাছে রাশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রীয় অঞ্চল বুরিয়াতিয়াতে একটি ফিল্ড অভিযানে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরে তাঁকে শেলেকভ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
আরও পড়ুন:
গত ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তাঁকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তির দু’দিন পর ১ অক্টোবর মারা যান ওই তরুণী। তাঁর মৃত্যুর পরেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। শতাধিক বাসিন্দাকে নিভৃতবাসে (কোয়রন্টাইন) পাঠানো হয়েছে। পাঁচটি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে খবর। প্লেগ অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় রোগ ছড়ানো ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন, এমনটাই দাবি সংবাদমাধ্যমের।
ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কাজ করার সময় ওই তরুণী কোনও বিপজ্জনক ব্যাক্টেরিয়ার সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন। এমন আশঙ্কার খবর ছড়াতেই সতর্কতা জোরদার করেছে হাসপাতালগুলি। সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় আধিকারিকেরাও তৎপরতা বাড়িয়েছেন এবং পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছেন তাঁরা।
সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তাই রুশ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই প্রায় ২০০ জন চিকিৎসককে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। সংক্রমণ ঠেকাতে একাধিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও মৃত গবেষকের মৃত্যুর সঙ্গে প্লেগের সরাসরি কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত করেননি কর্তৃপক্ষ।
রাশিয়ার জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘রস্পোট্রেবনাদজ়র’ অবশ্য দাবি করেছে, গবেষকের মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাতপরিচয় একটি নিউমোনিয়া। মস্কোর এই সংস্থা জানিয়েছে, প্লেগের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই এই মৃত্যুর। ওই গবেষকের পেশাগত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও অণুজীবের উপস্থিতি তাঁর শরীরে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:
রাশিয়ার স্বাধীন আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ‘লিউদি বাইকালা’র প্রতিবেদনকে উল্লেখ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, শিপিলোভার চিকিৎসা চলা শেলেকভ হাসপাতালে প্রায় ২০০ জনকে নিভৃতবাসে (কোয়রন্টাইন) পাঠানো হয়েছে। ডেলি মেলের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই অঞ্চলের আরও তিনটি হাসপাতালে নিভৃতবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আঁচ করে মস্কো থেকে প্রায় ৪,২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ইরকুটস্ক অঞ্চলে পৌঁছোন রাশিয়ার জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান আনা পোপোভা। সেখানে তিনি পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন।
এত কিছুর পরও রাশিয়ার স্বাস্থ্যকর্তারা জোর দিয়ে জানিয়েছেন যে, এখনও পর্যন্ত প্লেগের প্রাদুর্ভাবের কোনও প্রমাণ তাঁদের হাতে আসেনি। ইরকুটস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভের দাবি, মৃত গবেষকের সংস্পর্শে আসা সমস্ত ব্যক্তিই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তাঁদের কারও মধ্যে এই মারণরোগের কোনও উপসর্গ দেখা যায়নি। এমনকি তাঁদের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলও নেগেটিভ এসেছে।
যে গবেষণাগারের প্লেগ সংক্রান্ত গবেষণার কাজকর্ম চলত তার কাছেই রয়েছে একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সেখানকার কর্মীদের মাস্ক পরার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিকর্তারা। একই সঙ্গে, বাসিন্দাদের গুজব বা পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনে কান না দিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারি ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের উপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়েছে কারখানার পরিচালনগোষ্ঠী।
শিপিলোভার মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মার্কিন কর্মকর্তা রবিবার জানিয়েছেন, রাশিয়ায় প্লেগ ছ়ড়ানোর মতো সন্দেহভাজন একটি ঘটনার কথা কানে এসেছে ওয়াশিংটনের। এর জেরে কোয়রন্টাইনের বিষয়টি হোয়াইট হাউস পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরকুটস্ক অঞ্চলের শেলেখভে প্লেগের আশঙ্কায় কোয়ারন্টাইন জারি করার পরিস্থিতি অনেকটাই উহানের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে রাশিয়ার রাজনৈতিক তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক টেলিগ্রাম চ্যানেল ‘নেজিগার’। যদিও এ ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কোনও বিবৃতি দেয়নি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।
প্লেগ যত ধরনের আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সংক্রামক ও ভয়াবহ এই নিউমোনিক প্লেগ। আক্রান্ত হওয়ার সাত দিনের মধ্যেই ফুসফুস ছারখার করে দিতে পারে রোগের জীবাণু। শুধু তা-ই নয়, আক্রান্তের থেকে চারপাশের মানুষজনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নিউমোনিক প্লেগে শ্বাসনালির পথ বন্ধ হয়ে যায়। আক্রান্তের ধুম জ্বর আসে, মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কাশি বা লালার সঙ্গে রক্তও বেরোতে পারে। একসময় নিউমোনিক প্লেগের কোনও চিকিৎসা ছিল না, তবে এখন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এর নিরাময় সম্ভব। তবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই চিহ্নিত করতে হবে। না হলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হতে পারে রোগীর।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণী গবেষকের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। এই ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই— শিপিলোভার অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ কি সত্যিই প্লেগ? বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের প্রধান আলেক্সেই সিদেনভ দাবি করেছেন, ওই গবেষক ‘সম্ভবত প্লেগে’ আক্রান্ত হয়েই মারা গিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এ-ও স্পষ্ট করেছেন, বুরিয়াতিয়ায় এখনও প্লেগের কোনও প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
অন্য দিকে, সরকারি সংস্থা রস্পোট্রেবনাদজ়র এখনও প্লেগ সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির প্রাক্তন প্রধান গেন্নাদি ওনিশচেঙ্কো এই সংক্রমণটি খুব সম্ভবত প্লেগ নয় বলে রাশিয়ার সংবাদসংস্থা ‘তাস’কে জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্লেগের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলক ভাবে কম।
ফলে শিপিলোভার অসুস্থতা ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যায়নি। এক দিকে স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্যে প্লেগের আশঙ্কার কথা উঠে আসছে। অন্য দিকে জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাও সরকারি ভাবে তা নিশ্চিত করেনি। এই পরস্পরবিরোধী দাবিই ঘটনাটিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ।