৭৯ বছরে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! কেন চার টুকরো হতে পারে ভারতকে টুকরো করা ব্রিটেন? নেপথ্যে তিন ‘বিদ্রোহী’?
যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। নিজের নিজের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে সমর্থন করে একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করে তারা। ফলে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
স্বাধীনতার বদলে দেশকে দু’টুকরো করে ভেঙে দিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশরা। ভারত বিভাজনকারী ব্রিটেন এ বার নিজেরাই বিভাজনের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। ‘র্যাডক্লিফ লাইন’ যে ভাবে ১৯৪৭ সালে ভারতের মানচিত্রে বদল ঘটিয়েছিল, ঠিক সে ভাবেই এ বার বদল ঘটতে পারে ব্রিটেনের মানচিত্রে।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড বেরিয়ে আসতে চায় ব্রিটেনের আওতা থেকে। ব্রিটেন ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে একজোট হচ্ছে এই তিন দেশ। ইংল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড কিংডমের (যুক্তরাজ্য বা ইউকে) দেশগুলির এই কৌশলে স্বাভাবিক ভাবেই চাপে ব্রিটিশেরা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব একসঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের সপক্ষে জোরালো সওয়াল তুলেছে। যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। তিন পক্ষই একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে, যা যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘‘ওয়েস্টমিনস্টারের সময় ঘনিয়ে আসছে। তিনটি দেশই মনে করে, আগামী দিনে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।’’ স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব পার্লামেন্ট ও সরকার রয়েছে। তবে তারা স্বাধীন বা সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব পার্লামেন্ট ও সরকার থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ক্ষমতা এখনও লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের হাতে। জাতীয়তাবাদী দলগুলির দাবি, স্থানীয় মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারগুলির হাতে আরও বেশি ক্ষমতা থাকা উচিত।
আরও পড়ুন:
ইংল্যান্ডকে বাদ দিলে তিনটিই যুক্তরাজ্য বা ইউনাইটেড কিংডমের (ইউকে) অংশ। ফলে এই তিন অঞ্চলের কোনওটি যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ইউকের সার্বিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর উপর। যুক্তরাজ্যের বর্তমান কাঠামো মূলত ইংল্যান্ড ও এই তিন দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গত সোমবার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা সাংবিধানিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের নিজের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে সমর্থন করে একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করেন তাঁরা। কার্ডিফে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি, ওয়েলসের নেত্রী রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি), ওয়েলসের প্লেড কামরি এবং আইরিশ ঐক্যপন্থী সিন ফেইনের মতো রাজনৈতিক দলগুলি যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। যদিও ভিন্ন ভিন্ন সময়সীমা ও শর্তে। এই প্রথম বার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড— তিন জায়গাতেই স্বাধীনতাপন্থী বা জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বে রয়েছে। ফলে বিচ্ছিন্ন দাবিগুলি এখন একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘বিদ্রোহী’ দেশগুলির মধ্যে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবি সবচেয়ে পুরনো ও শক্তিশালী। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার জন্য গণভোট হয়েছিল। তখন ৫৫.৩% ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ৪৪.৭% স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেন। কিন্তু এর পর ব্রেক্সিট, লন্ডনের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং স্কটিশ জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দেওয়ায় স্বাধীনতার দাবি আবার জোরালো হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ নিয়ে মতবিরোধ এই ত্রয়ীর জোটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্কটল্যান্ডের একটি বড় অংশ ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়। অথচ যুক্তরাজ্য ব্রেক্সিটের মাধ্যমে ইইউ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। তাই স্বাধীন স্কটল্যান্ড হলে আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে দেশটির জাতীয়তাবাদীরা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
২০১৬ সালে স্কটল্যান্ডের ৬২ শতাংশ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিলেও, যুক্তরাজ্যব্যাপী ফলাফল প্রকাশের পর তারা ইইউ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। জাতীয়তাবাদীরা এটিকে ‘পরিস্থিতির একটি বড় পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। স্কটিশ জাতীয়তাবাদীদের যুক্তি, ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে এলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো আরও বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে।
স্বাধীনতার পক্ষে স্কটিশ রাজনীতিবিদদের অন্যতম প্রধান যুক্তি হল তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক ঘাটতি’। স্কটল্যান্ডের মানুষ সামাজিক খরচ, কর ব্যবস্থা কিংবা ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত চান, তা সব সময় বাস্তবায়িত হয় না। কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়েস্টমিনস্টারের প্রভাব অনেক বেশি।
যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার বড় অংশ ইংল্যান্ডে বসবাস করায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও ইংল্যান্ডের ভোটারদের প্রভাব অনেকটাই বেশি। ফলে স্কটল্যান্ডের মানুষের রাজনৈতিক পছন্দ অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ইংল্যান্ডের ভোটের কাছে গুরুত্ব হারায় বা কার্যত উপেক্ষিত হয়। এমনটাই অভিযোগ স্বাধীনতাপন্থীদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেন ছেড়ে বেরিয়ে আসার চুক্তির আবহে গুরুত্ব বাড়ছে ওয়েলসের। স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি প্লেড কামরির মতো বামঘেঁষা দলটি। তবে স্কটল্যান্ডের তুলনায় ওয়েলসে স্বাধীনতার সমর্থন এখনও কম। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, মাত্র ৩২% মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে। তাই প্লেড কামরির মতো দলের নেতৃত্ব আপাতত সরাসরি বিচ্ছেদের চেয়ে ওয়েলসের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়ার দাবিতে জোর দিচ্ছেন।
তবে ওয়েলসে জাতীয়তাবাদী নেতারা স্কটল্যান্ডের মতো ধারণা পোষণ করেন। তাঁদের দাবি, কর ব্যবস্থা, জনকল্যাণমূলক নীতি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ এখনও ওয়েস্টমিনস্টারের হাতেই রয়েছে। ফলে ওয়েলসের নিজস্ব সরকার চাইলেও দারিদ্র কমানো, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে স্বাধীন ভাবে বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
অন্য দিকে, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। দেশটির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু স্বাধীনতা নয়, বরং আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনরায় এক হওয়ার। ১৯২০-এর দশকে আয়ারল্যান্ড ভাগ হওয়ার পর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ থেকে যায়। কিন্তু ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হতে চান, তা হলে গণভোটের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের মূল অনুঘটক হয়ে উঠেছে ব্রেক্সিট। ২০১৬ সালের গণভোটে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিলেও, স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যথাক্রমে ৬২% এবং ৫৫.৮% ভোটে থেকে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হওয়ার অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সরাসরি জড়িত বলে মনে করছেন সে দেশগুলির বাসিন্দাদের অনেকেই। জাতীয়তাবাদীদের মতে, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থাকার তুলনায় স্বাধীন হয়ে আবার ইইউ-তে যোগ দিলে এ সব অঞ্চলের জন্য বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরও বেশি সুযোগ তৈরি হতে পারে।