ব্রিটেন থেকে আমেরিকা, ভারতকে নিয়ে কী দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বের? কোন নজরেই বা নয়াদিল্লিকে দেখে বাংলাদেশ-পাকিস্তান?
প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লা থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই নিয়ে টানা ১৩ বার মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দিলেন। শনিবার দেশ জুড়ে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে।
৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করছে ভারত। শনিবার স্বাধীনতা দিবসে দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দিল্লির লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দিতে গিয়ে জানান, দেশকে নিয়ে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা সত্যি করার জন্য তরুণ প্রজন্মের উপর ভরসা রাখা হয়েছে। তারাই ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ সম্ভব করে তুলতে পারে। যুবসমাজের জন্য বিশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণের কথাও ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লা থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই নিয়ে টানা ১৩ বার মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দিলেন। শনিবার দেশ জুড়ে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে।
এ বারের লালকেল্লার অনুষ্ঠানে ‘যুবশক্তি’ এবং ২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্মকে প্রাধান্য দিয়েই স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখান থেকে মোদী বলেন, ‘‘আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উপর আমার ভরসা আছে।’’
বিকশিত ভারতের স্বপ্ন সফল করার জন্য দেশের নারীশক্তি, কৃষক, শ্রমিক সকলের সহযোগিতাই চেয়েছেন তিনি। তবেই ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া যাবে। দ্রুত অগ্রগতি এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ পরিকল্পনার উপরেও প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন। কিন্তু ভারত যখন ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করছে, তখন যে প্রশ্নটা উঠে এসেছে তা হল— ভারতকে কী ভাবে বা কোন নজরে দেখে বাকি বিশ্ব? ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর গবেষণায় উঠে এসেছে সেই তথ্যই।
৩৬টি দেশের উপর চালানো একটি নতুন সমীক্ষা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এক চিত্র তুলে ধরেছে। সেই সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতকে সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে কম পছন্দ করে যে দেশ দু’টি, তারা উভয়েই ভারতের প্রতিবেশী।
আরও পড়ুন:
‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর গবেষণায় উঠে এসেছে ভারতকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে শ্রীলঙ্কা। কোন দেশ সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে, তা অনুমান করা খুব কঠিন নয়। সেই দেশটি হল পাকিস্তান। অন্য দিকে, ভারত সম্পর্কে আমেরিকার জনমত প্রায় সমান ভাবে বিভক্ত।
সামগ্রিক ভাবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৪২,০০০-এরও বেশি মানুষের থেকে তথ্য সংগ্রহ করে চালানো এই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৩৬টি দেশের মানুষ ভারতের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি পোষণ করে।
৩৬টি দেশের মধ্যে গড়ে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে, যেখানে ৪১ শতাংশের মনোভাব ছিল নেতিবাচক। দেখে নেওয়া যাক, বিশ্বের কাছে ভারতের ভাবমূর্তি নিয়ে করা সমীক্ষার তথ্য কী বলছে।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যে শ্রীলঙ্কার মানুষের কাছেই ভারতের ভাবমূর্তি সবচেয়ে ইতিবাচক, প্রায় ৭৯ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার প্রায় ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ভারতকে তাদের দেশের প্রধান বন্ধু হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন। ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
আরও পড়ুন:
২০২৪ সালেও অনুরূপ একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল পিউ রিসার্চ। তবে তার থেকে এ বছরের ফলাফল ভাল। সে সময় সমীক্ষায় অংশ নেওয়া শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের ৬৫ শতাংশ মানুষের ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল।
নয়াদিল্লি এবং কলম্বোর মধ্যেকার সম্পর্কের নতুন সমীকরণের প্রেক্ষাপটেই ভারতের প্রতি শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের আরও ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সঙ্কটের জেরে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। ভেঙে পড়েছিল দেশটির সরকার এবং শাসনব্যবস্থা। তার পর থেকে ভারত ৭৫০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ এবং আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে দ্বীপরাষ্ট্রটির পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে।
৩৬টি দেশের তালিকায় ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন যে দেশগুলি রয়েছে, সেগুলি হল কেনিয়া, ব্রিটেন, ইজ়রায়েল, জার্মানি, ইতালি এবং সুইডেন। সমীক্ষা অনুযায়ী, ওই দেশগুলির যথাক্রমে ৭১ শতাংশ, ৭১ শতাংশ, ৬০ শতাংশ, ৬৩ শতাংশ, ৫৬ শতাংশ এবং ৫৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির ক্ষেত্রে সামগ্রিক চিত্রটি বেশ মিশ্র। নেপাল এবং বাংলাদেশের মতো বেশ কয়েকটি দেশ অস্থির সময় ও গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গিয়েছে সম্প্রতি। বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ মানুষের ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, যেখানে ৫১ শতাংশের মনোভাব নেতিবাচক। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণ অভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন হাসিনা।
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় ভারত-বিরোধী প্রচার চলতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে দু’দেশের সম্পর্কের সমীকরণে বদল এলেও সে দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষের ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে ভারত তুলনামূলক ভাবে ইতিবাচক মূল্যায়ন পেয়েছে। জাপানের প্রায় ৫৫ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের ৫১ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৫০ শতাংশ মানুষ ভারতকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। এ ছাড়া ফিলিপাইনের ৪৯ শতাংশ এবং তাইল্যান্ডের ৫৫ শতাংশ মানুষের ভারতের প্রতি ভাল মনোভাব লক্ষ করা গিয়েছে।
প্রত্যাশিত ভাবেই এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। পিউ-এর গবেষণা অনুযায়ী, সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পাকিস্তানিদের মধ্যে ৯১ শতাংশের ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে মজার বিষয় হল, ৭ শতাংশ পাক জনগণের ভারতের প্রতি মতামত ইতিবাচক।
তবে পরমাণু অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘ দিনের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ফলাফল খুব একটা আশ্চর্যজনক নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে দু’পক্ষের সংঘাত এবং সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করা নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধের জেরে দুই দেশের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
পাকিস্তানের পরেই ভারত নিয়ে সবচেয়ে কম ইতিবাচক মনোভাব দেখা গিয়েছে পাকিস্তানেরই বন্ধু দেশ তুরস্কে। সেই দেশের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষের ভারতের প্রতি ভাল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় সম্প্রতি অভিবাসন-বিরোধী বিক্ষোভ প্রকট হয়েছে। আঙুল তোলা হয়েছে অভিবাসী ভারতীয়দের দিকে। সে দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষের ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
কিন্তু ভারতকে কোন নজরে দেখে আমেরিকা? সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে আমেরিকার বাসিন্দাদের মধ্যে। আমেরিকার সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকই ভারতের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, যেখানে ৪৫ শতাংশ ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।
পিউ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালের পর থেকে ভারতের প্রতি এই ইতিবাচক মনোভাবের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণকারী আমেরিকান নাগরিকদের হার ২০২৩ সালের ৫১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে আমেরিকার বাসিন্দাদের মধ্যে দলীয় বিভাজনও লক্ষ করা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের মধ্যে ৪২ শতাংশের ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রভাব সম্পর্কেও আমেরিকানদের মতামত জানতে চেয়েছিল পিউ। ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন ভারতের প্রভাব বাড়ছে, তবে অর্ধেকেরও বেশি (৫৪ শতাংশ) মনে করেন অপরিবর্তিত রয়েছে ভারতের প্রভাব। যদিও ১৩ শতাংশের মতে, ভারতের প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। ট্রাম্পের জমানায় শুল্ক এবং একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারত এবং আমেরিকার সম্পর্কে চাপানউতর দেখা গিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতাও দু’দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে।