বিদ্যুৎ না থাকলেও পরোয়া নেই, সামরিক ঘাঁটিগুলিকে ‘দুর্গে’ পরিণত করছে পেন্টাগন! বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিতে ট্রাম্প?
খবর, পেন্টাগন এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যার লক্ষ্য আমেরিকার মাটিতে বড় ধরনের যুদ্ধের ফলে বিদ্যুতের গ্রিড, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি যেন অন্তত ৯০ দিন বাইরের কোনও সহায়তা ছাড়াই টিকে থাকতে পারে।
৯০ দিন বিদ্যুৎহীন থেকেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকবে। কিছু যায় আসবে না সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও। বিশ্বযুদ্ধের মহাবিপর্যয়কালীন পরিকল্পনার জন্য ঘুঁটি সাজাচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর (ট্রাম্পের জমানায় যার নতুন নাম যুদ্ধ দফতর) পেন্টাগন!
খবর, পেন্টাগন এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যার লক্ষ্য আমেরিকার মাটিতে বড় ধরনের যুদ্ধের ফলে বিদ্যুৎ গ্রিড, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি যেন অন্তত ৯০ দিন বাইরের কোনও সহায়তা ছাড়া টিকে থাকতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ় ডিজিটাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ‘ফোর্ট্রেস’ নামক একটি বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। ইংরেজি ‘ফোর্ট্রেস’ শব্দের আক্ষরিক বাংলা দুর্গ। এর উদ্দেশ্য, মার্কিন বাহিনী যেন এমন পরিস্থিতিতেও তাদের যুদ্ধ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, যখন তাদের উপর নির্ভরশীল অসামরিক ব্যবস্থাগুলি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেছেন, “আমরা আমাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিচালনার জন্য সাধারণ অসামরিক পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করতে চাই না। আসলে আমরা তা করতেই পারি না। এটি একটি ভয়ঙ্কর ঝুঁকি।”
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, পেন্টাগন এমন একটি প্রস্তুতিও নিচ্ছে, যাতে সঙ্কটের সময় অসামরিক কারখানাগুলিকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অস্ত্র, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেন) এবং কৌশলগত মজুদও গড়ে তোলা হচ্ছে পেন্টাগনের তরফে।
আরও পড়ুন:
পার্নেল বলেছেন, ‘‘বিদ্যুৎই এখন যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি। বিদ্যুৎ না থাকলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, জল সরবরাহ, লজিস্টিকস, উৎপাদন প্রক্রিয়া, এমনকি সামরিক কমান্ড কাঠামোর মতো মৌলিক বিষয়গুলিও অকার্যকর হয়ে পড়ে।’’ ‘ফোর্ট্রেস’ পরিকল্পনার আওতায় আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত বড় বড় সামরিক ঘাঁটিগুলিকে এমন ভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে সেগুলি অন্তত ৯০ দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জল, জ্বালানি এবং যোগাযোগ-সহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম স্বাধীন ভাবে চালিয়ে যেতে পারে।
এই প্রয়োজনীয়তা পেন্টাগনের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর মাধ্যমে এমন পরিস্থিতির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যেখানে কোনও বড় ধরনের সংঘাতের ফলে (পড়ুন বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে) আমেরিকার মাটিতে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পার্নেল বলেন, ‘‘আমি বুঝতে পেরেছি, আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ধারণার একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছিল একটি সেকেলে অনুমানের ওপর। সেই অনুমান হল, দুই মহাসাগর আমাদের সুরক্ষা দেবে।’’
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র জোর দিয়ে এ-ও জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পথ প্রশস্ত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোঝেন যে সেই পুরনো পৃথিবী আর নেই। তিনি নতুন চিন্তাধারার পথ তৈরি করেছেন, যেমন ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্প, পশ্চিম গোলার্ধের উপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া এবং গ্রিনল্যান্ড ও পানামার মতো অঞ্চলগুলির দিকে নজর দেওয়া।’’
আরও পড়ুন:
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হল, যোগাযোগ এবং লজিস্টিকস থেকে শুরু করে অস্ত্র উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামরিক বাহিনীর অসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতা। ফলে ‘ফোর্ট্রেস’ প্রকল্পের আওতায় বহনযোগ্য পরমাণু চুল্লি, বড় আকারের ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম এবং মাইক্রোগ্রিড ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সামরিক ঘাঁটিগুলিকে অসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও সচল থাকবে সামরিক ঘাঁটিগুলি।
পার্নেল বলেন, “অভিযান পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে অবশ্যই স্বাধীন, সুরক্ষিত এবং বিকল্প ব্যবস্থাসম্পন্ন হতে হবে।” পেন্টাগন ইতিমধ্যেই বড় সামরিক ঘাঁটিগুলির উপর অসামরিক বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর নির্ভরশীলতা কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ৯০ দিন পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার এই প্রয়োজনীয়তা বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। এটি কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, বরং সামরিক কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ কেবল বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রগুলিকেই নয় বরং নিজেদের ভূখণ্ডে সামরিক বাহিনীকে সহায়তা প্রদানকারী পরিকাঠামোকেও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
এই পরিকল্পনাটি এমন এক উদ্বেগের প্রতিফলন, যেখানে একটি বড় ধরনের সংঘাত সামরিক কার্যক্রমের উপর নির্ভরশীল ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। এর ফলে, দেশের সীমান্ত থেকে অনেক দূরে যুদ্ধ চললেও মার্কিন বাহিনীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এই সামরিক ঘাঁটিগুলি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং ঘাঁটিগুলিকে তাদের জরুরি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। প্রস্তাবিত ৯০ দিনের এই মানদণ্ডটি আমেরিকার মূল ভূখণ্ড জুড়ে থাকা প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর আওতায়, ঘাঁটিগুলিকে সঙ্কটের পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, জল, জ্বালানি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাধীন ভাবে সচল রাখতে হবে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্রের দাবি, আমেরিকার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনাকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, যেখানে দেশের ভূখণ্ড পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়তে পারে। তেমনটা হলে দেশের ভৌগোলিক সুরক্ষা সংক্রান্ত ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
পার্নেলের কথায়, ‘‘ভবিষ্যতের সংঘাত সম্ভবত একাধিক ফ্রন্টে লড়তে হবে। যে কোনও বড় যুদ্ধের নেপথ্যের ভূ-রাজনীতির দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’’ এই ধরনের বিঘ্নের জন্য প্রস্তুতি নিতে, এই উদ্যোগে গোলাবারুদ, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান, বৈদ্যুতিন যন্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফক্স নিউজ় ডিজিটালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কী পরিমাণ সামগ্রী মজুত রাখা হবে তা নির্ভর করবে সামরিক বাহিনী কত দ্রুত সেগুলি ব্যবহার করছে এবং উৎপাদনকারীদের পুনরায় মজুত পূরণ করতে কত সময় প্রয়োজন, তার উপর।
উল্লেখ্য, পেন্টাগনের এই উদ্যোগ এমন সময় প্রকাশ্যে এল, যখন আমেরিকা-ইরান সংঘাত আট মাসে পা দেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ‘ফোর্ট্রেস’ নামক উদ্যোগটি এমন একটি পরিস্থিতির সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে, যেখানে বড় ধরনের কোনও সংঘাত আন্তর্জাতিক সরবরাহ পথগুলিকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে আমেরিকার সামরিক বাহিনী গোলাবারুদ, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে।