তিন স্ত্রী, ২৪ সন্তান, স্বেচ্ছায় পুত্রের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ক্ষমতা! ইংল্যান্ডের রানির পাঁচ গুণ বেশি সম্পদ কাতারের সদ্যপ্রয়াত শাসকের
বিশ্বের অন্যতম ধনী রাজপরিবারের সদস্য, স্বাভাবিক ভাবেই শেখ হামাদের সম্পত্তির পরিমাণও চোখধাঁধানো হবে তা বলাই বাহুল্য। কাতারের এই প্রাক্তন শাসক তাঁর কূটনীতির পাশাপাশি বিপুল সম্পদ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন।
প্রয়াত হলেন বিশ্বের দরবারে কাতারকে প্রতিষ্ঠার নেপথ্যনায়ক ‘ফাদার আমির’ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। ৭৪ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন তিনি। কাতারের প্রাক্তন শাসকের মৃত্যুতে শোকবার্তা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। হামাদের মৃত্যুর পর ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে।
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি, কাতারের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী শাসক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ছোট উপসাগরীয় দেশটি বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৯৫ সালে রক্তপাতহীন এক ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি তাঁর বাবা শেখ খলিফা বিন হামাদ আল থানির কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি কাতারের আমির বা শাসক ছিলেন।
১৯৫২ সালে জন্ম হয় শেখ হামাদের। ইংল্যান্ডের রয়্যাল মিলিটারি অ্যাকাডেমি স্যান্ডহার্স্টে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৭১ সালে কাতার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনীত হওয়ার পর তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হন। হামাদ ধীরে ধীরে দেশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন-সহ বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
অ্যালেন ফ্রমহার্জের ‘কাতার: এ মডার্ন হিস্ট্রি’ অনুসারে, ১৯৯৫ সালে হামাদের বাবা শেখ খলিফা তাঁর ছেলের কিছু ক্ষমতা ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শেখ খলিফা সুইৎজ়ারল্যান্ডে থাকাকালীন ক্ষমতা দখলের সুযোগ নেন পুত্র হামাদ। ট্যাঙ্ক ও সামরিক কর্মীদের দিয়ে কাতারের রাজভবন ঘিরে ফেলার নির্দেশ দেন। খলিফার মদতপুষ্ট অভ্যুত্থানের চেষ্টাও সমূলে উৎখাত করেন তিনি। যদিও তার জন্য এক ফোঁটা রক্তপাত হয়নি।
২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সিংহাসন ছেড়ে তাঁর ছেলে, বর্তমান কাতারের আমির বা শাসক শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর বিরল ঘটনা বলে মনে করেন অনেকেই।
আরও পড়ুন:
বিশ্বের অন্যতম ধনী রাজপরিবারের সদস্য, স্বাভাবিক ভাবেই শেখ হামাদের সম্পত্তির পরিমাণও চোখধাঁধানো হবে তা বলাই বাহুল্য। কাতারের এই প্রাক্তন শাসক তাঁর কূটনীতির পাশাপাশি বিপুল সম্পদ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন।
কাতারের রাজার সম্পত্তির পরিমাণ ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজ়াবেথের সম্পত্তির পরিমাণকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। কাতারের প্রাক্তন আমিরের সম্পদ ইংল্যান্ডের প্রাক্তন রানির সম্পদের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ফোর্বস ম্যাগাজিনের পুরনো তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটেনের প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজ়াবেথের মোট ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক প্রায় ৫০ কোটি ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪১০০ কোটি টাকা।
অন্য দিকে, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির ব্যক্তিগত সম্পদ রয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলারের মধ্যে। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৭ হাজার থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। যদিও এই তুলনাটি মূলত ব্যক্তিগত সম্পদের, রাজকীয় বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের নয়।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রাউন এস্টেট, বাকিংহাম প্যালেস-সহ অনেক ঐতিহাসিক সম্পদের মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা হলেও, এগুলি ব্রিটিশ রাজা বা রানির ব্যক্তিগত মালিকানাধীন নয়। এ সব সম্পদ ক্রাউন বা ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়। শাসক ইচ্ছামতো বিক্রি, দান বা ব্যক্তিগত ভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। ঠিক তেমনই কাতারের রাষ্ট্রীয় সম্পদকেও আমিরের ব্যক্তিগত সম্পদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।
আরও পড়ুন:
কাতারের রাজপরিবারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি তিন বার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন শেখা মরিয়ম বিনতে মহম্মদ আল থানি, শেখা মোজ়াহ বিনতে নাসের আল মিসনেদ এবং শেখা নুরা বিনতে খালিদ আল থানি।
শেখ হামাদ ও তাঁর তিন স্ত্রীর মোট ২৪ জন সন্তান রয়েছেন। ১১ জন পুত্র ও ১৩ জন কন্যা। এত বড় রাজপরিবারের কর্তৃত্ব তাঁর হাতে থাকা সত্ত্বেও, ২০১৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন শেখ হামাদ। চতুর্থ পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি-এর হাতে কাতারের আমিরের বা প্রশাসকের দায়িত্ব তুলে দেন তিনি। পশ্চিম এশিয়ার রাজপরিবারকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় এমন শান্তিপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর একটি বিরল ঘটনা হিসাবে বিবেচিত।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ ও ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজপরিবার এবং কাতারের বিনিয়োগ সংস্থাগুলির লন্ডনে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও রিয়্যাল এস্টেটে বিনিয়োগ রয়েছে। বহু আর্থিক বিশ্লেষকের মতে, লন্ডনের বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে তাঁদের বিনিয়োগ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, হামাদের হাতে শাসনক্ষমতা থাকার সময় কাতারের অর্থনীতি পূর্ববর্তী বছরগুলির তুলনায় অন্তত ২০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। ২০১৩ সালে তা ১৯,৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। গ্যাস রফতানি থেকে দেশে অর্থ আসতে শুরু করলে, হামাদ বিনিয়োগের জন্য লাভের একটি অংশ আলাদা করে রাখতে শুরু করেন। সেই দিয়ে ২০০৫ সালে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (কিউআইএ) প্রতিষ্ঠা করেন।
হামাদের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি, যিনি এইচবিজে নামে বেশি পরিচিত, তাঁর তত্ত্বাবধানে কিউআইএ দেশে ও বিদেশে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। বিশেষ করে হাইড্রোকার্বন শিল্পের খাতগুলিতে। বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটকালে বাজারের অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে এই তহবিলের টাকা দিয়ে ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্ক বার্কলেস পিএলসি এবং ফোক্সভাগেন এজি-সহ বিশ্বের কয়েকটি বৃহত্তম সংস্থার শেয়ার কিনে নেয় কাতার। ২০১০ সালে, এই কিউআইএ-এর সাহায্যে লন্ডনের বিখ্যাত হ্যারডস ডিপার্টমেন্ট স্টোরটিও কিনে নেওয়া হয়।
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির রাজকীয় জীবনযাত্রার অন্যতম প্রতীক হল তাঁর বিলাসবহুল প্রমোদতরণী ‘আল মিরকাব’। আন্তর্জাতিক সুপারইয়টবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে নির্মিত এই ইয়টটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি ডলার। ২৪ জন অতিথি আপ্যায়নের বন্দোবস্ত রয়েছে এতে।
বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ব্যক্তিগত প্রমোদতরণী হিসাবে পরিচিত ‘আল মিরকাব’ প্রায় ১৩৩ মিটার (৪৩৭ ফুট) দীর্ঘ। একে ‘ভাসমান প্রাসাদ’ বললে অত্যুক্তি হয় না। তরণীটিতে রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল স্যুট, ভিআইপি কেবিন, সুইমিং পুল, সিনেমা হল, হেলিপ্যাড, স্পা, জিম, ডাইনিং হল। রাজপরিবারের ব্যক্তিগত ভ্রমণ ও অতিথি আপ্যায়নের জন্য সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এতে।