মানচিত্রে নেই, যায় না বিমান, কিন্তু মদের খ্যাতি বিশ্বজোড়া! জাতীয় পতাকা, সেনা, সংসদ সবই আছে, নেই শুধু দেশটাই!
এমন একটি দেশ যার কার্যত কোনও অস্তিত্ব নেই। অথচ এর নিজস্ব সীমানা, সেনাবাহিনী, সরকার, জাতীয় পতাকা এবং এমনকি মুদ্রাও রয়েছে। তবু দেশটির অস্তিত্ব নেই। কী ভাবে ইওরোপের সবচেয়ে রহস্যময় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হল ট্রান্সনিস্ট্রিয়া?
টম হ্যাঙ্কসের ‘দ্য টার্মিনাল’ সিনেমাটির কথা মনে আছে, যেখানে তাঁর চরিত্রটি একটি বিমানবন্দরে আটকা পড়ে যায়? কারণ, হঠাৎ করেই ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে যায় তাঁর নিজের দেশ! সিনেমার গল্পটি পুরোপুরি কাল্পনিক হলেও পূর্ব ইওরোপে এমন একটি জায়গা রয়েছে, যেখানে বাস্তবেই এমনটা হতে দেখা যায়।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়া। সরকারি ভাবে প্রিডনেস্ট্রোভিয়ান মলডেভিয়ান রিপাবলিক বা পিএমআর নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি মলডোভা এবং ইউক্রেনের ঠিক মাঝে অবস্থিত। ১৯৯০ সালে মলডোভা থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও, মজার ব্যাপার হল বিশ্বের প্রায় কেউই এটিকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
দেশটির নিজস্ব জাতীয় পতাকা, সংসদ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মুদ্রা, এমনকি ডাকটিকিটও রয়েছে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও একে সোভিয়েত আমলের একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে গণ্য করেন অনেকে। সময় এগিয়ে গেলেও যেন কোনও ভাবে এগোয়নি সেই ‘দেশ’।
একসময় শুধুই ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে মুখে ফিরত ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার নাম। কিন্তু, বর্তমানে সমাজমাধ্যমের সুবাদে ইনস্টাগ্রামে রিল্স এবং ইউটিউবে ভ্রমণ সংক্রান্ত ভ্লগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে ‘দেশ’টি।
সে ‘দেশে’ সোভিয়েত-শৈলীর স্থাপত্য, লেনিনের মূর্তি এবং রহস্যময় ভাবে সংরক্ষিত প্রচারমূলক দেয়ালচিত্র এবং বাঙ্কারগুলি দেখে মনে হবে যেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এক জীবন্ত জাদুঘরে প্রবেশ করেছেন। এমন একটি জায়গা যা ঘুরে দেখার আকর্ষণ এড়াতে পারেন না অনেকেই। কিন্তু, তার সরকারি ভাবে কোনও অস্তিত্বই নেই। এমনকি খুঁজে পাওয়া যায় না মানচিত্রেও।
আরও পড়ুন:
শুধু অনলাইনে কৌতূহলই নয়। সাম্প্রতিক অতীতে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় পর্যটকদের আগমনও দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২০ সালের একটি হিসেব বলছে, বছরে প্রায় ২০,০০০ পর্যটক সেখানে বেড়াতে যান। তাঁদের বেশির ভাগই মলডোভা থেকে যান। এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে অঞ্চলটি রুশ এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তাঁদের ভ্রমণ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। বোঝাই যায়, এই নতুন খ্যাতিকে সাদরে গ্রহণ করছে তারা।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় প্রবেশ করা ঠিক যেন ‘টাইম ট্রাভেল’-এর মতো। যেহেতু এই দেশের কোনও সরকারি অস্তিত্ব নেই, তাই এখানে কোনও সরাসরি বিমান আসে না। মলডোভার রাজধানী কিশিনাউ থেকে মার্শরুটকা, অর্থাৎ মিনিবাসে তিরাসপোল বা বেন্ডারে পৌঁছোতে হবে, যা ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় প্রবেশের প্রধান পথ।
কোনও সরকারি ভিসা না থাকায় পর্যটকেরা চেকপয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করতে পারেন এই দেশে। সেখানে কর্মকর্তারা পাসপোর্ট পরীক্ষা করে বিশেষ প্রবেশপত্র প্রদান করেন।
পর্যটকেরা এই দেশকে সোভিয়েত স্মৃতিবিজড়িত এবং ছোট শহরের শান্ত পরিবেশের এক অদ্ভুত মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেন। রাজধানী শহর তিরাসপোলের রাস্তাগুলি রুশ সেনা এবং বিপ্লবীদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। সেখানে লেনিনের একটি সুউচ্চ মূর্তি, নিহত সোভিয়েত সৈন্যদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলিতে এখনও কাস্তে-হাতুড়ি প্রতীক দেখতে পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:
ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার ইতিহাস সংক্ষিপ্ত এবং বিতর্কিত। এই নামটির মাধ্যমে প্রথম দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৃষ্ট একটি অঞ্চলকে বোঝানো হত। তার মধ্যে দক্ষিণ ইউক্রেন এবং তৎকালীন রাজধানী ওডেসাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানের ট্রান্সনিস্ট্রিয়া নামে পরিচিত অনেক ছোট জাতিগত ভাবে রুশ অধ্যুষিত এই অঞ্চল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯২ সালে রোমানিয়ান মলডোভার সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী চার মাসব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
যদিও মলডোভা এখনও এই অঞ্চলের উপর নিজেদের দাবি বজায় রেখেছে। এই রুশভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষের কাছে মলডোভার পাসপোর্ট রয়েছে। ২০০৬ সালের একটি ভোটে এখানকার ৯৭ শতাংশ মানুষ রাশিয়ার সঙ্গে মুক্ত সহযোগিতার শর্তে স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেওয়ায় তাঁদের প্রকৃত আনুগত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কলঙ্কিত ইতিহাস, অতীতে কেজিবির সরকারি উপস্থিতির জোরালো অভিযোগ এবং জমজমাট অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা— সব মিলিয়ে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার গর্ব করার মতো তেমন কিছু ছিল না। একটি অত্যাধুনিক পেশাদার ফুটবল স্টেডিয়াম ছাড়া, সে দেশের মানুষের গর্ব করার মতো আর একটিই জিনিস আছে, আর তা হল তাঁদের ব্র্যান্ডি।
এই উৎকৃষ্ট স্পিরিটের গুণমান শুরু হয় আঙুর থেকে। কৃষ্ণসাগর এবং দিনিস্টার নদীর (যার থেকে এর নামকরণ হয়েছে) সান্নিধ্যের কারণে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া এ ক্ষেত্রে সুবিধা পায়। নাতিশীতোষ্ণ মহাদেশীয় জলবায়ু এবং উর্বর মাটির সমন্বয়ে এই অঞ্চলটি বহু জাতের আঙুর চাষের জন্য আদর্শ। মদ প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘কেভিন্ট’ তাদের পণ্যে বিয়াঙ্কা ও ক্যাবারনেট সভিনঁ-সহ ২০টিরও বেশি দেশীয় এবং ইউরোপীয় স্বাদের বৈচিত্র যুক্ত করেছিল।
সময়ের সঙ্গে থমকে যাওয়া এই ‘দেশের’ মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের মাঝেও রয়েছে প্রাণ আর রঙের ছোঁয়া। এখানকার ক্যাফেগুলিতে বাজে রুশ পপ গান, ধূসর অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের বাইরে শিশুরা ফুটবল খেলে এবং স্থানীয় বাজারগুলিতে বিক্রি হয় ঘরে তৈরি ওয়াইন এবং স্মোক্ড চিজ়।
দর্শনার্থীরা প্রায়শই ট্রান্সনিস্ট্রিয়াকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ অস্বীকৃত দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। রেডিটে ভাইরাল হওয়া একটি থ্রেডে এক বার পর্যটকেরা বলেছিলেন, “এটি নিরাপদ, স্থানীয়েরা গর্বিত, জায়গাটি সস্তা, অতিথিপরায়ণ এবং পর্যটকদের এই আকস্মিক আগ্রহে তাঁরা অদ্ভুত ভাবে আমোদিত।” কিন্তু, অনলাইনে ‘দেশ’টির নাম খুঁজলে রাজনৈতিক কারণ এবং এক জটিল অতীতের জন্য ভিন্ন কথা বলবে নেটমাধ্যম।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়াকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যখন মলডোভা স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ রোমান এবং ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার রুশভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। এর ফলস্বরূপ ১৯৯২ সালে একটি চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর অঞ্চলটি কার্যত স্বশাসনের অধীনে আসে, যা রুশ সৈন্যদের দ্বারা সমর্থিত ছিল। সেই সৈন্যরা আজও সেখানে রয়েছেন।
সেই সময় থেকে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া নিজের প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক নিয়ে স্বাধীন ভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। যদিও বিশ্ব এখনও এটিকে মলডোভার অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়। এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হল আবখাজ়িয়া এবং দক্ষিণ ওসেটিয়া, আরও দু’টি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল যাদের অবস্থাও একই রকম অনিশ্চিত।
ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার অমীমাংসিত অবস্থা একে ইউরোপের অন্যতম স্থবির সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করছে। তবে আপাতদৃষ্টিতে একে স্থিতিশীল এবং শান্তিপূর্ণ বলেই মনে হয়। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও এখানে পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধুনিক ক্যাফে এবং সেখানকার বিভিন্ন স্বাদু খাবার।
অঞ্চলটির আয়তন প্রায় ৪,১৬৩ বর্গ কিলোমিটার এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৪,৭৫,০০০। এখানে মলডোভান, ইউক্রেনীয় এবং রুশরা বসবাস করেন। এখানকার অনেক বাসিন্দার একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে। এর তিনটি সরকারি ভাষা, রুশ, রোমান এবং ইউক্রেনীয়— দেশটির জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিই প্রতিফলিত করে।
তা হলে এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার নেপথ্যের কারণ কী? অনেকের কাছে এটি এমন একটি জায়গা যা প্রায় দুর্গম বলে মনে হয়। আবার অন্যদের কাছে রাজধানী শহর তিরাসপোলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার স্বপ্নবাস্তব অভিজ্ঞতা, যেখানে লেনিনের মূর্তি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং রুবল নোটে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতীকচিহ্ন শোভা পায়।
সমাজমাধ্যম প্রভাবী এবং ট্র্যাভেল ভ্লগারেরা প্রায়শই এই দেশকে ‘ইওরোপের শেষ সোভিয়েত রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এই বর্ণনা ট্রান্সনিস্ট্রিয়াকে একই সঙ্গে রহস্যময় এবং অনবদ্য করে তোলে। এর পর আসে সাশ্রয়ের বিষয়টি। খাবার, বাসস্থান এবং পরিবহণ বেশির ভাগ ইওরোপীয় পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় অনেক সস্তা। কম বাজেটে রোমাঞ্চের সন্ধানে থাকা পর্যটকদের জন্য ট্রান্সনিস্ট্রিয়া রহস্য, ইতিহাস ইত্যাদি সব দিক থেকেই উপযুক্ত। এ সব কারণেই রাষ্ট্রপুঞ্জে স্বীকৃতি না পাওয়া সত্ত্বেও ট্রান্সনিস্ট্রিয়া তার নিজস্ব পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে।