আট মাসে ১,০০০ টন সোনায় ভরেছে ভাঁড়ার! কেন ডলার ছেড়ে হলুদ ধাতুতে নজর ড্রাগনের, কতটা চাপে ভারত?
গত দু’বছরে রেকর্ড পরিমাণে সোনা কিনে ড্রাগনেরা তাক লাগিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। সোনা জমানোর প্রবণতা বাড়ছে চিনের নাগরিকদের মধ্যেও। কী কারণে হলুদ ধাতুর সঞ্চয় শক্তিশালী করছে বেজিং?
সোনা কেনার মরসুম আসন্ন ভারতে। আর তাল তাল সোনা কিনে সঞ্চয়ের ভাঁড়ার বাড়াচ্ছে পড়শি দেশের সরকার। বেজিঙের সোনা জমানোটা অবশ্য সাম্প্রতিক কোনও ঘটনা নয়। গত এক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে ডলার রিজ়ার্ভ কমিয়ে হলুদ ধাতুতে কোষাগার ভরাচ্ছে শি জিনপিং সরকার।
টানা ২৩ মাস ধরে সোনা কেনার ধারা অব্যাহত রেখেছে চিন। নিজেদের বৈদেশিক রিজ়ার্ভে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে দেশটি। পাশাপাশি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে সাধারণ পরিবারগুলিও নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। এই দুই প্রবণতার জেরে সোনা আমদানি রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে চিনে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করতেই সোনা জমানোর প্রবণতা বাড়ছে চিনের নাগরিকদের মধ্যে। ফলে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেও নতুন করে তৎপরতা দেখা গিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-র প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পিপলস ব্যাঙ্ক অফ চায়না (পিবিওসি) চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রায় ২৩ টন সোনা কিনেছে। গত প্রায় তিন বছরের মধ্যে এটিই তাদের সর্বোচ্চ মাসিক সোনা কেনার রেকর্ড।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টানা কয়েক মাস দেদার সোনা কেনার ফলে তাদের মজুত অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই চিন ১,০০০ টনেরও বেশি সোনা আমদানি করেছে। ১৫ হাজার ৮৮০ কোটি ডলার মূল্যের সোনা। ২০২৫ সালে সারা বছর ধরে চিনের আমদানি করা সোনার পরিমাণ ৮৮৬ টন। এই বছরে সেই সোনা জমানোর পরিমাণ অনেকটাই বেশি বাড়িয়েছে তারা । গত বছর সোনা আমদানিতে খরচ হয়েছিল ৯,৬৬০ কোটি ডলার।
আরও পড়ুন:
গত দু’বছরে রেকর্ড পরিমাণে সোনা কিনে ড্রাগনেরা তাক লাগিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। হঠাৎ করে কেন ডলার ছেড়ে সোনার দিকে ঝুঁকছে চিন? কারণ খুঁজে দেখল আনন্দবাজার ডট কম।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলার ও মার্কিন ট্রেজ়ারি বন্ডের উপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজ়ার্ভে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার দেশটি। জুলিয়াস বেয়ার গ্রুপের বিশ্লেষক কার্স্টেন মেনকে সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বা পিবিওসি-র সোনা কেনার পিছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর মতে, মার্কিন ডলারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো এবং রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উপর নির্ভরতা হ্রাস করাই চিনের অন্যতম লক্ষ্য।
২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কিছু সদস্য দেশ। রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সম্পদগুলি বাজেয়াপ্ত করে পশ্চিমি দেশগুলি। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে দূরদর্শী চিন। সেখানকার সরকারি অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখার ঝুঁকি তুলে ধরেছেন বলে মনে করছেন অনেকেই।
চিন তার রিজ়ার্ভ পরিচালনার কৌশলে পরিবর্তন আনছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সিএনবিসি-র উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে চিনের হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের পরিমাণ কমে ৬১,৮০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিগত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো এবং সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সোনার মজুত বাড়ানোর কৌশলকে এই পদক্ষেপের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
চিনের আবাসন বাজারে দীর্ঘ দিনের মন্দার কারণে পারিবারিক সম্পদ সঞ্চয়ের অন্যতম প্রচলিত মাধ্যম হিসেবে বাড়ি বা সম্পত্তির উপর চিনাদের ভরসাস্থলটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিএনবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে চিনের বেঞ্চমার্ক সিএসআই ৩০০ সূচক প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। অন্য দিকে, চিনের এক বছরের সরকারি বন্ডের ইল্ড (সুদের হার) নেমে এসেছে প্রায় ১.২ শতাংশে। তুলনায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক বছরের সরকারি বন্ডের ইল্ড প্রায় ৪.৪৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে কম মুনাফার বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে সোনার প্রতি চিনের আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
সোনা কোনও নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা বা অন্য দেশের সরকারের ঋণপত্র নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক রিজার্ভের বৈচিত্র্য বাড়াতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোতেও বড়সড় ভূমিকা নিতে পারে কাঞ্চন ধাতু। ফলে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক সংঘাত এবং ডলারের উপর নির্ভরতার সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখাও চিনের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে সাম্প্রতিক দিনে সোনার দামেও বড়সড় ওঠানামা দেখা গিয়েছে। জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স সোনার দাম রেকর্ড ৫,৫০০ ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু, সেপ্টেম্বরে তা ৮ শতাংশেরও বেশি কমে প্রায় ৪,১৭৬ ডলারে নেমে আসে। এই দরপতন সত্ত্বেও সোনার ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে আশাবাদী বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষ নাগাদ এক আউন্স সোনার দাম ৪,৭৫০ থেকে ৫,৫০০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে।
সোনার বাজারে চিন বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রেতা। দেশটি যখন বিপুল পরিমাণে সোনা কেনে, তখন তার প্রভাব সামগ্রিক ভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ার পাশাপাশি আলাদা করে ভারতীয় বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত সোনার চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে বলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের সাধারণ ক্রেতা, গয়না ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতির উপর পড়তে পারে।
শুধু চিন বলে নয় যে কোনও দেশই যদি হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণে সোনা কিনতে শুরু করে তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে। অন্য দিকে, অল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহ সেই অনুপাতে না বাড়লে সোনার দামের উপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়। ভারত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়লে ভারতের বাজারেও দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
ভারতে দুর্গাপুজো, ধনতেরাস, দীপাবলি এবং বিয়ের মরসুমে সোনার চাহিদা সাধারণত একটু বেশিই থাকে। এই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চিনের মতো বড় ক্রেতাদের চাহিদা বেশি থাকলে সোনার দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী মহলের একাংশ।
উৎসবের সময় ভারতীয় বাজারে সোনার দাম বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দরের ওঠানামার উপর। চিনের আমদানি পরিমাণ বাড়ালে তা পরোক্ষ ভাবে চাপ তৈরি করতে পারে। তবে দাম যে বাড়বেই এমনটা নিশ্চিত নয় বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা।
অন্যদিকে, মার্কিন ডলারের শক্তি বাড়লে ও সুদের হারের পরিবর্তনে, ভারতীয় টাকার বিনিময় হার কিংবা আমদানি শুল্ক ও সরকারি নীতির বিষয়গুলি পরিবর্তিত হলেও সোনার দামে ওঠানামা শুরু হতে পারে। চিনের সোনা কেনার পরিমাণের চেয়ে আন্তর্জাতিক দাম, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য এবং ভারতের নিজস্ব আমদানি-চাহিদা—এই বিষয়গুলির সম্মিলিত প্রভাবই নির্ধারণ করবে ভারতীয় বাজারে সোনার দাম কতটা বাড়বে।
সোনার প্রতি চিনের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ আন্তর্জাতিক বাজারেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এক দিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজ়র্ভে বৈচিত্র্য আনতে সোনা কেনার দিকে ঝুঁকছে বেজিং, অন্য দিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদাও বাড়ছে। ফলে বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা ও দামের ওঠানামার ক্ষেত্রে চিনের এই বিপুল আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মত আর্থিক বিশেষজ্ঞদের।