পাক ‘বন্ধু’কে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি? ভারত-ইজ়রায়েলের ঘুম কেড়ে নিয়ে ‘রুগ্ণ মানুষের’ জোর বাড়াতে ‘ভিটামিন’ দিচ্ছেন ট্রাম্প?
নেটো সদস্য এই দেশকে এ বার এফ-৩৫ লড়াকু জেট বিক্রির ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এতে সিলমোহর দিলে বদলাবে ক্ষমতার ভারসাম্য। উদ্বেগ বাড়ছে ইজ়রায়েল এবং ভারতের।
প্রথমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। তার পর পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ শ্রেণির অধ্যাধুনিক এফ-৩৫ লড়াকু জেট সরবরাহের আশ্বাস। ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’কে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ-হেন কাজকর্মে হতবাক বিশ্ব! মোটা মুনাফার লোভে যুদ্ধবিমান বিক্রিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিলমোহর দিলে চরম বিপদে পড়তে পারে পশ্চিম এশিয়ার ইহুদি রাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকায় কপালে ভাঁজ পড়েছে ভারতেরও।
চলতি বছরের ৭ জুলাই মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটো-র (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) শীর্ষ সম্মেলেন যোগ দিতে তুরস্ক সফরে যান ট্রাম্প। আঙ্কারায় পৌঁছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্ডোয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। পরে জানা যায়, সাবেক অটোমানদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি, পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনাধীন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫ লাইটনিং টু জেটকে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুসেনার শিরদাঁড়া বলা যেতে পারে। এক ইঞ্জিন এবং এক আসন বিশিষ্ট ‘সুপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে গতিশীল) এই যুদ্ধবিমানকে চিহ্নিত করা দুষ্কর। সংঘাত পরিস্থিতিতে নিমেষে শত্রুর আকাশের দখল নেওয়া ও নিখুঁত নিশানায় হামলা চালানোয় এর জুড়ি মেলা ভার। আর তাই সংশ্লিষ্ট হাতিয়ার রফতানিতে বাড়তি সতর্কতা নিয়ে থাকে ওয়াশিংটন।
এখনও পর্যন্ত মোট ১৯টি ‘বন্ধু’ দেশকে এফ-৩৫ লাইটনিং টু বিক্রি করেছে আমেরিকা। সেই তালিকায় নাম আছে ব্রিটেন, জার্মানি, ইটালি, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিসের মতো নেটো সদস্যের। অন্য দিকে এই সামরিক জোটের অংশ হয়েও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানটি হাতে পায়নি তুরস্ক। উল্টে, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে তুরস্ককে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই রাশিয়ার থেকে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ নামের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা আমদানি করে আঙ্কারা।
নেটো সদস্য তুরস্কের এ ভাবে ‘শিবির পাল্টে’ মস্কোর হাতিয়ার আমদানিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আঙ্কারের উপরে নেমে আসে নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া। এর্ডোয়ান প্রশাসনের উপর ‘কাউন্টারিং আমেরিকাজ় অ্যাডভার্সারিজ় থ্রু স্যাংশন্স অ্যাক্ট’ বা কাটসা প্রয়োগ করে ওয়াশিংটন। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়ে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’। মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের অর্থনীতি।
আরও পড়ুন:
সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশই আমেরিকার এই পদক্ষেপকে অযৌক্তিক বলতে নারাজ। তাঁদের যুক্তি, সে ক্ষেত্রে এফ-৩৫-এর রেডার সঙ্কেত সংগ্রহ করে স্টেলথ জেটটিকে ধ্বংসের ফন্দিফিকির বার করে ফেলত মস্কোর এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ। ফলে কখনওই সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি মার্কিন প্রশাসন। তাই ২০১৯ সালে তুরস্ককে যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে সরিয়ে দেয় তারা। পরের বছরই আঙ্কারার ঘাড়ে চাপে নিষেধাজ্ঞা।
পরবর্তীকালে এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফেরার মরিয়া চেষ্টা করেন এর্ডোয়ান। যদিও তাঁর ‘আবদার’ রাখেনি মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেস। বরং ঘন ঘন তদ্বিরের জেরে কড়া শর্তের মুখে পড়ে তুরস্ক। ওয়াশিংটন জানিয়ে দেন, অবিলম্বে এস-৪০০ অপসারণ করুক আঙ্কারা। আগামী দিনেও কোনও রুশ হাতিয়ার কেনা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে তাদের। তবেই নতুন করে যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এর পরেও হাল ছাড়েননি এর্ডোয়ান। গত বছরের (২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে মার্কিন সফরে গিয়ে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। ওই দ্বিপাক্ষিক বৈঠককেই ‘বরফ গলার’ সূত্রপাত হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। যদিও আঙ্কারার সঙ্গে ওয়াশিংটনের এফ-৩৫ জেটের চুক্তি করা মোটেই সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেখানে বড় কাঁটা হতে পারে ‘বন্ধু’ ইজ়রায়েল ও নেটো-ভুক্ত গ্রিস।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্রের সম্পর্কের তীব্র অবনতি ঘটেছে। ইজ়রায়েলের প্রতিবেশী সিরিয়ায় ক্রমাগত সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে আঙ্কারা। তা ছাড়া মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে এর্ডোয়ানের সুসম্পর্কও যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখছে তেল আভিভ। এর জেরে ইতিমধ্যেই সাবেক অটোমানের এফ-৩৫ প্রাপ্তির সম্ভাবনার বিপদ নিয়ে জোর প্রচার চালাচ্ছেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
আরও পড়ুন:
এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছেন ইজ়রায়েলের প্রবাসী বিষয়ক ও ইহুদি-বিদ্বেষ দমনমন্ত্রী আমিচাই চিকলি। তাঁর কথায়, ‘‘ইরান ও সিরিয়ার পাশাপাশি বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে তুরস্ক।’’ অন্য দিকে, মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজ়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের (মুসলিম ব্রাদারহুড) দ্বারা সংক্রামিত একটি শাসনব্যবস্থা চলছে আঙ্কারায়, যাঁরা ইহুদিদের ধ্বংস চায়।’’
প্রসঙ্গত, পশ্চিম এশিয়ায় আরব রাষ্ট্র পরিবেষ্টিত ইজ়রায়েলের স্বার্থকে সব সময় গুরুত্ব দিয়েছে আমেরিকা। ইহুদিদের সমস্যা হতে পারে এমন কোনও হাতিয়ার কখনওই তাদের শত্রুদের বিক্রি করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এর জেরে যে কোনও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত শত্রুর আকাশের দখল নিতে সক্ষম হয়েছে তেল আভিভ। আকারে ছোট হওয়া সত্ত্বেও লড়াইয়ের ময়দানে নিমেষে ‘খেলা ঘোরাতে’ সমস্যা হয়নি তাদের।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহারিন বা জর্ডনের মতো দেশগুলির সঙ্গে গলায় গলায় ‘বন্ধুত্ব’ রয়েছে আমেরিকার। তা সত্ত্বেও ইজ়রায়েলের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এদের কাউকে এফ-৩৫ লড়াকু জেট বিক্রি করেনি যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিম এশিয়ার একমাত্র ওই ইহুদি রাষ্ট্রের কাছেই আছে পঞ্চম প্রজন্মের এই যুদ্ধবিমান। হাতিয়ারটিতে নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতিও পেয়েছে তারা।
সাবেক সেনাকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, তুরস্কের ব্যাপারে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে আকাশযুদ্ধের শ্রেষ্ঠত্ব হারাবে ইজ়রায়েল। ক্ষুণ্ণ হতে পারে তাদের বিমানবাহিনীর আধিপত্য। তেল আভিভকে বাদ দিলে আঙ্কারাকে এফ-৩৫ সরবরাহের ব্যাপারে গ্রিসের বেঁকে বসার আশঙ্কাও ষোলো আনা। আথেন্সের সঙ্গে দিন দিন খারাপ হচ্ছে এর্ডোয়ানের সম্পর্ক। এজ়িয়ান সাগরের জলসীমান্ত নিয়ে বিবাদ রয়েছে দু’পক্ষের।
তুর্কি বায়ুসেনার মার্কিন এফ-৩৫ পাওয়ার সঙ্গে সরাসরি ভারতের নেই কোনও সম্পর্ক। তার পরেও সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে নয়াদিল্লির উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবে কাশ্মীরের ব্যাপারে ইসলামাবাদের পাশে থেকেছে আঙ্কারা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দুই দেশের মধ্যে বেড়েছে সামরিক সহযোগিতা। বিষয়টি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্য বেশ অস্বস্তির।
গত বছর (২০২৫ সাল) ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে দিল্লির সঙ্গে চার দিনের সংক্ষিপ্ত ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান। ওই লড়াই শুরুর মুখে বিপুল পরিমাণে ড্রোন পাঠিয়ে সরাসরি ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়ায় তুরস্ক। এর মধ্যে অন্যতম হল আঙ্কারার তৈরি বের্যাক্টার টিবি-২। যদিও সেগুলিকে মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করে এ দেশের বাহিনী।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, আগামী দিনে ফের ভারত-পাক যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি হলে একই ভাবে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়াবে আঙ্কারা। তখন এফ-৩৫ লড়াকু জেটও রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের সরবরাহ করতে পারে তারা। অতীতে এই ঘটনার সাক্ষী থেকেছে নয়াদিল্লি। উদাহরণ হিসাবে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামের কথা বলা যেতে পারে।
’৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধের সময় ইসলামাবাদের বিমানবাহিনীতে ন’টি মার্কিন নির্মিত এফ-১০৪ স্টারফাইটার ধার দেয় জর্ডন। সেই সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির রিচার্ড নিক্সন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অভিযোগ, এ ব্যাপারে মৌন সম্মতি ছিল তাঁর। তার পরেও অবশ্য নিজেদের পরাজয় আটকাতে পারেননি তৎকালীন পাক সামরিক শাসক তথা প্রেসিডেন্ট ইয়া হিয়া খান।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, তুরস্ককে এফ-৩৫ বিক্রির সিদ্ধান্ত একক ভাবে নিতে পারবেন না ট্রাম্প। এ ব্যাপারে পার্লামেন্ট তথা কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হবে তাঁকে। তাঁর পাঠানো প্রস্তাব বাতিলের ক্ষমতা আছে ওয়াশিংটনের আইনসভার। আগামী নভেম্বরে আমেরিকায় হবে মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচন। সেখানে প্রেসিডেন্টের দল রিপাবলিকান পার্টির ফল ভাল না হলে সব কিছু হাতছাড়া হতে পারে এর্ডোয়ানের।
তুরস্ক থেকে ফিরে এফ-৩৫ নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘আঙ্কারার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ ভাল। ওরা অনেকের থেকে আমেরিকার বেশি অনুগত। তাই যুদ্ধবিমানের বিষয়টি অবশ্যই চিন্তাভাবনা করে দেখতে হবে। ওটা একটা চমৎকার জেট, নিঃসন্দেহে সেরা বিমান।’’