সুড়ঙ্গ দ্বীপের দুর্ভেদ্য ইরানি দুর্গে বোমাবর্ষণ, হরমুজ় পেতে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর ওড়াবে আমেরিকা?
লাগাতার বোমাবর্ষণে ইরানের বিশেষ এক দ্বীপের সামরিক পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন বিমানবাহিনী। কেন ওই এলাকা কব্জা করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র?
হরমুজ় প্রণালী দখলের জন্য মরিয়া মার্কিন ফৌজ। সেই লক্ষ্যে এগোতে গিয়ে বার বার কড়া প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। ফলে রণকৌশল বদলে এ বার ইরানের কাশেম দ্বীপকে পাখির চোখ করেছে তারা। আর তাই পারস্য উপসাগরের শিয়া মুলুকটির দক্ষিণ অংশে লাগাতার বোমাবর্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র হানার মুখেও পড়তে হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
কৌশলগত অবস্থানের কারণে ইরানি কাশেম দ্বীপের গুরুত্ব অপরিসীম। শিয়া মুলুকের দক্ষিণাংশের অন্যতম বন্দর শহর বন্দর আব্বাসের থেকে এর দূরত্ব মেরেকেটে ২২ কিলোমিটার। প্রায় ১,৫০০ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটির গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে হরমুজ় এবং খুরান প্রণালী। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, সেখানেই আছে তেহরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর।
মার্কিন সংবাদসংস্থাগুলির দাবি, বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলিতে নিখুঁত হামলা চালাতে কাশেম দ্বীপের যথেষ্ট ব্যবহার করছে ইরান। ওই এলাকার ভূ-প্রাকৃতিক গঠন বেশ জটিল। দ্বীপের কিছু অংশ ঘন জঙ্গলে ভরা। আছে এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে ভূমি এবং গুহা। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের অনুমান, অসংখ্য ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে সেখানে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করেছে আইআরজিসি।
হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ রাখতে পণ্যবাহী জাহাজে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে ইরানি রক্ষীবাহিনী। মার্কিন গুপ্তচরদের দাবি, সেই আক্রমণও পরিচালিত হচ্ছে কাশেমের গুপ্ত ঘাঁটি থেকেই। ভূপ্রাকৃতিক সুবিধার সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দ্বীপে ছোট-বড় অধিকাংশ রণতরী লুকিয়ে রাখছে আইআরজিসি। এর মধ্যে অধিকাংশই দ্রুত গতির স্পিডবোট। আর তাই জ্বালানি জাহাজে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না তাদের।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের ড্রোনের বহরও নেহাত ছোট নয়। শত চেষ্টা করেও সেগুলিকে ঠেকাতে পারছে না মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। উল্টে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক কোটি মূল্যের রেডার ও প্যাট্রিয়টের মতো ক্ষেপণাস্ত্র বর্মকে উড়িয়েছে তেহরানের ওই পাইলটবিহীন যান। পাশাপাশি, মাঝ-আকাশের ডগ ফাইটে আমেরিকার গর্বের একাধিক লড়াকু জেট ধ্বংস করতে দেখা গিয়েছে তাদের।
আরও পড়ুন:
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, কাশেমের গুপ্ত ঘাঁটি থেকেই ওই ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরান। সেখানকার ভূগর্ভস্থ শহরে আছে পাইলটবিহীন যান তৈরির বিশাল কারখানা। এ ছাড়া সুড়ঙ্গপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপটির যোগাযোগের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। ফলে সম্পূর্ণ এলাকাটি কব্জা করা যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একেবারেই সহজ হবে না, তা বলাই বাহুল্য।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাশেম কব্জার লক্ষ্যে সেখানকার সামরিক পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে দ্বীপটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের গুপ্তঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে সেখানে ১৪ হাজার কেজির জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডিন্যান্স পেনিট্রেটর তথা বাঙ্কার বাস্টার বোমা ফেলতে পারে তারা।
এ বছরের মার্চে ইরানের খার্গ দ্বীপে গ্রাউন্ড অপারেশনের ইঙ্গিত দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের জ্বালানি অর্থনীতির সঙ্গে ওই এলাকাটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কারণ, সেখান দিয়েই ৯০-৯৪ শতাংশ খনিজ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করে পারস্য উপসাগরের ওই শিয়া মুলুক। খার্গ প্রকৃতপক্ষে একটা প্রবালদ্বীপ, যা ইরানের বুশেহর প্রদেশের অংশ। সেখান থেকে মূল ভূখণ্ডের দূরত্ব প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার।
এ-হেন খার্গের দক্ষিণ অংশে রয়েছে পারস্য উপসাগর, যা হরমুজ় প্রণালী হয়ে ওমান সাগরে গিয়ে মিশেছে। ইরানের বুশেহর সমুদ্রবন্দরের প্রায় ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ওই প্রবালদ্বীপ। বিশ্ববাজারে তেল বিক্রির জন্য সেখানে আছে তেহরানের অন্যতম বড় ‘অয়েল টার্মিনাল’, যা ছুঁয়ে অন্যান্য দেশে চলে যায় তাদের অপরিশোধিত তেল। আর তাই খার্গের পতন হলে উপসাগরীয় শিয়া মুলুকটির অর্থনীতি যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের দাবি, খার্গ দখলের নেপথ্যে ট্রাম্পের একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানি তেলের দখল নিতে চাইছেন তিনি। তবে সে দিকে তাঁর নজর পড়া কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। কারণ, সাবেক পারস্যের মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ হাইড্রোকার্বনের ভান্ডার। অপরিশোধিত খনিজ তেলের ক্ষেত্রে এর আনুমানিক পরিমাণ ২০ হাজার ৮৬০ কোটি ব্যারেল বলে জানা গিয়েছে। এককথায় বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তরল সোনার মজুত আছে তেহরানের হাতে।
একটা উদাহরণের সাহায্যে গোটা বিষয়টার একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, খনিজ তেলের রফতানি বন্ধ রাখলে ২৯০ বছর পর্যন্ত জ্বালানি সমস্যা হবে না ইরানের। কারণ, বিশ্ব জুড়ে মজুত থাকা তরল সোনার ১২ শতাংশের অধিকারী তেহরান। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে খোলা বাজারে সে ভাবে এই সম্পদ বিক্রি করতে পারে না তারা। বর্তমানে সাবেক পারস্যের তেলের সবচেয়ে বড় খদ্দের হল চিন।
বর্তমানে দিনে প্রায় ৩০-৪৫ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে ইরান, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তরল সোনার সরবরাহের মাত্র ৪-৫ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে প্রথম বার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়ে তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ছিলেন বিল ক্লিন্টন। ক্ষমতা হাতে পেয়ে ২০১৮ সালে এই নিষেধাজ্ঞাকে আরও কঠোর করেন ট্রাম্প। তত দিনে অবশ্য গোপনে পরমাণু হাতিয়ার তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সেঁটে গিয়েছে সাবেক পারস্যের গায়ে।
ইরান অবশ্য কোনও দিনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সে ভাবে পরোয়া করেনি। তেল বিক্রি করতে চুটিয়ে ‘ছদ্ম জাহাজ’ (পড়ুন শ্যাডো ফ্লিট) ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে তাদের। অর্থাৎ, অন্য দেশের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারে তরল সোনা বেজিং বা হংকঙের বন্দরে পাঠায় তারা। এই ধরনের জাহাজের বহরকেই বলা হয় ‘শ্যাডো ফ্লিট’। গত ৩০ বছর ধরে এর অবাধ যাতায়াত আটকাতে আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছে বলা যেতে পারে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে দিনে ১১-১৫ লক্ষ ব্যারেল তরল সোনা বিদেশের বাজারে বিক্রি করেছে তেহরান। এর সিংহভাগই গিয়েছে (পড়ুন ৮০-৯০ শতাংশ) বেজিঙে। যদিও ‘শ্যাডো ফ্লিটে’ তেল কেনায় আপত্তি ছিল দিল্লির। ফলে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে ২০১৯ সালের পর পারস্য থেকে তরল সোনা আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় নয়াদিল্লি।
১৯৭৯ সালে ইসলামীয় বিপ্লবের এক বছরের মাথায় ইরান আক্রমণ করে বসেন ইরাকের কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। পরবর্তী আট বছর চলেছিল সেই যুদ্ধ। ওই লড়াইয়ে একাধিক এলাকায় হামলা চালালেও কখনও খার্গকে নিশানা করেনি বাগদাদ। ফলে দিব্যি তেল বিক্রি করে সংঘর্ষের খরচ উঠিয়ে নেয় তেহরান। এর জেরে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় ইরাকি ফৌজ।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, ইরাক-ইরান যুদ্ধের উপর ভাল রকম নজর রেখেছিলেন ট্রাম্প। খার্গ যে তেহরানের ‘জিয়নকাঠি’, তা বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয়নি তাঁর। ১৯৮৮ সালে একটি সাক্ষাৎকারে সংশ্লিষ্ট প্রবালদ্বীপটিকে উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে। ওই সময় প্রেসিডেন্ট হওয়ার ধারেকাছেও ছিলেন না তিনি।
১৯৮৮-তে গণমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমাদের উপর ইরান যদি একটাও গুলি চালায়, তা হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। আমরা ওদের খার্গ দ্বীপটাকেই ধ্বংস করে দেব। তখন আর তেল বিক্রি করতে পারবে না তেহরান।’’ ৩৮ বছর পর সেই স্বপ্নপূরণে মার্কিন বাহিনীকে গ্রাউন্ড অপারেশনের নির্দেশ তিনি দিতে চলেছেন বলে মনে করা হচ্ছিল।
এ বছরের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের থেকেই খার্গ দ্বীপের প্রসঙ্গ তোলেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘হয়তো আমরা ওই প্রবালদ্বীপটা নিয়ে নেব। হয়তো নেব না। আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। তার মানে আমাদের সেখানে (খার্গ) গিয়ে কিছু সময়ের জন্য থাকতেও হবে। আমেরিকায় বসে কিছু বোকা লোকজন প্রশ্ন তুলছেন, কেন আমি এটা করছি! ওরা বোকা লোক।’’
গত মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে বেশ কয়েক বার খার্গে বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বিমানবাহিনী। ট্রাম্প পরে জানিয়ে দেন, সেখানকার সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছে। কোনও প্রাকৃতিক তৈলভান্ডারকে নিশানা করেনি যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ। কিন্তু, তার পরেই প্রবালদ্বীপ দখলের লক্ষ্য থেকে সরে আসেন তিনি।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, খার্গ বা কাশেমের মতো দ্বীপ কব্জা করতে হলে উভচর সামরিক অভিযানে নামতে হবে আমেরিকাকে। ইতিমধ্যেই ইরানি প্রত্যাঘাতে মার্কিন সেনার বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। ফলে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ হামলার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তাঁর সরকার নিতে পারবে কি না, সেটাই এখন দেখার।