ট্রাম্প তো রয়েইছেন, তালিকায় আরও এক ডজন বিশ্বনেতা! ইরানের ‘প্রতিশোধের তালিকা’ প্রকাশ্যে, কে কে রয়েছেন ‘হিট লিস্টে’?
ওয়াশিংটন এবং তেহরানের সংঘাত শুরুর প্রায় শুরুতেই, ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন আলি খামেনেই। এর পর তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচিত হন পুত্র মোজতবা খামেনেই। মোজতবা প্রতিজ্ঞা করেন, বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তি দেবেন।
কিছুতেই শান্তি ফিরছে না পশ্চিম এশিয়ায়! সপ্তাহ তিনেক আগে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে যে সমঝোতার মউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে দু’মাসের সংঘর্ষবিরতির কথা বলা হয়। কিন্তু হরমুজ় প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজের উপরে তার পরেও হামলা হয়েছে। তার জন্য দু’পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, সংঘর্ষবিরতি শেষ। তবে আলোচনাও চলছে।
হরমুজ় প্রণালীর কাছে ভারতীয় নাবিকবাহী জাহাজে হামলার পর থেকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। রবিবার গভীর রাত থেকে ইরানে ফের হামলা শুরু করেছে আমেরিকা। একের পর এক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। অভিযোগ, হরমুজ় প্রণালী থেকে দূরে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলিকেও নিশানা করা হচ্ছে। এর জবাবে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার বন্ধু দেশগুলিকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। হামলাও শুরু হয়েছে একাধিক দেশে। বাহরিনে বেজেছে সাইরেন।
এই সংঘাতের আবহে শনিবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, তাঁকে খুনের চেষ্টা করছে ইরান। তবে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র নাকি ইরানের দিকে তাক করা আছে। সেনাবাহিনীকে নির্দেশও নাকি দেওয়া আছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে হত্যার কোনও রকম চেষ্টা হলেই ইরানের উপর ভয়ঙ্কর হামলা শুরু হয়ে যাবে।
শনিবার সকালে (ভারতীয় সময়) সমাজমাধ্যমের হুঁশিয়ারিতে ইরানকে নিশানা করেছেন ট্রাম্প। দাবি, ইরান বিশ্বের নানা প্রান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছে। তা যদি কার্যকর করার চেষ্টাও হয়, তবে পরিণতি ভাল হবে না।
নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘‘এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দিকে তাক করে রাখা হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে (এ ক্ষেত্রে আমি) হত্যা বা হত্যার চেষ্টার যে হুমকি বিশ্বের নানা প্রান্তে তারা দিয়ে আসছে, তা যদি কার্যকর করা হয়, আরও হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তাদের মাটিতে আছড়ে পড়বে। নির্দেশ ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গিয়েছে। ইরানের সমস্ত এলাকা সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস এবং নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত। প্রাথমিক ভাবে এই কার্যক্রমের মেয়াদ এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তা আরও বাড়ানো হতে পারে।’’
আরও পড়ুন:
বিষয়টি নিয়ে যখন হইচই পড়েছে, তখন শুধু ট্রাম্প নন, ইরানের প্রতিশোধের তালিকা বা হিট লিস্টে কোন কোন বিশ্বনেতা রয়েছেন, তা উঠে এসেছে ইরানের একটি সংবাদপত্রে। কঠোর এবং উস্কানিমূলক অবস্থানের জন্য পরিচিত ইরানি সংবাদপত্রটি বেশ কয়েক জন বিদেশি নেতার নাম এবং ছবি প্রকাশ করেছে।
ইরানের ওই সংবাদপত্রের দাবি, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের হত্যার প্রতিশোধ হিসাবে এই নেতাদের নিশানা করা উচিত। সেই তালিকায় ট্রাম্পের পাশাপাশি নাম রয়েছে ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারের।
ওয়াশিংটন এবং তেহরানের সংঘাতের প্রায় শুরুতেই, ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন আলি খামেনেই। এর পর তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচিত হন পুত্র মোজতবা খামেনেই। মোজতবা প্রতিজ্ঞা করেন, বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তি দেবেন।
এর পর কয়েক মাসব্যাপী সংঘাত শুরুর পর সাময়িক ‘সমঝোতা’ চুক্তি হয় আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে। মৃত্যুর পর আলি খামেনেইয়ের সংরক্ষিত দেহের শেষকৃত্য হয় সম্প্রতি। এর পর গত শনিবার জনসমক্ষে এসে মোজতবা ঘোষণা করেন, প্রতিশোধ অনিবার্য। তিনি বলেন, ‘‘প্রতিশোধ নেওয়া আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং তা অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। তালিকায় নাম থাকা অপরাধীরা বিছানায় শুয়ে শান্তিতে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা নিয়েই কবরে যাবে।’’
আরও পড়ুন:
এর পরেই ইরানের ওই সংবাদপত্রে উঠে আসে বিশ্ব নতাদের ‘হিট লিস্ট’। সংবাদসংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান থেকে প্রকাশিত ‘হামশহরি’ সংবাদপত্রটি একটি অনলাইন ‘ইনফোগ্রাফিক’ প্রকাশ করে। সংবাদপত্রটির রবিবারের মুদ্রিত সংস্করণে এই গ্রাফিকটি প্রকাশিত হয়নি। তাতে মোজতবার বক্তব্যের পাশাপাশি ১৩ জন বিশ্বনেতার ছবি ছাপা হয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মন্তব্য করেছিলেন, যাঁদের ‘টার্গেট’ করা হবে, তাঁদের একটি তালিকা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করেছে ইরান। তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। অন্য দিকে, সংবাদপত্রের তালিকায় সরাসরি বিশ্বনেতাদের নাম এবং ছবি প্রকাশিত হয়েছে। যদিও সংবাদপত্রটি সেই তালিকা প্রকাশের জন্য সরকারি অনুমোদন পেয়েছে, এমন কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
কিন্তু কোন কোন বিশ্বনেতা আছেন ইরানের সংবাদপত্রে প্রকাশিত তালিকায়? ইনফোগ্রাফিকে যাঁদের ছবি রয়েছে, তাঁদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ ছাড়াও ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্টার্মারের নাম তালিকার একেবারে প্রথম দিকে রয়েছে।
পাশাপাশি তালিকায় মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেয়ার্ৎজ়ের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালীন ইরান বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, তারা ইরানের ভূখণ্ডে হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বিমানকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে তারা এই হামলায় পরোক্ষ ভাবে সহায়তা করেছে। আর সে কারণেই ইউরোপীয় নেতাদের নাম ওই প্রতিশোধ-তালিকায় রয়েছে বলে খবর।
সংঘাত শুরুর পর থেকে মোজতবাকে কখনও জনসমক্ষে দেখা যায়নি। শোনা যায়, যে হামলায় তাঁর বাবা নিহত হয়েছিলেন, সেই হামলায় তিনিও আহত হন। বাবার শেষকৃত্যের পর বার্তা দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। দেন, প্রতিশোধের বার্তা। তার পরেই ইরানের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় ‘হিট লিস্ট’।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের পাকাপাকি ভাবে অবসানের লক্ষ্যে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে পরবর্তী যে কোনও আলোচনার ক্ষেত্রে এখন প্রধান বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, হরমুজ় প্রণালী।
রবিবার সকালে হরমুজ় প্রণালীতে একটি জাহাজে হামলা চালায় ইরান। কন্টেনারবাহী জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যান নাবিকেরা। এর পর আমেরিকা পাল্টা হামলা চালায় ইরানের উপর। তার জবাবে ইরান আবার বাহরিন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ওমানকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করে।
পারস্য উপসাগরে নতুন সংঘাতের ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল, যার কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে অন্তর্বর্তিকালীন চুক্তির বিষয়টি এখন ‘শেষ’ হয়ে গিয়েছে। আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের এর মাসুল দিতে হবে।’’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কলিবফ এর জবাবে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সমাজমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘‘একপাক্ষিক চুক্তির যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে। আমরা আপনাদের বলেছিলাম, নিজেদের কথা রাখুন অথবা মাসুল গুনুন। বাস্তব এখন কড়া নাড়ছে আপনাদের দরজায়।’’ তার পরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে পশ্চিম এশিয়ার আকাশে।