নির্মাণকার্য চলে ৮৪ বছর, জলের বদলে ব্যবহার করা হয় ঘি! ভারতের এই রংচঙে বিস্ময়কর মন্দিরে পূজিত হন কোন দেবতা?
৫৫০ বছর আগে তৈরি এই মন্দিরের নির্মাণকার্যে নাকি এক ফোঁটাও জল ব্যবহার করা হয়নি। বদলে ব্যবহার করা হয়েছিল ঘি! তেমনটাই দাবি করেন সেই অঞ্চলের লোকজন।
বিশ্বের বিস্ময় নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। কিন্তু ভারতবাসীদের বিস্মিত হওয়ার জন্য যে কেবল দেশের বাইরেই ছুটে যেতে হবে এমন কোনও বিষয় নেই। বরং আমাদের দেশেই এমন নানা জিনিস রয়েছে যার রূপ যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারে, তেমনই সে সবের কাহিনি শুনে কানকেও বিশ্বাস করা দুষ্কর মনে হয়।
মরুভূমির শহর রাজস্থানের সৌন্দর্য সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলার বাকি থাকে না। বিভিন্ন ইতিহাসের সাক্ষী রয়েছে এই জায়গা। বিস্ময়ও কিছু কম নেই। সেগুলির মধ্যে অন্যতম ভান্দাসর জৈন মন্দির।
৫৫০ বছর আগে তৈরি এই মন্দিরের নির্মাণকার্যে নাকি এক ফোঁটাও জল ব্যবহার করা হয়নি। বদলে ব্যবহার করা হয়েছিল ঘি! তেমনটাই দাবি করেন সেই অঞ্চলের লোকজন।
বিশেষ এই মন্দিরটি রাজস্থানের বিকানেরে অবস্থিত। পাঁচ দশকেরও বেশি আগে তৈরি হওয়া এই মন্দিরে যে জলের ব্যবহার হয়নি তা অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না। তবে ভৌগোলিক দিক থেকে ব্যাপারটি অতটাও অবিশ্বাস্য নয়।
মরুভূমির শহর রাজস্থানে জলের সমস্যা চিরকালীন। বিকানেরের এক ধনী জৈন বণিক ১৪৬৮ সালে মন্দিরটির নির্মাণকার্য শুরু করেন। সেই বণিকের নাম ভান্দাসা অসওয়াল।
আরও পড়ুন:
জৈন ধর্মের পঞ্চম তীর্থঙ্কর সুমতিনাথকে উৎসর্গ করে বিশেষ এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। তাঁকেই দেবতা রূপে পুজো করা হয় সেই মন্দিরে।
স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, সেই সময় বিকানেরে চরম জলসঙ্কট এবং খরা পরিস্থিতি ছিল। সেই কারণে ভান্দাসা জলের পরিবর্তে ঘি ব্যবহার করে মন্দিরটি নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রচলিত বিশ্বাস মতে, ভান্দাসা এক ফোঁটা করে ঘি জমানো শুরু করেন। সেই সময় সকলে তাঁকে লোভী এবং কিপটে মনে করতেন। ভান্দাসার কীর্তি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে হাসির রোল ওঠে। কিন্তু পরবর্তী কালে আনুমানিক ৪০ হাজার কেজি ঘি দিয়ে মন্দির তৈরি করে তিনি সকলের মুখ বন্ধ করে দেন।
স্থানীয়দের কথা অনুযায়ী, চুন-সুড়কির সঙ্গে খাঁটি ঘি মিশিয়ে মন্দিরটি নির্মিত হয়। যদিও বিজ্ঞান এ কথায় বিশ্বাস রাখে না। জলের পরিবর্তে কেবল ঘি ব্যবহার করে কী ভাবে একটি মন্দির তৈরি করা যায় সে বিষয়ে কোনও জুতসই ব্যাখ্যা বিজ্ঞানের কাছে নেই।
আরও পড়ুন:
১৪৬৮ সালে নির্মাণকার্য শুরু হলেও মন্দিরটি তৈরি হতে লেগেছিল বহু বছর সময়। দুঃখের বিষয়, ভান্দাসা নিজে এই মন্দিরের পূর্ণ রূপ দেখে যেতে পারেননি।
১৫১৪ সালে ভান্দাসা মারা যান। কিন্তু তার পরেও মন্দিরের নির্মাণকার্য বন্ধ হয়নি। ১৫৫৪ সালে মন্দিরটি তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হয়। প্রায় ৮৪ বছর ধরে মন্দিরটি তৈরি করা হয়।
তিনতলা এই মন্দির তৈরি করা হয় লাল রঙের বেলেপাথর এবং শ্বেতপাথর দিয়ে। দেওয়াল জুড়ে পাথর কেটে নানা নজরকাড়া নকশা বানানো হয়েছে। এরই সঙ্গে রংচঙে লোকচিত্র এবং কাচের শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে মন্দিরের গা। জৈনদের ২৪ জন তীর্থঙ্করের গল্পও মন্দিরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে।
ঘিয়ের তৈরি এই মন্দিরটি বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই) দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এর উপরে থাকা স্তম্ভগুলিতে দাঁড়ালে প্রায় গোটা বিকানের শহরটির সুন্দর রূপ চাক্ষুষ করা যায়।
স্থানীয়দের দাবি, আজও গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পেরোলেই নাকি মন্দির থেকে ঘি মিশ্রিত ঘাম নির্গত হয়। অনেকে সেটিকে মাখন বলে থাকেন। যদিও এর সত্যতা সম্বন্ধেও সন্দেহ রয়েছে।
তবে যুক্তি-তর্ক সমস্ত ভুলে প্রতি বছর ভারতের লোকজন ছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষজন এই স্থাপত্যশৈলী দেখতে আসেন। বিভিন্ন ইতিহাসবিদেরাও ভারতের একমাত্র ‘ঘিয়ের মন্দির’ নিয়ে আগ্রহী।