ষাটোর্ধ্ব ‘বাঘের’ গর্জনে থরহরি কম্প! আমেরিকার লড়ঝরে বিমান উড়িয়ে আমেরিকারই ‘দুর্ভেদ্য দুর্গে’ বোমাবর্ষণ ইরানের!
‘ক্যাম্প বুহরিং’ নামের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি বোমাবর্ষণের সাফল্যে দুনিয়া জুড়়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। বুড়ো হয়ে যাওয়া, বাতিল হওয়া আমেরিকার অস্ত্রে আমেরিকা বধের ছক কষে তেহরান। তার পর...
এ যেন, ৬০ বছরের বুড়োর মারে ২৫ বছরের কুস্তিগিরের কুপোকাৎ হওয়া! যুদ্ধের ময়দানে ফের একবার সেই ছবি ফেরাল ইরান। লড়ঝরে লড়াকু জেটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থার কবচ ফালাফালা করে দিল তারা। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার অস্ত্রেই আমেরিকার গায়ে ‘বিষাক্ত হুল’ ফুটিয়েছে তেহরান। বলা বাহুল্য, ওয়াশিংটনের জন্য সেটা ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে’র শামিল।
সম্প্রতি, উত্তর-পশ্চিম কুয়েতের ‘ক্যাম্প বুহরিং’ নামের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে ইরানি বায়ুসেনা। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ‘এবিসি নিউজ়’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ছাউনি ধ্বংস করতে গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের ‘এফ-৫ টাইগার টু’ নামের লড়াকু জেট ব্যবহার করে তেহরান। আমেরিকার তথাকথিত অতি শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্সের সামনে একে ‘আত্মহত্যার শামিল বললে অত্যুক্তি হবে না।
ইরাক সীমান্ত লাগোয়া কুয়েতি মরুভূমির অন্তর্গত আমেরিকার ‘ক্যাম্প বুহরিং’ সেনাঘাঁটির তুলনা একমাত্র কোনও দুর্ভেদ্য দুর্গের সঙ্গে করা যেতে পারে। ছাউনির সর্বোচ্চ সৈনিক ধারণক্ষমতা ১৪,০০০। যদিও বর্তমানে সেখানে ক’জন মোতায়েন রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এর নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করেছে আমেরিকা। এর মধ্যে ‘প্যাট্রিয়ট’ ছাড়া স্বল্পপাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র উল্লেখ্যযোগ্য।
দুনিয়ার তাবড় সেনা অফিসারদের বড় অংশই মনে করতেন, আকাশপথে ‘ক্যাম্প বুহরিং’-এ বোমাবর্ষণ কার্যত অসম্ভব। কারণ, গোটা ঘাঁটির বিভিন্ন জায়গায় কোটি কোটি ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক রেডার লাগিয়ে রেখেছে আমেরিকা। ২৪x৭ অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দিচ্ছে সেগুলি। যুক্তরাষ্ট্রের সেই ‘চোখ’কে ফাঁকি দিয়ে ওই ছাউনিতে বোমাবর্ষণকে তাই ইরানের নৈতিক জয় হিসাবেই দেখছে বিশেষজ্ঞ মহল।
মার্কিন সেনাকর্তাদের উদ্ধৃত করে ‘এবিসি নিউজ়’ জানিয়েছে, রেডারকে ফাঁকি দিতে খুব নিচু দিয়ে উড়ে এসে ‘ক্যাম্প বুহরিং’ ঘাঁটিতে বোমা ফেলে ইরানি ‘এফ-৫ টাইগার টু’। সামরিক পরিভাষায় এর নাম ‘ডাম্ব বম্বিং’। অর্থাৎ হামলার সময় লেজ়ার বা কোনও উপগ্রহভিত্তিক দিক নির্ণয়কারী হাতিয়ারে হামলা চালাননি তেহরানের পাইলট। নিজের দক্ষতায় নিশানা বুঝে নিয়ে ঠিক তার উপর বোমা ফেলেন তিনি।
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর (১৯৩৯-’৪৫) যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সামরিক ঘাঁটিতে এই ধরনের হামলা নজিরবিহীন। ইরানি সাফল্যের নেপথ্যে মূলত তিনটি কারণকে চিহ্নিত করেছে পর্যবেক্ষক মহল। প্রথমত, ‘ক্যাম্প বুহরিং’-এ মোতায়েন থাকা সৈনিকদের বাড়তি আত্মতুষ্টি। দ্বিতীয়ত, ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। মূলত, মাঝ-আকাশে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে একে তৈরি করা হয়েছে, লড়াকু জেটের জন্য নয়।
সবশেষে অবশ্যই বলতে হবে ইরানি পাইলটের দক্ষতা। অত্যাধুনিক মার্কিন রেডারকে ফাঁকি দিতে বুড়ো যুদ্ধবিমানকে খুব নিচু দিয়ে ওড়ানো মোটেই সহজ নয়। তা ছাড়া, অভিযানের একেবারে শেষ দফায় যে ভাবে তিনি ‘ডাম্ব বম্বিং’ চালান, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। এই ঘটনায় নিহত সৈনিকের সংখ্যা এবং ‘ক্যাম্প বুহরিং’-এর ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। আক্রমণের পর তেহরানের জেটটিও ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে।
১৯৫৯ সালের জুলাইয়ে প্রথম বার ‘এফ-৫ টাইগার’ লড়াকু জেটকে আকাশে ওড়ায় আমেরিকা। হালকা ওজনের এই ‘সুপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে গতিশীল) যুদ্ধবিমানের নির্মাণকারী সংস্থা হল ‘নর্থরপ কর্পোরেশন’। ১৯৬৪ সালে সংশ্লিষ্ট জেটটিকে বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় পুরোদমে চলছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ফলে, কর্মজীবনের শুরুতেই সেই লড়াইয়ে নামতে হয় ‘এফ-৫ টাইগার’কে।
১৯৭৯ সালের ‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর আগের পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গলায় গলায় ‘বন্ধুত্ব’ ছিল ইরানের। সেই কারণে গত শতাব্দীর ৬০ ও ৭০-এর দশকে তেহরানকে ‘এফ-৫ টাইগার’ সরবরাহ করতে দু’বার ভাবেনি আমেরিকা। ফলে, একটা সময় সাবেক পারস্যের বিমানবাহিনীর বহরে এই জেটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫০। পরবর্তীকালে সেগুলির দখল নেয় ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।
আরও পড়ুন:
‘ইসলামীয় বিপ্লবে’ রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে শিয়া ধর্মগুরুদের শাসনাধীনে চলে যায় ইরান। কুর্সি পেয়েই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে থাকেন তাঁরা। ফলে, ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কে চিড় ধরতে বেশি সময় লাগেনি। পরবর্তী দশকগুলিকে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রটিকে কোণঠাসা করতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় আমেরিকা। এতে ‘এফ-৫’-এর রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮৭ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের জেটটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ‘নর্থরপ কর্পোরেশন’। এতে ধীরে ধীরে কমতে থাকে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটির ব্যবহার। ২১ শতক আসতে আসতে দুনিয়া থেকে একরকম গায়েব হয়ে যায় ‘এফ-৫ টাইগার’। সেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম ইরানি বিমানবাহিনী। বুড়ো জেটগুলিকে এখনও অবসরে পাঠায়নি তারা। বর্তমানে তাদের কাছেই এই যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় বহরটি রয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে নামে আমেরিকা। সেই থেকে যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গোটা পশ্চিম এশিয়া। ‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লড়াই শুরুর সময় তেহরানের কাছে ছিল ৩৫-৫০টি ‘এফ-৫ টাইগার’। গত আট মাসে জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিরুদ্ধে সংঘর্ষে একাধিক বার বুড়ো হাড়ে রীতিমতো ভেল্কি দেখিয়েছে সেগুলি।
‘এবিসি নিউজ়’-এর দাবি, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে একাধিক মার্কিন হাতিয়ারের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। উদাহরণ হিসাবে পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির ‘এফ-৩৫ লাইটনিং টু’-এর কথা বলা যেতে পারে। প্রযুক্তিগত কারণে একরকম অদৃশ্য থেকে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের এই লড়াকু জেট। গত মার্চে ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে আমেরিকার গর্বের একটি ‘এফ-৩৫’কে ধ্বংস করে ইরান।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘লকহিড মার্টিন’ নির্মিত পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানটির আনুমানিক দাম দু’লক্ষ কোটি ডলার। হামলার সময় রেডারে ‘এফ-৩৫’ প্রায় ধরা পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু, তীব্র গতিতে ওড়ার কারণে উচ্চ তাপ নির্গত করে থাকে এর ইঞ্জিন। সেটা লুকিয়ে ফেলা জেটটির পক্ষে অসম্ভব। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই তাপ লক্ষ্য করে ইরানি ফৌজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় বলে জানিয়েছে সামরিক বিশেষজ্ঞ মহল।
যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘প্যাট্রিয়ট’-এর আবার অন্য সমস্যা রয়েছে। সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে বেশ কয়েক বার শত্রুর যুদ্ধবিমান চিনতে ভুল করেছে আমেরিকার এই এয়ার ডিফেন্স। গত মার্চে ইরানি জেট মনে করে নিজেদেরই তিনটি ‘এফ-১৫ ইগল’ যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামায় ‘প্যাট্রিয়ট’। সেই ভিডিয়ো ভাইরাল হয় সমাজমাধ্যমে। তবে সময় মতো ককপিট ছাড়ায় ওই ঘটনায় কোনও মার্কিন পাইলটের মৃত্যু হয়নি।
২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ে ‘ফিদায়েঁ’ হামলা চালায় ইসলামাবাদ মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদ। ওই আত্মঘাতী বিস্ফোরণে প্রাণ যায় আধা সেনার ৪০ জওয়ানের। প্রতিশোধ নিতে কয়েক দিনের মাথায় পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় বালাকোটে সন্ত্রাসীদের গুপ্তঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় দুই প্রতিবেশী।
বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাঘাত শানাতে ‘এফ-১৬’ লড়াকু জেট নিয়ে ভারতের আকাশসীমায় ঢোকে পাক বিমানবাহিনী। লক্ষ্য ছিল জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগর বায়ুসেনাঘাঁটি। ওই সময় সোভিয়েত জমানার বুড়ো যুদ্ধবিমান ‘মিগ-২১ বাইসন’ নিয়ে তাদের তাড়া করেন উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান। ধারে ও ভারে অনেক শক্তিশালী একটি ‘এফ-১৬’কে গুলি করে নামাতে সক্ষমও হন তিনি।
অনেকেরই ধারণা, যুদ্ধের চেহরা শুধুমাত্র বদলাতে পারে অত্যাধুনিক হাতিয়ার। এই মতামত অস্বীকারের উপায় নেই। তবে যুদ্ধের জয়-পরাজয় নিশ্চিত করেন সৈনিক, অস্ত্র নয়। পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ইরান। গত কয়েক মাসে মার্কিন ঘাঁটিগুলির ভাল রকম ক্ষয়ক্ষতি করেছে তারা। ছাউনিগুলির পুনর্নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হবে পাঁচ লক্ষ কোটি ডলার, খবর সূত্রের।