একলপ্তে দু’লাখ ভিসা বাতিল করতে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন! কোন ধরনের ভিসায় কোপ? কেন চিন্তা ভারতীয়দের?
নয় নয় করে প্রায় দুই লক্ষের কাছে ভিসা বাতিল করতে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থী এমন বিদেশিদের প্রায় ২ লক্ষ ব্যবসায়িক এবং পর্যটন ভিসা বাতিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
আমেরিকায় আশ্রয়ের জন্য আবেদনকারী এবং বর্তমানে আশ্রয়ে থাকা প্রায় ২ লক্ষ বিদেশির ব্যবসায়িক এবং পর্যটন ভিসা বাতিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এমনটা হলে এটিই হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একক বৃহত্তম ভিসা বাতিলের ঘটনা। তবে মনে করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করতে আইনি বাধার সম্মুখীন হতে হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে।
সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথি এবং দুই আমেরিকান কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যদি এই বিষয়ে কোনও আপত্তি বা সংশোধন না করা হয়, তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেওয়া তথাকথিত বি-১ এবং বি-২ ভিসা বাতিলের ঘোষণা করবে। খবর, এই সিদ্ধান্তের ফলে এমন ভিসা যাঁদের রয়েছে তাঁদের মধ্যে যাঁরা আশ্রয় চেয়েছেন বা বর্তমানে আশ্রয় চাইছেন তাঁদেরই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। জানা গিয়েছে, এই পদক্ষেপ ‘ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’র (ডিএইচএস) সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হবে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, “আমরা ডিএইচএস-এর সঙ্গে সমন্বয় করে সেইসব বিদেশিদের অনভিবাসী ভিসা শনাক্ত এবং বাতিল করছি, যাঁরা অল্প সময়ের পর্যটক হিসাবে আমেরিকায় এসে পরে এখানে স্থায়ী ভাবে থাকার জন্য আশ্রয় চাইছেন।”
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই পদক্ষেপটি ঘোষণা করতে পারে। তবে, শেষ পর্যন্ত কতগুলি ভিসা বাতিল করা হতে পারে, তা নিশ্চিত করেননি টমি। তিনি জানান, এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে এবং ওই সংখ্যাও বদলাতে পারে।
ঠিক কতগুলি ভিসা বাতিল করা হবে, তা বিস্তারিত জানায়নি সে দেশের বিদেশ মন্ত্রক। তবে খবরে প্রকাশ, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় দু’লক্ষ অভিবাসীর ব্যবসায়িক এবং পর্যটন ভিসা বাতিল হবে। সে দিক থেকে এটি আমেরিকার ইতিহাসে একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা হতে চলেছে।
আরও পড়ুন:
বিদেশ মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেওয়া সব বি-১ (ব্যবসায়িক) এবং বি-২ (পর্যটন) ভিসা এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে।
তবে ভিসা বাতিল হলেই সেই ব্যক্তিকে সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা থেকে বার করে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে তারা। বর্তমানে যাঁদের আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগের ভিসার মর্যাদা নতুন করে পরিবর্তন করা হতে পারে বলেও জানা গিয়েছে। তবে তাঁরা ব্যবসা বা পর্যটনের জন্য আমেরিকায় যাওয়ার অস্থায়ী ভিসা হারাবেন।
এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাও অভিযোগ করেন, সে দেশের অভিবাসন ব্যবস্থা দীর্ঘ দিন ধরে ‘ভিত্তিহীন বা ভুয়ো আবেদনে’ ভরে গিয়েছে।
বি১ ভিসা সাধারণত ব্যবসায়িক ভ্রমণের জন্য দেওয়া হয়। অন্য দিকে, বি২ ভিসার আওতায় পর্যটন, পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এবং চিকিৎসা পরিষেবা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, বর্তমান বি১ এবং বি২ আবেদনকারীদের এই মর্মে আবেদন করতে হবে যে, তাঁরা সে দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করবেন না এবং তাঁদের নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও জানাতে হবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে ভিসার নিয়মকানুন ক্রমশ কঠোর করেছে সে দেশের প্রশাসন। এই পদক্ষেপগুলির মধ্যে আবেদনকারীদের সমাজমাধ্যমের ইতিহাস অতিরিক্ত যাচাই, ব্যয়বহুল ভিসা বন্ড এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদানের উপর বিধিনিষেধও রয়েছে।
ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাও কিছু পর্যটকের বিরুদ্ধে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করার আগেই পর্যটন এবং ব্যবসায়িক ভিসা ব্যবহার করে আমেরিকায় প্রবেশের অভিযোগ করেছেন। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “আশ্রয় অভিবাসন আইন এড়ানোর কোনও ফাঁক থাকতে পারে না।”
বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রশাসনের এই পদক্ষেপটি ভিসা বাতিলের ব্যাপক সম্প্রসারণেরই একটি অংশ। স্টেট ডিপার্টমেন্ট গত ১৮ মাসে প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ভিসা বাতিল করেছে বলে জানা গিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে ধর্ষণ এমনকি ডাকাতির মতো বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। সেইসঙ্গে যাঁরা আমেরিকান নীতির বিরুদ্ধে, বিশেষ করে পশ্চিম-এশিয়া সংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন তাঁরাও রয়েছেন সেই তালিকায়।
জানা গিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নজরে রয়েছে তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজ়ম’ও। এর আগে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রথা বন্ধ করার চেষ্টা করেছে তারা। যদিও সেই প্রচেষ্টাগুলি আদালতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়েও আসতে হয়েছে তাদের।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথি থেকে জানা যায়, ‘ইউএস সিটিজ়েনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস’ থেকে আশ্রয়ের আবেদন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর আধিকারিকেরা বর্তমান বি১ এবং বি২ ভিসা যাঁদের রয়েছে তাঁদের নথি খতিয়ে দেখা এবং যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেন।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে এই ব্যাপক অভিযান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং যথাযথ আইনি অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করেছে। ভিসা এবং গ্রিন কার্ড বাতিলের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও জোরদার করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এর ফলে মূলত জাতিগত সংখ্যালঘুরা চরম বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন।