প্রাণের তোয়াক্কা না করে সমুদ্রে ‘ঝাঁপ’! যুদ্ধের মাঝে কেন বিমানবাহী রণতরী ছেড়ে পালাতে চাইছে মার্কিন সেনা?
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ফের অস্বস্তিতে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে পালাতে চাইছেন মার্কিন নৌসৈনিকদের একাংশ। কিন্তু কেন?
মাঝসমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার। তার পরেও বন্দরে ফেরার অনুমতি না মেলায় বিমানবাহী রণতরীতে দানা বেঁধেছে ‘বিদ্রোহ’! সূত্রের খবর, যুদ্ধের মধ্যেই জাহাজ ছেড়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন বেশ কয়েক জন নৌসৈনিক। ক্যাপ্টেনের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত সেটা ঠেকানো গেলেও পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক। তবে যথারীতি যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের রণক্ষেত্রে পাঠানো ‘সুপার পাওয়ার’ দেশটির প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন নৌসেনার গর্বের ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। সম্প্রতি, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই বিমানবাহী রণতরীকে নিয়ে একটি বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ করে ‘নেভি টাইমস’ এবং ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপ্স’ নামের আমেরিকার দু’টি গণমাধ্যম। তাদের দাবি, ২৫০-র বেশি দিন ধরে সমুদ্রে মোতায়েন থাকায় যুদ্ধজাহাজটির সৈনিকদের মনে দানা বেঁধেছে ক্ষোভ। অবিলম্বে বাড়ি ফিরতে চাইছেন তাঁরা।
কিন্তু, সমস্যা হল পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে কিছুতেই বন্দরে ফেরার অনুমতি দিচ্ছে না মার্কিন প্রশাসন। আর তাই রণতরী ছাড়তে একরকম মরিয়া হয়ে ওঠেন সেখানকার সৈনিকদের একাংশ। তাঁদেরই কয়েক জন সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন ক্যাপ্টেন। গোটা বিষয়টা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন তিনি।
অন্য দিকে, লিঙ্কন কাণ্ডের আঁচ গিয়ে পড়েছে আমেরিকার ঘরোয়া রাজনীতিতেও। ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে রণতরীতে মোতায়েন থাকা সৈনিকদের ঘরে ফেরানোর ব্যাপার দরবার শুরু করেছেন তাঁদের আত্মীয়েরা। পরিবারের সদস্যদের দাবি, নাবিকদের মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কাউকে আবার গ্রাস করেছে মৃত্যুচিন্তা।
১৯৮৯ সালে মার্কিন নৌসেনায় কর্মজীবন শুরু করে পরমাণু শক্তিচালিত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। সংশ্লিষ্ট রণতরীতে মোতায়েন আছেন পাঁচ হাজারের বেশি নৌসৈনিক। গোড়ার দিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতে দাপিয়ে বেড়াত এই যুদ্ধজাহাজ। পরবর্তীকালে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও তাকে পাঠায় আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
আরও পড়ুন:
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ‘আল জ়াজ়িরা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ২১ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়াগো নৌসেনা ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। বিমানবাহী রণতরীটির লোহিত সাগরের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল যৌথ সামরিক অভিযানে নামায় রাতারাতি বদলে যায় যুদ্ধজাহাজটির যাত্রাপথ।
ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরতে ইউএসএস লিঙ্কনকে ওমান সাগরের দিকে পাঠায় পেন্টাগন। সূত্রের খবর, দীর্ঘ এই যাত্রাপথে মাত্র দু’দিন বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছেন সেখানে মোতায়েন নৌসৈনিকরা। গত বছরের (২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে প্রথম বার গুয়ামে থামে ওই বিমানবাহী রণতরী। দ্বিতীয় বার, এ বছরের জুলাইতে ওমানের বন্দরে ২৪ ঘণ্টার জন্য ভিড়তে দেখা গিয়েছে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধজাহাজকে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এ বছরের মে মাসে ইউএসএস লিঙ্কনের ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, সেই মেয়াদ বৃদ্ধি করে পেন্টাগন। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপ্স’ জানিয়েছে, অগস্টের প্রথম সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত মার্কিন নৌসচিব হাং কাওয়ের সঙ্গে দেখা করেন সেখানে মোতায়েন অন্তত ২০০ জন সৈনিকের পরিবার। সেখানেই রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁরা।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর দাবি, সান দিয়েগোর টাউন হলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মার্কিন নৌসেনা। সেখানেই হাং কাওকে একরকম ঘিরে ধরেন লিঙ্কনে মোতায়েন সৈনিকদের আত্মীয়েরা। যুক্তরাষ্ট্রের পদস্থ কর্তারা তাঁদের বোঝানোর কম চেষ্টা করেননি। তবে তাতে চিঁড়ে ভেজেনি। উল্টে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তোলেন পরিবারের সদস্যদের একাংশ।
আরও পড়ুন:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন নৌবাহিনীর দুই পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, গত ৩ অগস্ট লিঙ্কন থেকে একজন সৈনিক সমুদ্রে পড়ে যান। দ্রুত কপ্টার পাঠিয়ে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এর পর চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে তাঁকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেন ক্যাপ্টেন। এটি নিছক দুর্ঘটনা, না কি আত্মহত্যার চেষ্টা, তা নিয়ে চলছে তদন্ত। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে পড়ে গিয়েছে হইচই।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথকে চিঠি দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘প্রয়োজনীয় সরবরাহের অভাবে ভুগছে লিঙ্কন। সৈনিকদের দূষিত জল পান করতে হচ্ছে। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। ডাক ব্যবস্থা ঠিক নেই। তাই কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এখনই পদক্ষেপ না করলে ফল হিতে বিপরীত হতে পারে।’’
প্রায় একই সুর শোনা গিয়েছে সাবেক নৌসেনা অফিসার তথা সেনেটর মার্ক কেলির গলায়। বিমানবাহী রণতরী থেকে সমুদ্রে ‘ঝাঁপ দেওয়া’র ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। অন্য দিকে, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের ভিতরের ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের নেতা তথা মার্কিন পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এর সদস্য মাইক লেভিন। ফলে পেন্টাগনের উপর চাপ বাড়ছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
লেভিন জানিয়েছেন, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের সৈনিকদের ছত্রাকযুক্ত শাওয়ারে স্নান করতে হচ্ছে। শৌচাগারের একাংশ ভেঙে পড়েছে। মাসের পর মাস আকাচা কাপড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন আমাদের সেনা অফিসার ও নাবিকেরা। যুদ্ধজাহাজটিতে নেই কোনও গরম জলের ব্যবস্থা। খাবার বলতে আধ কাপ ভাত পাচ্ছেন তাঁরা। সাবান, সুগন্ধি বা টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও ফুরিয়ে গিয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, লেভিনের দাবি সত্যি হলে লিঙ্কনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠা একেবারেই অযৌক্তিক নয়। কারণ, বিমানবাহী রণতরীতে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা মোটেই সহজ নয়। এতে নৌসৈনিকদের স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব পড়ে। উত্তাল সমুদ্রে ঘুম ঠিকমতো না হওয়ায় শরীর ভেঙে যায়। কেউ কেউ আক্রান্ত হন ‘মাল ডি ডেবার্কমেন্ট সিনড্রোম’ নামের জটিল রোগে।
গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে এ ব্যাপারে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে ওয়াশিংটনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজি’। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনার ইতিহাসে লিঙ্কনের মতো এতটা দীর্ঘ সময় আর কোনও যুদ্ধজাহাজ সমুদ্রে কাটায়নি। ফলে রণতরীটিতে মোতায়েন থাকা সৈনিকদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা মানসিক বিকার দেখতে পাওয়া একেবারেই আশ্চর্যের নয়।
যদিও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলিকে ‘ভুয়ো খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘প্রতিটা যুদ্ধজাহাজ, সেখানকার ক্যাপ্টেন এবং নৌসৈনিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, রসদ, পানীয় জল, হাতিয়ার ও গোলা-বারুদের সরবরাহ ঠিক রাখার সুনির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি রয়েছে। এটা পেন্টাগন সব সময় নিশ্চিত করে আসছে। লিঙ্কনের ক্ষেত্রে তার কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি।’’
পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে অভিন্ন বিবৃতি দিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। তাদের দাবি, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে মোতায়েন থাকা কোনও নৌসৈনিক আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, স্পষ্ট ভাবে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে নাবিকদের চিকিৎসা, ধর্মীয় এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার সব রকম চেষ্টা করা হচ্ছে।’’
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘বিমানবাহী রণতরী লিঙ্কন মোটেই দীর্ঘ দিন মাঝসমুদ্রে মোতায়েন নেই। সেখানকার নৌসৈনিকদের পরিবারের কেউই চিন্তিত নন। যুদ্ধজাহাজটিকে খুব শীঘ্রই স্থানান্তরিত করা হবে। তার জায়গায় অন্য একটি রণতরী পাঠানোর তোড়জোড় চলছে।’’
চলতি বছরের মার্চে লোহিত সাগর সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধপোত ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাতে আহত হন দু’জন নৌসৈনিক। এর পর তড়িঘড়ি সেটিকে ইটালির বন্দরে সরিয়ে নিয়ে যায় পেন্টাগন। সরকারি ভাবে জানানো হয় যে দুর্ঘটনাবশত জাহাজটির লন্ড্রি রুমে আগুন লেগেছিল। ইঞ্জিনের কোনও ক্ষতি হয়নি।
যদিও ওয়াশিংটনের এই ব্যাখ্যা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ এতে অন্তর্ঘাতের গন্ধও খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের দাবি, ফোর্ডের শৌচালয়ে কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। ফলে নাবিকেরা সেটি ব্যবহার করতে পারছিলেন না। যদিও এই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছে আমেরিকা। সেই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই আরও এক যুদ্ধপোতকে নিয়ে ওয়াশিংটন যে বেজায় অস্বস্তিতে, তা বলাই বাহুল্য।