ইলন মাস্কের রকেটে চড়ে মহাকাশে ‘কৃত্রিম মেধার পরীক্ষাগার’ পাঠাচ্ছে ভারত! কী কাজ করবে আশ্চর্য উপগ্রহটি?
‘ট্রান্সপোর্টার-১৮’ রাইডশেয়ার মিশনের অংশ হিসেবে ১ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার স্পেসএক্স-এর ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটে এই উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। হায়দরাবাদের সংস্থাটি এটিকে ভারতের প্রথম অরবিটাল কম্পিউটিং স্যাটেলাইট হিসেবে অভিহিত করছে।
ইলন মাস্কের মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেটে করে মহাকাশে ‘এআই ল্যাব’ পাঠাচ্ছে ভারত! কিন্তু সেটি আসলে কী, তা নিয়ে মানুষের মনে কৌতূহলের অন্ত নেই।
কল্পনা করা যাক এমন একটি উপগ্রহের কথা যা পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করে হাজার হাজার ছবি তুলছে, কিন্তু সেই সব তথ্য পৃথিবীতে কোনও কম্পিউটারে পাঠানোর পরিবর্তে সেটি থামছে, বিশ্লেষণ করছে এবং কেবল প্রয়োজনীয় তথ্যটুকুই পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে।
হায়দরাবাদের স্টার্টআপ সংস্থা ‘টেকমিটুস্পেস’ যে ‘অরবিটাল কম্পিউটিং স্যাটেলাইট’ বা কক্ষপথে কম্পিউটিং-ক্ষমতাসম্পন্ন ‘এমওআই-১এ’ উপগ্রহ তৈরি করছে, তার মূল ধারণাটি ঠিক এমনই।
‘ট্রান্সপোর্টার-১৮’ রাইডশেয়ার মিশনের অংশ হিসেবে ১ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার স্পেসএক্স-এর ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটে এই উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। হায়দরাবাদের সংস্থাটি এটিকে ভারতের প্রথম অরবিটাল কম্পিউটিং স্যাটেলাইট হিসেবে অভিহিত করছে।
তা হলে, মহাকাশে ‘এআই ল্যাব’ বা কৃত্রিম মেধা পরীক্ষাগার বলতে আসলে কী বোঝায়? কৃষিজমি এবং বনাঞ্চলের ছবি তোলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিকাঠামো এবং জাহাজের উপর নজরদারি— বর্তমানে উপগ্রহগুলি বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
আরও পড়ুন:
প্রথাগত পদ্ধতিতে সেই তথ্যের বড় একটি অংশ পৃথিবীতে পাঠাতে হয় এবং সেখানে কম্পিউটার দিয়ে তা বিশ্লেষণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগে এবং প্রচুর ব্যান্ডউইথ বা ডেটা আদান-প্রদানের ক্ষমতার প্রয়োজন হয়।
‘টেকমিটুস্পেস’ সেই কম্পিউটিং প্রক্রিয়ার একটি অংশকে কক্ষপথে বা মহাকাশে পৌঁছে দিতে চাইছে। সহজ কথায়, ফোনের সব ছবি কোনও দূরের কম্পিউটারে পাঠানো, আর ফোনের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলি আগে শনাক্ত করতে বলার মধ্যে যা পার্থক্য, এ ক্ষেত্রে সেটাই করা হচ্ছে।
যে উপগ্রহ বা ‘এআই ল্যাব’টিকে মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে, তার নাম এমওআই-১এ। উপগ্রহ হলেও এমওআই-১এ মূলত মহাকাশে অবস্থিত একটি ছোট কম্পিউটারের মতো কাজ করবে। উপগ্রহটির ওজন ৫০ কেজিরও কম।
এই উপগ্রহটিতে এনভিডিয়া অরিন এনএক্স এজ-কম্পিউটিং প্রসেসর রয়েছে, যা এটিকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় এআই মডেল চালানোর উপযোগী করে তোলে। একটি উপগ্রহের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে কক্ষপথে থেকেই পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণের সময় তোলা ছবিগুলি স্ক্যান করা এবং কেবল প্রয়োজনীয় তথ্যটুকু পৃথিবীতে পাঠানো।
আরও পড়ুন:
উদাহরণস্বরূপ, একটি এআই মডেলকে নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় বিশেষ কোনও পরিবর্তন খোঁজার জন্য। এর ফলে সব ছবি পৃথিবীতে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না। এআই বিশ্লেষণের পর কেবল দরকারি ছবিগুলিই পৃথিবীতে আসবে।
‘টেকমিটুস্পেস’ জানিয়েছে, তাদের কৃষি, খনি, সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেন) এবং বিমার মতো বিভিন্ন খাতে তাদের ইতিমধ্যেই ২৩ জন গ্রাহক রয়েছেন। সেই গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট ডেটা বিশ্লেষণের জন্য তাঁদের নিজস্ব এআই মডেলও আপলোড করতে পারবেন উপগ্রহটিতে।
যদিও এআইল্যাব নিয়ে ‘টেকমিটুস্পেস’-এর এটি প্রথম প্রচেষ্টা নয়। এর আগের কক্ষপথে কম্পিউটিং পরীক্ষা করার জন্য এমওআই-টিডি প্রযুক্তি মহাকাশে পাঠিয়েছিল সংস্থাটি।
সংস্থার নিজস্ব প্রযুক্তিগত নথিতে বলা হয়েছে, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০টিরও বেশি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল মহাকাশে। যদিও এর দু’টি প্রধান উদ্দেশ্য— ইমেজিং এবং এআই ইনফারেন্স অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সফট্ওয়্যার পাইপলাইন সংক্রান্ত সমস্যার কারণে এআই পরীক্ষাটি বন্ধ হয়ে যায়, যা হার্ডওয়্যারটিকে সক্রিয় হতে বাধা দিচ্ছিল।
এমওআই-১এ হল এমওআই-টিডির পরবর্তী পদক্ষেপ। প্রযুক্তিটিকে একটি বিশেষ কম্পিউটিং উপগ্রহে রূপান্তরিত করে তা মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে। যদিও সংস্থার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল একটি উপগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
‘টেকমিটুস্পেস’ ভবিষ্যতে কক্ষপথে পরিদর্শনকারী কম্পিউটিং উপগ্রহের একটি নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য কাজ করছে, যা মহাকাশকে ডেটা প্রক্রিয়াকরণের একটি নতুন স্থানে পরিণত করতে পারে এবং কার্যকর ভাবে ডেটা সেন্টারের ধারণাটিকে কক্ষপথে নিয়ে যেতে পারে।
তবে বৃহত্তর প্রশ্ন হল, সীমিত শক্তি, তাপ ব্যবস্থাপনা, বিকিরণ এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা মোকাবেলা করে মহাকাশের কঠোর পরিবেশে কম্পিউটারগুলি নির্ভরযোগ্য ভাবে জটিল এআই কাজগুলি সম্পন্ন করতে পারবে কি না।
সুতরাং, এমওআই-১এ-র মূল উদ্দেশ্য ‘মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপন’-এর মতো একটি ভবিষ্যৎমুখী চিন্তা নয়। বরং একটি উপগ্রহ কি তার দেখা তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর আগে তা বিশ্লেষণ করা শিখতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।