ফকল্যান্ড-ঝগড়ায় দক্ষিণ আটলান্টিকে বারুদের গন্ধ! ৪৪ বছর পর ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে মেসির আর্জেন্টিনা?
ফের ফকল্যান্ড বিবাদকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে চড়ছে পারদ। অচিরেই যা যুদ্ধে বদলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
আটলান্টিকের আকাশে বারুদের গন্ধ। ৪৪ বছর পর নতুন করে সলতে পাকাচ্ছে ফকল্যান্ড দ্বন্দ্ব। এই বিবাদের একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সদ্য বিদায় নেওয়া লিওনেল মেসির দেশ আর্জেন্টিনা। অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে একদা দুনিয়া জুড়ে রাজত্ব চালানো ব্রিটেন। সাম্প্রতিক সময়ে যাদের ফৌজ আবার মেতে আছে সংশ্লিষ্ট দ্বীপ পুনর্দখলের সামরিক মহড়ায়। দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে কী করবে আমেরিকা? উঠছে সেই প্রশ্নও।
দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্ক আজকের নয়। এলাকাটি অন্যতম ‘ব্রিটিশ সামুদ্রিক অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃত। যদিও তাদের মূল ভূখণ্ডের থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮,০০০ মাইল। অন্য দিকে, আর্জেন্টিনার থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে দাঁড়িয়ে আছে ফকল্যান্ড। বুয়েনোস আইরেস এর নাম দিয়েছে ইসলাস মালভিনাস। দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বীপপুঞ্জকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে তারা।
বর্তমানে ফকল্যান্ডের জনসংখ্যা ৩,৬৬২। এদের ৩০ শতাংশই আবার সেখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে না। ষোড়শ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম ইংরেজ নাবিক জন ডেভিডের চোখে পড়ে ওই দ্বীপ। এর পর ১৬৯০ সালে সেখান পা রাখেন ব্রিটিশ নৌসেনা অফিসার জন স্ট্রং। ১৯ শতক আসতে আসতে গোটা ফকল্যান্ড কব্জা করে ফেলে তারা। ফলে ভারতের মতোই সেখানেও গড়ে ওঠে উপনিবেশ। ১৮৪০ সালে ‘ক্রাউন কলোনি’র তকমা পায় সেটি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-’১৮) চলাকালীন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ সংলগ্ন এলাকায় মুখোমুখি হয় জার্মান ও ব্রিটিশ নৌসেনা। সেই লড়াইতে বার্লিনের জল-যোদ্ধারা একেবারেই সুবিধা করতে পারেনি। এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) শেষ হলে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে ইংরেজ সরকার। ঐতিহাসিক ভাবে জায়গাটা তাদের বলে দাবি করে বসে বুয়েনোস আইরেস।
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে ফকল্যান্ড বিবাদ মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রপুঞ্জ। ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনাকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয় তারা। সেই মতো শুরুও হয় প্রক্রিয়া। ৮০-এর দশকে ইংরেজ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার সংশ্লিষ্ট দ্বীপপুঞ্জকে বুয়েনোস আইরেসের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় পাকা করে ফেলেন। তখনই একটি মারাত্মক ভুল করে বসে লিয়োনেল মেসির দেশ।
আরও পড়ুন:
মূল ব্রিটিশ ভূখণ্ড থেকে ফকল্যান্ডের দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সেখান শাসন পরিচালনা মোটেই সহজ নয়। উল্টে এর জন্য ফি বছর কোটি কোটি টাকার খরচ হয় ইংরেজদের। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট দ্বীপপুঞ্জটি আর্জেন্টিনার হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন থ্যাচার। এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চলছিল আলোচনা। ঠিক তখনই ধৈর্যচ্যুতি ঘটে বুয়েনোস আইরেসের। আচমকাই ফকল্যান্ড আক্রমণ করে বসে তারা।
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল ইসলাস মালভিনাসে সামরিক অভিযান নামে আর্জেন্টিনার বাহিনী। সেই খবর লন্ডনে পৌঁছোতেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন থ্যাচার। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিশাল নৌবহর পাঠান তিনি। দু’পক্ষের মধ্যে টানা ৭৪ দিন ধরে চলে যুদ্ধ। এই লড়াইতে ৬৪৯ জন সৈনিক হারায় বুয়েনোস আইরেস। অন্য দিকে মৃত্যু হয় ২৫৫ জন ব্রিটিশ ফৌজির। এ ছাড়া সংঘর্ষে প্রাণ যায় ফকল্যান্ডের তিন বাসিন্দারও।
উল্লেখ্য, সামরিক অভিযানে ফকল্যান্ড দখলের স্বপ্ন আর্জেন্টিনার পূরণ হয়নি। ১৯৮২ সালের ১৪ জুন ইংরেজ নৌবাহিনীর সামনে আত্মসমর্পণ করে তারা। লড়াইতে হেরে গেলেও ইসলাস মালভিনাস ফিরে পাওয়ার আশা বুয়েনোস আইরেস কোনও দিনই ছাড়েনি। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সংশ্লিষ্ট দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের সামুদ্রিক এলাকায় খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করে ব্রিটিশ সরকার।
গোড়ার দিকে ‘তরল সোনা’র ভান্ডার খোঁজার ব্যাপারে আর্জেন্টিনাকে সঙ্গে থাকার মেগা অফার দেয় ইংরেজ প্রশাসন। প্রথমে তাতে রাজি হলেও পরে সেখান থেকে সরে আসে বুয়েনোস আইরেস। ফলে, ২০১২ সালে একাই এই অনুসন্ধানে নামে ব্রিটিশ সরকার। এর নাম ‘সি লায়ন’ তেল প্রকল্প দিয়েছে তারা। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ওই এলাকা থেকে ৯১.৭০ কোটি ব্যারেল তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর (পড়ুন, ২০২৭ সাল) ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ সংলগ্ন সমুদ্রে খোঁড়া হবে তেলের কুয়ো। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ শুরু হবে বাণিজ্যিক ভাবে উত্তোলন। ইংরেজদের এহেন ‘সি লায়ন’ মেগা প্রকল্পটির পরিচালনায় রয়েছে ইজ়রায়েলি সংস্থা ‘নাভিতাস পেট্রোলিয়াম’। পাশাপাশি, এতে কাজ করছে ‘রকহপার এক্সপ্লোরেশন’ নামের একটি ব্রিটিশ সংস্থাও।
‘সি লায়ন’ তেল প্রকল্পের প্রথম ধাপেই খরচের অঙ্ক ছাড়াতে পারে ২১০ কোটি ডলার। এর মোট ব্যয় আনুমানিক ৪০০ কোটি ডলারের আশেপাশে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ব্রিটিশ সরকার ফকল্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ‘তরল সোনা’র ভান্ডার খুঁজতে নামার পর থেকেই চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে আর্জেন্টিনা। তাদের এলাকায় এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না বলে জানিয়েছে বুয়েনোস আইরেস।
ফকল্যান্ড বিতর্কের অবসান ঘটাতে ২০১৩ সালে সেখানে গণভোটের আয়োজন করে ব্রিটেন। কিন্তু, তাতে হার হয় আর্জেন্টিনার। কারণ, ইংরেজ শাসনাধীনে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছেন দ্বীপটির প্রায় ৯৯ শতাংশ বাসিন্দা। তা সত্ত্বেও দু’পক্ষের রাজনৈতিক টানাপোড়েন কমেনি। চলতি বছরের ফিফা বিশ্বকাপে ফুটবলের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে সেই উত্তাপ। যার কড়া সমালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সরব হয়েছে ব্রিটিশ প্রশাসন।
প্রসঙ্গত, এ বছরের ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে মেসির আর্জেন্টিনা। খেলা শেষ হতেই বিশেষ একটি ব্যানার হাতে উল্লাসে মেতে ওঠেন লাটিন আমেরিকার দেশটির সমর্থকরা। তাতে স্পেনীয় ভাষায় লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’। অর্থাৎ মালভিনাস আর্জেন্টিনার। ম্যাচ জিতে ওই ব্যানার নিয়ে আনন্দ করতে দেখা যায় বুয়েনোস আইরেসের খেলোয়াড়দেরও।
গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় দেওয়া ভাষণে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রসঙ্গ তোলেন আর্জেন্টিনীয় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। শুধু তাই নয়, দেশে ফিরে ওই এলাকায় তেলের খোঁজ বন্ধ করতে বলে ব্রিটেনকে চরম হুঁশিয়ারি দেন তিনি। বুয়েনোস আইরেসের সাফ বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট দ্বীপগুলি তাদের। ফলে, সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের কোনও আইনগত অধিকার নেই ইউরোপীয় ইংরেজ সরকারের।
সেই কারণেই ‘সি লায়ন’ তেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাকে দু’সপ্তাহের মধ্যে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন আর্জেন্টিনীয় প্রেসিডেন্ট মিলেই। ব্রিটেনের আশঙ্কা, ১৯৮২ সালের মতো ফের সামরিক অভিযান চালিয়ে ফকল্যান্ড দখলের চেষ্টা করবে বুয়েনোস আইরেস। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দ্বীপপুঞ্জ পুনরুদ্ধারের নামতে হবে তাদের। আর তাই সামরিক অনুশীলনে জোর দিয়েছে ইংরেজ নৌসেনা। পাশাপাশি, আমেরিকার সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে তারা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। পরে ফকল্যান্ডের ব্যাপারে এক প্রশ্নের উত্তরে ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) বলেন, ‘‘যুদ্ধ বাধলে আমরা ইংরেজদের সামরিক সহায়তা দেব, সেই নিশ্চয়তা নেই।’’ ফলে শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হলে, আটলান্টিকের ওই দ্বীপপুঞ্জের দখল কার হাতে যাবে, তার উত্তর দেবে সময়।