‘ফুটো পকেট’ দশা থেকে চার বছরের মধ্যেই ভোলবদল! কী ভাবে ভারতের চেয়েও ‘বড়লোক’ হয়ে উঠল শ্রীলঙ্কা?
বিশ্ব ব্যাঙ্কের সদ্য প্রকাশিত উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় জায়গা পেয়েছে শ্রীলঙ্কা। সেই দিক থেকে ভারতকে ছাপিয়ে গিয়েছে কলম্বো। আর্থিক বৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকা সত্ত্বেও কেন পিছিয়ে নয়াদিল্লি?
মাঝে মাত্র চার বছরের ব্যবধান। তার মধ্যেই পাল্টে গেল যাবতীয় হিসাব। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রকেই এ বার ভারতের থেকেও ‘ধনী’ বলে ঘোষণা করল বিশ্ব ব্যাঙ্ক। কী ভাবে ‘ফুটো পকেট’ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াল তারা? নেপথ্যে রয়েছে কোন রহস্য? আনন্দবাজার ডট কম-এর এই প্রতিবেদনে রইল তার হদিস।
সম্প্রতি, আয়ের শ্রেণিবিন্যাসের নিরিখে দেশগুলির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। সেখানেই ভারতের চেয়ে ‘বড়লোক’ রাষ্ট্রের তকমা পেয়েছে শ্রীলঙ্কা। দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্রকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির তকমা ফিরিয়ে দিয়েছে ওই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি কলম্বোর জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তিজনক।
এই ধরনের তালিকার প্রায়ই রদবদল করে থাকে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। এ বারের তালিকা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের (২০২৭ সাল) ৩০ জুন পর্যন্ত বৈধ থাকবে বলে জানিয়েছে ওই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এতে ২১৮টি দেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করা রয়েছে। এর মধ্যে উচ্চতর আয়ের শ্রেণিতে জায়গা করে নিয়েছে ছ’টি রাষ্ট্র।
বিশ্ব ব্যাঙ্ক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডারের (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বা আইএমএফ) মতো প্রতিষ্ঠানগুলি দু’টি হিসাবে কোনও রাষ্ট্রের আর্থিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে থাকে। একটি হল মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট)। দ্বিতীয়টির পোশাকি নাম গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম (জিএনআই) পার ক্যাপিটা। একে সহজ কথায় মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বলা যেতে পারে।
জিএনআই পার ক্যাপিটা বার করতে হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জাতীয় আয়ের অঙ্ক জানতে হবে। মোট জনসংখ্যা দিয়ে সেটিকে ভাগ করলে যেটা দাঁড়াবে সেটাই হল ওই দেশের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বা জিএনআই পার ক্যাপিটা। বিশ্ব ব্যাঙ্কের হিসাবে সেখানে ভারতের থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছে শ্রীলঙ্কা। কলম্বোর পাশাপাশি এ ব্যাপারে উন্নতি করেছে ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, জর্ডন এবং ফেডারেটেড স্টেটস অফ মাইক্রোনেশিয়া।
আরও পড়ুন:
মাথাপিছু গড় আয়ের নিরিখে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রতি বারই একটি সূচক স্থির করে থাকে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। এ বারও তার অন্যথা হয়নি। চলতি বছরে ১১৩৬-৪৪৯৫ ডলারের জিএনআই পার ক্যাপিটাভুক্ত দেশগুলিকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের গোষ্ঠীতে রেখেছে এই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যে রাষ্ট্রগুলির মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের পরিমাণ এর থেকে বেশি, বিশ্ব ব্যাঙ্কের উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে জায়গা পেয়েছে তারা।
বিশ্ব ব্যাঙ্কের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার জিএনআই পার ক্যাপিটার পরিমাণ হল ৪৬৭০ ডলার। ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্সের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা যথাক্রমে ৪৯৭০ এবং ৪৮৫০ ডলার বলে জানা গিয়েছে। সেখানে ভারতের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় ২,৫০০-২,৭০০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। সেই কারণেই দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্রকে নয়াদিল্লির তুলনায় ‘ধনী’ বলে উল্লেখ করেছে ওই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
আর্থিক বৃদ্ধির নিরিখে শ্রীলঙ্কার থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে আছে ভারত। কিন্তু, তার পরেও বিশ্ব ব্যাঙ্কের চোখে দ্বীপরাষ্ট্র বেশি ধনী হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। আর তাই জিডিপির সূচক যতই বেশি হোক না কেন, মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় হিসাব করলে, সেই অঙ্ক সব সময় কমই হয়। ফলে নিম্ন-মধ্যম আয়ের আর্থিক শ্রেণিতেই বার বার ঠাঁই হচ্ছে ভারতের।
আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, এ দেশের বিশাল জনসংখ্যার মাথাপিছু গড় আয় তুলনামূলক ভাবে কম। এর জেরে জিডিপি বৃদ্ধির হার শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও আমজনতার গড় উপার্জন উচ্চ-মধ্যম আয়ের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। তা ছাড়া বেশ কিছু রাজ্যের ক্ষেত্রে আয় ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য রয়েছে। সেটাও জাতীয় গড়কে প্রভাবিত করছে।
আরও পড়ুন:
অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য মনে করেন, ভারতের জিডিপির সূচক যে গতিতে বাড়ছে, সেটা বজায় থাকলে ঊর্ধ্বমুখী হবে মাথাপিছু গড় আয়। সে ক্ষেত্রে আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্ব ব্যাঙ্কের উচ্চ-মধ্যম আয়ের শ্রেণিতে ঢুকে পড়তে পারে নয়াদিল্লি। তবে এ ব্যাপারে স্বতঃসিদ্ধ কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিদের দাবি, কোনও দেশের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের নিরিখে তার আর্থিক স্বাস্থ্য বা উন্নয়নের পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মানের মতো বিষয়গুলো শুধুমাত্র মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয় না।
বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, গত চার দশকে দুনিয়াব্যাপী অর্থনীতির নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ করা গিয়েছে। ১৯৮৭ সালে প্রায় ৩০ শতাংশ রাষ্ট্রকে নিম্ন আয়ের শ্রেণিতে রেখেছিল তারা। চলতি বছরে সেটাই কমে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। এই সংখ্যায় আরও বদল আসবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দুনিয়ার তাবড় আর্থিক বিশ্লেষকেরা।
বর্তমানে ভারতের অর্থনীতিকে বিশ্বের অন্যতম ‘দ্রুত বর্ধনশীল’-এর তালিকায় রেখেছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান এবং পূর্ব ইউরোপের ইউক্রেন সংঘাত সত্ত্বেও ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরে নয়াদিল্লির জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৬ শতাংশ বজায় থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। এ ছাড়া ২০২৭ এবং ২০২৮ সালে এ দেশের অর্থনীতির সূচক ৭.২ শতাংশ এবং ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার মিলেছে ইঙ্গিত।
অন্য দিকে গত বছর (২০২৫ সাল) ‘দিটওয়া’ ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় ভারতের দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র। ফলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের অর্থনীতি। সেই সঙ্কট কাটাতে আইএমএফের থেকে জরুরি ভিত্তিতে ২০ কোটি ৬০ লক্ষ ডলারের ঋণ নেয় লঙ্কা সরকার। এ বছরের মে মাসে ফের ৬৯ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারের ঋণ কলম্বোকে অনুমোদন করে ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, এ ভাবে ঘন ঘন আইএমএফের থেকে টাকা ধার নেওয়া কোনও রাষ্ট্রের আর্থিক স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেই স্বস্তিজনক নয়। ফলে মাথাপিছু জাতীয় গড় আয়ের নিরিখে এগিয়ে গেলেও বছর চারেক আগে শুরু হওয়া আর্থিক সঙ্কট যে লঙ্কা সরকার পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে, সে কথা বলা যাবে না। তবে খাদে পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে যে তুলে আনার চেষ্টা কলম্বো চালাচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
২০২২ সালে ৪,৬০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র। পাশাপাশি, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার খালি হয়ে যাওয়ায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানি করতে পারছিল না কলম্বো। ফলে দেশ জুড়ে শুরু হয় প্রবল গণবিক্ষোভ। একসময় তা আছড়ে পড়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের প্রাসাদে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয় তাঁকে।
এই আর্থিক বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে ২০২৩ সালে আইএমএফের দ্বারস্থ হয় দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র। পাশাপাশি, দেশের আর্থিক সংস্কারে পাবলিক ডেটা ম্যানেজমেন্ট অফিস বা পিডিএমও নামের নতুন একটি দফতর তৈরি করে লঙ্কা প্রশাসন। এর পরই কলম্বোকে ২৯০ কোটি ডলারের ঋণ মঞ্জুর করে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার।
শ্রীলঙ্কার আইএমএফের ঋণে জামিনদারের ভূমিকা পালন করছে ভারত। ২০২৩ সালেই এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয় নয়াদিল্লি। তা ছাড়া ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (নেবারহুড ফার্স্ট) নীতির আওতায় কলম্বোকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তাও দিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।