শরীরে ১৭৪ ‘কিল মার্ক’, ৩২১ দিন পর অবশেষে ঘরে ফিরল ইরান যুদ্ধে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ সামলানো লিঙ্কন!
৩২১ দিন পর দেশে ফিরল পরমাণু শক্তিচালিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে কী কী ক্ষয়ক্ষতি করতে পেরেছে সে?
শরীর জুড়ে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। ‘পিঠে’ শত্রু হত্যার তালিকা ঝুলিয়ে অবশেষে ঘরে ফিরল মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’! ৩২১ দিনের দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় যাকে ঘিরে বারবার দানা বেঁধেছে বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটিতে পৌঁছোনোর পরও যা পিছু ছাড়ল না তার। উল্টে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে জাহাজটির পারফরম্যান্স নিয়ে শুরু হয়েছে কাটাছেঁড়া।
চলতি বছরের ৮ অক্টোবর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর নর্থ আইল্যান্ড নৌ-বিমানঘাঁটিতে পৌঁছোয় পরমাণু শক্তিচালিত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। সেখানে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ইউনিট সাইটেশন’-এ সংশ্লিষ্ট রণতরীটির জলযোদ্ধাদের সম্মানিত করেন মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। রণক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বীরত্বের জন্য সামরিক বাহিনীর কোনও ইউনিটকে যেটি দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার।
সান দিয়েগোর নৌ-বিমানঘাঁটিতে পৌঁছোনোর পর বিমানবাহী রণতরীটি পরিদর্শন করেন পিট। ইরান সংঘর্ষে এর ভূমিকাকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন তিনি। হেগসেথের কথায়, ‘‘সংঘাত চলাকালীন লড়াকু জেটের ৩,৬৯৩টি সামরিক উড়ান পরিচালনা করে এই যুদ্ধজাহাজ। যাতে ডুবেছে তেহরানের ৬৪টি রণতরী। এ ছাড়া, সাবেক পারস্যের বেলাভূমিকে নিশানা করতে ৪৫০টি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে লিঙ্কন।’’
যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের এই পরমাণু শক্তিচালিত রণতরীটির ক্ষতি করার কম চেষ্টা করেনি ইরানি আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। লাগাতার ‘ফিদায়েঁ’ ড্রোন হামলায় লিঙ্কনকে রীতিমতো ব্যতিব্যস্ত করে তোলে তারা। পিট জানিয়েছেন, ওই সময় মাথা ঠান্ডা রেখে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তেহরানের ৭৭টি পাইলটবিহীন যানকে মাঝ আকাশে ধ্বংংস করে দেয় এতে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনী।
ঘরে ফেরার পর লিঙ্কনের একটি ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেখানে বিমানবাহী রণতরীটির ডেকে দাঁড়িয়ে পিটকে এর উপরের দিকের কাঠামো পরীক্ষায় মগ্ন থাকতে দেখা গিয়েছে। যুদ্ধজাহাজটির বিশেষ একটি ইস্পাতের দেওয়াল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন তিনি। যার গায়ে কালো কালিতে ছবি এঁকে রণাঙ্গনে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়েছে মার্কিন নৌসেনা।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এই ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। বড় ধরনের অভিযান দুর্দান্ত সাফল্য পেলে মার্কিন নৌসৈনিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলাফল রণতরীর ইস্পাতের দেওয়ালে তুলে ধরার রেওয়াজ রয়েছে। লিঙ্কনের ক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি। সব মিলিয়ে এতে ১৯০টি চিহ্ন দেখতে পাওয়া গিয়েছে। সেই ছবি আবার আলাদা করে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম থেকে পোস্ট করেন যুদ্ধসচিব পিট।
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের ইস্পাতের দেওয়ালে আঁকা ছবি অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে মোট ২৩টি জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে এই বিমানবাহী রণতরী। ডুবিয়েছে ৩৪টি জাহাজ। এর মধ্যে ক’টি সামরিক, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া, মার্কিন যুদ্ধপোতটির দ্বারা ধ্বংস হয়েছে ১২২টি ড্রোন ও ১০টি ডুবোজাহাজ। ডেকের দেওয়ালে বড় একটি বোমার ছবিও দেখা গিয়েছে। যার গায়ে লেখা ‘১৪০৩’।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীটির গায়ে শত্রুপক্ষের ৩৪টি জাহাজ ধ্বংসের সুস্পষ্ট ‘কিল মার্ক’ রয়েছে। যদিও সেগুলির প্রকৃতি নিয়ে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি মার্কিন সরকার। সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, গত ছ’মাসে একের পর এক ইরানি যুদ্ধজাহাজ, করভেট এবং আইআরজিসির চালকবিহীন জলযানকে ডোবাতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকার নৌবাহিনীর গর্বের ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি জানিয়ে ঘনঘন বিবৃতি দিয়েছে মার্কিন ফৌজের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। তাদের দাবি, তেহরানের ড্রোনবাহী রণতরী শহিদ বাঘেরি, ফরওয়ার্ড বেস যুদ্ধজাহাজ আইরিস মাকরান, একটি জামারান শ্রেণির করভেট এবং শহিদ সোলেইমানি-শ্রেণির চারটি ক্যাটামারান ক্ষেপণাস্ত্র করভেট ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনা। তবে এতে লিঙ্কনের ভূমিকা কতটা, সেটা জানা যায়নি।
আরও পড়ুন:
সেন্টকমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বায়ানডোর শ্রেণির করভেট, একাধিক ফ্রিগেট, দ্রুত আক্রমণকারী নৌযান, ক্ষেপণাস্ত্র নৌকা, কমপক্ষে ১৬টি মাইন পাতার জাহাজ এবং বেশ কয়েকটি সহযোগী সামরিক জাহাজকেও নিষ্ক্রিয় করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনা। সূত্রের খবর, দু’পক্ষের এই সংঘর্ষ চলাকালীন আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরের কাছাকাছি সক্রিয় ছিল লিঙ্কন। লড়াইতে যোগ দেয় তার সহযোগী রণতরী ও ডুবোজাহাজও।
লিঙ্কনের নিরাপত্তায় রণাঙ্গনে তিনটি আর্লে বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে আমেরিকা। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সংঘর্ষের সময় তাদের টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রে হামলার নির্দেশ দিয়ে থাকতে পারে ওই বিমানবাহী রণতরী। পাশাপাশি, নিখুঁত নিশানায় আক্রমণ শানাতে সেখান থেকে ওড়ানো হয় এফ-৩৫সি লাইটনিং টু ও এফএ-১৮ সুপার হর্নেটের মতো অত্যাধুনিক লড়াকু জেটও।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্লে-বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারে রয়েছে এজিস কমব্যাট সিস্টেম এবং ইভলভ্ড সি স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। প্রথম হাতিয়ারটি আবার এসএম২ এবং এসএম৬ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত। যেগুলি দিয়ে অনায়াসেই ওড়ানো যায় দূরপাল্লার ড্রোন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, যুদ্ধের সময় এগুলি আকাশ প্রতিরক্ষার (এয়ার ডিফেন্স) কাজ করেছে। লিঙ্কনের সঙ্গে ইউএসএস স্প্রুয়ান্স, ইউএসএস মাইকেল মারফি এবং ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই. পিটারসেন ছিল বলে জানা গিয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবাহী রণতরীটির নিজস্ব আত্মরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। সেগুলি হল, রিম-১১৬ রোলিং এয়ারফ্রেম ক্ষেপণাস্ত্র এবং ফ্যালাঙ্কস ক্লোজ-ইন ওয়েপন সিস্টেম। সূত্রের খবর, ইরানি ড্রোন হামলার সময় তড়িঘড়ি লিঙ্কনের ডেক থেকে ওড়ানো হয় এফ-৩৫ এবং সুপার হর্নেট লড়াকু জেট। তেহরানের বেশ কিছু ‘আত্মঘাতী’ পাইলটবিহীন যানকে গুলি করে নামাতে এই দুই যুদ্ধবিমানের তেমন সমস্যা হয়নি।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, লিঙ্কনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল, ইরানি ডুবোজাহাজের বহর ধ্বংস। রুশ মদতে গত কয়েক বছরে ঘরের মাটিতেই একাধিক কিলো শ্রেণির ডুবোজাহাজ তৈরি করতে সক্ষম হয় তেহরান। সমুদ্রের এই সমস্ত ‘নিঃশব্দ ঘাতক’গুলির দিকে লড়াইয়ের গোড়া থেকেই বাড়তি নজর রেখে চলছিল সেন্টকম। সংঘর্ষ চলাকালীন সুপার হর্নেট জেটের সাহায্যে জলের গভীরের ওই অমোঘ হাতিয়ার ধ্বংস করে মার্কিন নৌসেনা।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনুমান, নৌঘাঁটিতে থাকাকালীন ইরানি ডুবোজাহাজের বহরে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান। তেহরানের ওই ‘নিঃশব্দ ঘাতকে’র উপর লেজার গাইডেড বোমা ফেলে তারা। যদিও এ ব্যাপারে অন্য একটি মতও প্রকাশ্যে এসেছে। পেন্টাগনের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ডুবোজাহাজ ধ্বংসে ব্যবহার হয়েছে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজের হাতে রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার নামের একটি অত্যাধুনিক ড্রোন। এই পাইলটবিহীন যান হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। ফলে, ইরানি নৌঘাঁটিতে ডুবোজাহাজ ধ্বংস করতে লড়াকু জেট নাকি রিপার ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তা ছাড়া, রণতরীটির ডেকের দেওয়ালের ছবির সঙ্গেও মার্কিন যুদ্ধ সচিবের দেওয়া তথ্যের বিস্তর অমিল ধরা পড়েছে।
লিঙ্কন ঘরে ফেরার পর দেওয়া ভাষণে পিট বলেন, ‘‘শত্রুপক্ষের মোট ৬৪টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে আমাদের বিমানবাহী রণতরী।’’ অথচ এর ডেকের দেওয়ালে ছবি রয়েছে ৩৪টির। হেগসেথ জানিয়েছেন, ৭৭টি ইরানি ড্রোন মাঝ আকাশে ধ্বংস করেছে লিঙ্কন। অন্য দিকে, ছবির হিসাব অনুযায়ী সংখ্যাটা ১২২। ফলে, যুদ্ধ দফতরের বিরুদ্ধে তথ্য হেরফেরের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে সেখানকার বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম।
গত বছরের ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো নৌসেনা ঘাঁটি থেকে রওনা হয়ে পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে গিয়ে পৌঁছোয় আব্রাহাম লিঙ্কন। এ বছরের অগস্টে সংশ্লিষ্ট বিমানবাহী রণতরীটিকে নিয়ে একটি বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ করে ‘নেভি টাইমস’ এবং ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপ্স’ নামের আমেরিকার দু’টি গণমাধ্যম। দীর্ঘদিন সমুদ্রে মোতায়েন থাকায় যুদ্ধজাহাজটির সৈনিকদের মনে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে বলে দাবি করে বসে তারা। ফলে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল।
‘নেভি টাইমস’ এবং ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপ্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় রণতরী ছাড়তে মরিয়া হয়ে ওঠেন বেশ কয়েকজন মার্কিন সৈনিক। সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে যান তাঁদের একাংশ। কোনও মতে পরিস্থিতি সামাল দেন ক্যাপ্টেন। ফলে কোনও বিপত্তি ঘটেনি। শুধু তা-ই নয়, লড়াই চলাকালীন লিঙ্কনে খাদ্য সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। এতে বাধ্য হয়ে তাকে ঘরে ফেরার নির্দেশ দেয় পেন্টাগন। রাস্তায় বিশ্রাম নিতে তাইল্যান্ডে থেমেছিল লিঙ্কন।
১৯৮৯ সালে মার্কিন নৌসেনায় কর্মজীবন শুরু পরমাণু শক্তিচালিত এই বিমানবাহী রণতরীটির এর আগে কখনও এমন ল্যাজে-গোবরে দশা হয়নি। লিঙ্কনের ভিতরের পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জল ঘোলা হতে থাকায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। তা নিয়েও বেঁধে যায় বিতর্ক। বিশ্রামে ফিরেও যার আঁশটে গন্ধ গা থেকে সরাতে পারছে না লিঙ্কন।