যুদ্ধে লাগামহীন খরচ, অর্থ জোগাড়ে পর্ন ভিডিয়োকে আইনি স্বীকৃতি দিতে চলেছে কিভ! মাস্টারস্ট্রোক জ়েলেনস্কির?
রুশ ফৌজের বিরুদ্ধে একটানা লড়াইয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে কিভের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের জন্য দেশের পর্নোগ্রাফি শিল্পকে আইনি স্বীকৃতি ও করের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
টানা সাড়ে চার বছর ধরে প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির বাহিনীর পরাক্রম গোটা দুনিয়ার কাছে এখন উদাহরণ। সীমিত ক্ষমতা নিয়েও জ়েলেনস্কির সেনা রুখে দিয়েছে রাশিয়ার ফৌজকে। প্রাথমিক একতরফা হানা পরিণত হয়েছিল পুরোদস্তুর যুদ্ধে। দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার দেশটির বিরুদ্ধে কিভ যে ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তা দেখে আশ্চর্য সমর বিশেষজ্ঞেরাও।
রুশ ফৌজের বিরুদ্ধে একটানা লড়াইয়ে অবশ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে কিভের অর্থনীতি। ইউক্রেনের অর্থনীতির উপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে দেশের বিপুল অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিকাঠামো, শিল্প এবং ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ায় সরকারের আয়ও কমছে। ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ছে এবং বিদেশি সাহায্য ও ঋণের উপর ইউক্রেনকে আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের খরচ জোগাতে নতুন রাজস্বের উৎস খুঁজছে কিভ।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহে মরিয়া ইউরোপের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এই মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটি। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংঘর্ষে কোটি কোটি রিভনিয়া (ইউক্রেনের মুদ্রা) খরচ হয়ে গিয়েছে। যুদ্ধ চালাতে চাই আধুনিক সমরাস্ত্র। তাই অস্ত্রের জোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য নিষিদ্ধ শিল্পকে আইনি স্বীকৃতি দিতেও আপত্তি নেই জ়েলেনস্কি সরকারের। তীব্র আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলার উদ্দেশ্যে পর্ন ছবিকেও করের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
২০১৫-’১৯ সালের মধ্যে দুনিয়াব্যাপী হাতিয়ার আমদানির মাত্র ০.১ শতাংশ ছিল কিভের দখলে। কিন্তু, ২০২০-’২৪ সালের মধ্যে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এই সময়সীমার মধ্যে পূর্ব ইউরোপের দেশটিতে ৯,৬২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল হাতিয়ারের আমদানি। এই অস্ত্রশস্ত্র কিনতে যে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে ফেলেছে কিভ, তা বলাই বাহুল্য।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনে তীব্র আর্থিক সঙ্কট। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের জন্য দেশের পর্নোগ্রাফি শিল্পকে আইনি স্বীকৃতি ও করের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আড়াই কোটি ডলার পর্যন্ত কর আদায় হতে পারে। সেই টাকা দিয়ে যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য ভাবনাচিন্তা করছে ইউক্রেন।
আরও পড়ুন:
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর খরচ জোগাতে ইউক্রেন নতুন আয়ের পথ খুঁজছে নিষিদ্ধ ছবির মাধ্যমেই। পর্নোগ্রাফিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি বিল ইউক্রেনের সংসদে প্রথম দফায় পাস হয়েছে। এখন বিলটি দ্বিতীয় বার পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।
ভেরখোভনা রাডার বা ইউক্রেনের সংসদের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের সাংসদ ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজ়নিয়াক এই বিলটির অন্যতম প্রস্তাবক। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এই শিল্পের উপর কর বসিয়ে বছরে সর্বোচ্চ আড়াই কোটি ডলার উপার্জন করতে পারে ইউক্রেন। বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ঝেলেজ়নিয়াকের উদ্যোগে আনা বিলটি পাস হলে সোভিয়েত আমলের একটি আইনকে বাতিল করতে হবে। ইউক্রেনীয় সংসদের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ঝেলেজ়নিয়াকের অনুমান, করের থেকে প্রাপ্ত অর্থ যুদ্ধের প্রয়োজনে প্রায় ৩০,০০০ ড্রোন কেনার পক্ষে যথেষ্ট হতে পারে।
অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্র বা ভিডিয়োর ক্ষেত্রে উদার মনোভাব দেখায় না ইউক্রেন। এ ক্ষেত্রে এত দিন বেশ কিছুটা রক্ষণশীল মনোভাবই পোষণ করেছে পূর্ব ইউরোপের দেশটি। সোভিয়েত আমলের সেই আইন মোতাবেক ইউক্রেনে পর্নোগ্রাফি তৈরি, বিতরণ এবং নিজের কাছে রাখা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বর্তমানে ইউক্রেনে পর্নোগ্রাফি তৈরি করা বা তা ছড়িয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ। এই অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়েই পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন:
ইউক্রেনের জেনারেল প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানিয়েছে, গত মে মাসে দেশের তিনটি পৃথক অঞ্চলে কয়েক জন পুলিশ ও সরকারি আধিকারিক পর্ন স্টুডিয়োগুলিকে আইনি ব্যবস্থা থেকে আড়াল করে রাখার বিনিময়ে প্রতি মাসে ২০ হাজার ডলারেরও বেশি ঘুষ নিচ্ছিলেন বলে অভিযোগে উঠে এসেছে।
প্রাপ্তবয়স্ক ভিডিয়ো নির্মাতা স্বেতলানা ডভোর্নিকোভা জানান, এক সকালে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পুলিশ তাঁর বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশ তাঁর ল্যাপটপ, হার্ড ড্রাইভ এবং ২০ হাজার ডলার বাজেয়াপ্ত করে। ডভোর্নিকোভার দাবি, পুলিশের কাছে ওয়েবক্যাম মডেলদের একটি তালিকা ছিল এবং তাঁদের সবার ঠিকানাও পুলিশের গোচরে ছিল।
ডভোর্নিকোভা আরও অভিযোগ করেন, মামলা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ তাঁকে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। আরও এক তরুণী জানান, তাঁর বাড়িতেও একই ভাবে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছিল। পরে তাঁকে আদালতে হাজির হতে বলা হলেও তিনি যাননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, সেখানে তাঁকে ঘুষ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতে পারে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ঝেলেজ়নিয়াক জানিয়েছেন, পর্নোগ্রাফি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ইউক্রেনীয়েরা এক অদ্ভুত সমস্যার মুখে পড়ছেন। এই শিল্প থেকে আয় করার পর কর না দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে। আবার কর সংক্রান্ত দাখিলে আয়ের উৎস উল্লেখ করলেও পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত আইন ভাঙার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আইনপ্রণেতার মতে, এটি উভয় সঙ্কট হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই বিনোদনশিল্পের সঙ্গে যুক্তদের সামনে।
রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেন আক্রমণ করার আগে সে দেশের সরকার প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদন বা পর্নোগ্রাফি ব্যবসার বিষয়ে খুব একটা কড়াকড়ি করত না। বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করা হত। তবে সম্প্রতি ইউক্রেনের জেনারেল প্রসিকিউটরের কার্যালয় এমন কয়েকটি ঘটনা সামনে এনেছে, যেখানে তিনটি অঞ্চলের কিছু প্রশাসনিক আধিকারিকের বিরুদ্ধে পর্ন ব্যবসা চালানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর বদলে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন সরকারি আধিকারিকেরা।
ইউক্রেনের বিরোধী দলের বহু নেতাই সরকারের এই ‘দ্বিচারিতা’র বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। পর্নোগ্রাফি তৈরি বা বিতরণের ফলে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হলেও, যে সব বিষয়স্রষ্টা (কনটেন্ট ক্রিয়েটর) বিদেশি দুষ্টু ভিডিয়োর প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আয় করেন, তাঁদের কর পরিশোধ করতেও নির্দেশ দিচ্ছেন আদায়কারী কর্তৃপক্ষ, দাবি বিরোধী পক্ষের নেতাদের।
অনলাইনে এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার হওয়ায় এটি ইউক্রেন সরকারের কাছে কর আদায়ের একটি বড় সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে মত অনেকেরই। ইংল্যান্ডের একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভিডিয়োর ওয়েবসাইটের মূল সংস্থা ফিনিক্স ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ৭,৯০০ জন ইউক্রেনীয় বিষয়স্রষ্টা তাঁদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ১৩ কোটি ১০ লক্ষ ডলারের বেশি আয় করেছেন। ফলে এই আয়কে করের আওতায় আনা গেলে সরকারের কোষাগারে উল্লেখযোগ্য অর্থ জমা পড়তে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি বিষয়বস্তু নির্মাতারাও আইন পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছেন। দুষ্টু ভিডিয়োর এক ইউক্রেনীয় মডেলের দাবি, তিনি প্রায় ৯,০০,০০০ ডলার কর দিয়েছেন। পর্নোগ্রাফিকে অপরাধমুক্ত করার দাবিতে একটি আবেদনপত্রও চালু করেছেন তিনি। যুক্তি দিয়েছেন, যে সব নির্মাতা কর বিধি মেনে চলেন, শুধুমাত্র তাঁদের কাজের ধরনের উপর বিচার করে ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।
যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে এই ক্ষেত্রটি থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে যুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার চালানো কার্যত অসম্ভব। ইউক্রেনের মোট প্রতিরক্ষা খরচের তুলনায় এই অর্থ নগণ্যই বলা চলে। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের জন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রয়োজন কয়েক হাজার কোটি ডলার। তবে সমর্থকদের মতে, বিদেশি সাহায্যের বদলে দেশের ভিতর থেকে কর হিসেবে পাওয়া অর্থের সুবিধা হল, তা দ্রুত ও সরাসরি সেনাবাহিনীর প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগানো যায়।
ইউক্রেনকে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি ডলার প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করতে হয়। এই বিপুল ব্যয় মেটাতে দেশটি বিদেশি সামরিক সহায়তা ও আর্থিক সাহায্যের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ঝেলেজ়নিয়াকের হিসাব অনুযায়ী, এই সম্ভাব্য করের টাকা দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার সামরিক ড্রোন কেনা যেতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি ও হামলার কাজে ড্রোন এখন ইউক্রেনের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।