অপহরণ, খুন! চিনা হ্যাকার আর মাফিয়াদের ‘মুক্তাঞ্চল’ হয়ে উঠছে পড়শি দ্বীপরাষ্ট্র, কতটা চিন্তা ভারতের?
দিন দিন চিনা হ্যাকার গ্যাংগুলির ‘মুক্তাঞ্চল’ হয়ে উঠছে পড়শি দ্বীপরাষ্ট্র। একে জাতীয় সুরক্ষার জন্য বেশ উদ্বেগজনক বলেই মনে করছে সে দেশের সরকার।
দেশের আনাচ-কানাচে চিনা মাফিয়াদের তাণ্ডব! দুষ্কৃতীদের গ্যাংওয়ারে রক্তাক্ত হচ্ছে শহরের রাজপথ। শুধু তা-ই নয়, অহরহ ঘটছে অপহরণ, তোলাবাজি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সামলাতে পুলিশের গলদঘর্ম দশা। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবেই দেখছেন প্রশাসনের পদস্থ কর্তারা। আর তাই দক্ষিণ দ্বীপরাষ্ট্রে উপর কড়া নজরদারি রাখতে বাধ্য হচ্ছে নয়াদিল্লিও।
সম্প্রতি, এক কুখ্যাত চিনা দুষ্কৃতীর রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কা জুড়ে শুরু হয়েছে হইচই। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, প্রথমে অপহরণ এবং তার পর ওই ব্যক্তিকে নৃশংস ভাবে খুন করেন তাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের সদস্যেরা। পাশাপাশি, ভিসার অপব্যবহারের জেরে দ্বীপরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা ভিন্দেশি অপরাধীদের মুক্তাঞ্চলে পরিণত হওয়ায় আঁচও পেয়েছেন কলম্বোর গোয়েন্দারা।
শ্রীলঙ্কা পুলিশের দাবি, মাস ছ’য়েক আগে কম্বোডিয়ার পাসপোর্টে দ্বীপরাষ্ট্রে ‘অনুপ্রবেশ’ করে ওই চিনা দুষ্কৃতী। তাতে তাঁর নাম লেখা ছিল ‘হাও পন’। বেজিঙের একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধচক্রের সঙ্গে তাঁর জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়া উদ্ধার হয়েছে নিহতের আরও একটি পাসপোর্ট। সেটি আবার দক্ষিণ (লাটিন) আমেরিকার দেশ সুরিনামের।
দু’টি পাসপোর্টে একই ছবি থাকলেও পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন দেওয়া হয়েছে। গোড়ায় অবশ্য সেগুলি আসল না নকল, তা বুঝতেই পারছিলেন না তদন্তকারীরা। পরে ফরেন্সিক পরীক্ষায় জানা যায়, দু’টি পাসপোর্টই জাল। খুন হওয়ার কিছু দিন আগে ‘ওরা’ নামের একটি সংস্থায় নিজের নাম নথিবদ্ধ করেন ‘হাও পন’। গোয়েন্দাদের অনুমান, এর মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় সাইবার অপরাধের ছক ছিল তাঁর।
তদন্তকারীদের দাবি, কলম্বোয় একা আসেনি ড্রাগনভূমির ওই কুখ্যাত দুষ্কৃতী। একই সঙ্গে দ্বীপরাষ্ট্রে পা রাখেন চিনা রাঁধুনি, ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট এবং গাড়ির চালক। এঁদের প্রত্যেককে মাসে প্রায় ৩,০০০ ডলার বেতন দিতেন তিনি, ভারতীয় মুদ্রায় যেটা প্রায় ২.৮৫ লক্ষ টাকা। এ ছাড়াও ‘হাও পন’-এর সঙ্গে থাকতেন তাঁর বছর ৩১-এর ভিয়েতনামী বান্ধবী এবং তাঁর পোষা কুকুর।
আরও পড়ুন:
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, নিহত চিনা দুষ্কৃতীর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে কম্বোডিয়ায়। সেখানে রিসর্ট এবং বিউটি পার্লার চালাতেন তিনি। সেই ব্যবসায় কোনও গোলমাল ছিল না। কিন্তু, ওগুলির আড়ালে চলত হ্যাকিং। এর জাল দেশের বাইরেও ছড়িয়ে দেন ‘হাও পন’। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে সাইবার অপরাধীদের একটা ছোটখাটো গ্যাং। এঁদের অধিকাংশই ড্রাগনভূমির বাসিন্দা।
শ্রীলঙ্কা পুলিশের অনুমান, কম্বোডিয়ায় ‘হাও পন’-এর যাবতীয় কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। আর তাই সেখান থেকে পালিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। কলম্বোতেও একই রকমের কারবার ফেঁদে বসার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কারণ, তত দিনে সাইবার জালিয়াতিতে লক্ষ লক্ষ ডলার আয়ের অদ্ভুত নেশা পেয়ে বসেছে তাঁকে। শেষ পর্যন্ত এর খেসারত জীবনের বিনিময়ে দিতে হয়েছে ওই চিনা মাফিয়াকে।
গোয়েন্দাকর্তাদের দাবি, কম্বোডিয়ায় থাকাকালীন একাধিক সাইবার গ্যাংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন ‘হাও পন’। হ্যাকিংয়ে পাওয়া তথ্য সরবরাহ করে তাঁদের থেকেও মোটা রোজগার হত তাঁর। শ্রীলঙ্কায় পালিয়ে আসার আগে এমনই একটা অপরাধচক্রের থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয় ওই চিনা দুষ্কৃতী। এর পর তথ্য সরবরাহ না করেই বান্ধবীকে নিয়ে কলম্বো চলে আসেন তিনি।
কম্বোডিয়া থেকে ‘হাও পন’ চম্পট দিতেই তাঁকে চরম শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে প্রতারিত চিনা গ্যাং। সেইমতো ধাওয়া করে চলতি বছরের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কা পৌঁছোন বেশ কয়েক জন। দ্বীপরাষ্ট্রে পা দিয়েই খোঁজখবর শুরু করেন তাঁরা। বিষয়টি আঁচ করতে ‘হাও পন’-এর বেশি সময় লাগেনি। আর তাই আত্মগোপন করতে ঘন ঘন বাড়ি বদল করতে থাকেন তিনি।
আরও পড়ুন:
একসময় কলম্বোর ইউনিয়ন প্লেসের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাট ভাড়া নেন ‘হাও পন’। শ্রীলঙ্কা পুলিশ জানিয়েছে, গত ২২ জুলাই গাড়ির চালক এবং ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট-সহ দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে বিলাসবহুল এসইউভিতে রাজধানীর ঝুলন্ত সেতুর কাছে মাছ ধরতে যান তিনি। এঁরা প্রত্যেকেই তাঁর দেহরক্ষীর কাজ করছিলেন। নিজেদের মধ্যে মান্দারিনে কথাবার্তা চলছিল তাঁদের।
ওই দিন মাঝরাত পেরিয়ে ঝুলন্ত সেতুর কাছে মাছ ধরছিলেন ‘হাও পন’। ঠিক তখনই সেখানে হাজির হয় চিনা গ্যাংয়ের সদস্যরা। তাঁদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। প্রথমে গাড়ির চালক এবং দুই দেহরক্ষীকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এর পর হাত-মুখ বেঁধে ‘হাও পন’কে তোলা হয় ভ্যানে। চোখের নিমেষে সেটা হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেই পুলিশের কাছে ছোটেন গাড়ির চালক ও দুই দেহরক্ষী।
এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কলম্বো থেকে বেশ কিছুটা দূরে এহেলিয়াগোডার কারান্দানায় উদ্ধার হয় ‘হাও পন’-এর রক্তাক্ত মৃতদেহ। তদন্তকারীদের অনুমান, গোটা অপারেশনের জন্য আগে থেকেই রেকি করেছিল সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। পাশাপাশি, নিহতের মোবাইল ফোনের সাহায্যে ব্যাঙ্কের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। এর জন্য হত্যার আগে নিদারুণ যন্ত্রণা দিতেও ছাড়েনি ওই দুষ্কৃতীরা।
অন্য দিকে, তদন্তে নেমে প্রথমেই ঝুলন্ত সেতু এবং তার আশপাশের এলাকা খতিয়ে দেখে শ্রীলঙ্কা পুলিশ। পাশাপাশি, নিহতের গাড়ির চালক ও দেহরক্ষীর বর্ণনা অনুযায়ী দু’জনকে চিহ্নিত করা হয়। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে মুম্বই হয়ে সিঙ্গাপুর পালানোর ছক ছিল তাঁদের। কিন্তু উড়ানে ওঠার আগে দুই দুষ্কৃতীকে জালে তোলেন দ্বীপরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা। তিন জন অবশ্য পালাতে সক্ষম হন।
এই তদন্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন কলম্বো পুলিশের ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল নিশান্ত সোয়সা। তাঁর কথায়, অপহরণ ও খুনের সঙ্গে জড়িত আট চিনা নাগরিককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ধৃতের সংখ্যা দুই, পলাতক তিন। বাকি তিন জনও শ্রীলঙ্কায় গা ঢাকা দিয়ে আছেন। তাঁদের খোঁজে চলছে তল্লাশি। পাশাপাশি, নিহতের মোবাইল ফোনের নাগাল পাওয়া গিয়েছে।
সূত্রের খবর, জেরায় ধৃতরা পুলিশকে জানান ‘হাও পন’কে অপহরণের সময় দুর্ঘটনাবশত তাঁদের গ্যাংয়ের এক সদস্যের হাত ফস্কে ঝুলন্ত সেতু সংলগ্ন সমুদ্রে পড়ে এয়ার পিস্তল। সেটা খুঁজে বার করতে ওই এলাকায় নৌবাহিনীর ডুবুরি নামান তদন্তকারীরা। তাঁরা পিস্তলের পাশাপাশি উদ্ধার করেন নিহতের মোবাইল ফোন। এ ছাড়া অপহরণে ব্যবহৃত গাড়ি এবং একটি ওয়াকি-টকিও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, বাম্বালাপিটিয়া ও কলুপিটিয়ার হোটেল ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন চিনা গ্যাংয়ের সদস্যেরা। তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন লি জিন নামের এক ব্যক্তি। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, এই নামটি আসল নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনও দুষ্কৃতী দলের নেতা। ছদ্মনামে বিভিন্ন জায়গায় সাইবার অপরাধের নানা দুষ্কর্ম ওই ব্যক্তি করে থাকতে পারেন বলেই অনুমান পুলিশের।
তবে এ বারই প্রথম নয়। অতীতেও কলম্বো বন্দর শহর থেকে একাধিক চিনা সাইবার অপরাধী গ্যাংয়ের পর্দাফাঁস করেছে লঙ্কা পুলিশ। তদন্তকারীদের কথায়, সরকারি ভিসা নীতির জন্যই খুব সহজে ওই এলাকায় ঢুকতে পারছে বেজিঙের হ্যাকারেরা। এর পর গ্যাংওয়ারে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ফলে প্রায়শই ঘটছে অপহরণ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। দুষ্কৃতীরা তিনটি পদ্ধতি অবলম্বন করছে বলেও জানা গিয়েছে।
লঙ্কা পুলিশের কর্তা-ব্যক্তিদের কথায়, ‘‘কলম্বোর বন্দর শহরে পা দিয়েই ভুয়ো সংস্থা খুলছে সাইবার অপরাধীদের দল। এর পর সেই সংস্থার ভুয়ো নথি দেখিয়ে বিদেশি কর্মী আনার অছিলায় হ্যাকারদের দ্বীপরাষ্ট্রে টেনে আনছে তারা। মূলত বিলাসবহুল হোটেল বা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে গোটা নেটওয়ার্ক পরিচালনার প্রবণতা আছে তাদের।”
কলম্বোর তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই নেটওয়ার্কে চিন ছাড়াও কম্বোডিয়া, মায়ানমার এবং ভিয়েতনামের হ্যাকারদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আর্থিক প্রতারণায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। এখনও পর্যন্ত হাজারখানেক এই রকম সাইবার অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র।
এ বছরের জুলাইয়ে ভারতের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র কুডনকুলমের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ১৯,০০০টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ফাইল ফাঁস করে ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে সাইবার হানার সাহায্যে ওই তথ্য বাইরে আনে তারা। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্রে চিনা হ্যাকারদের দাপাদাপির খবরে নয়াদিল্লির কপালের চিন্তার ভাঁজ যে আরও গভীর হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।