বিয়ের আগেই অন্তঃসত্ত্বা, সম্পর্ক মানেননি আইনস্টাইনের মা! দাম্পত্যে তিক্ততা আসে মেধাবী স্ত্রীর থেকে বিজ্ঞানী তত্ত্ব ‘চুরি’ করায়?
আইনস্টাইনের প্রথম স্ত্রীও কিন্তু স্বামীর থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। উল্টে তাঁর মাথা হয়তো আইনস্টাইনের থেকেও বেশি ভাল চলত। অনেকে তেমনটাই দাবি করেন। কিন্তু দুঃখ একটাই। এ বিশ্ব আইনস্টাইনকে যতটা সম্মান দিয়েছে, তার সিকি ভাগও জোটেনি বিজ্ঞানীর স্ত্রীর কপালে।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের নাম জানেন না এমন মানুষ বোধহয় এ পৃথিবীতে নেই। গণিতশাস্ত্র তথা বিজ্ঞানে আইনস্টাইনের অবদান অনস্বীকার্য। বিশের দশকের এই বিজ্ঞানী আজও বাঘা বাঘা বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদের কাছে দেবতাসম।
তবে আইনস্টাইনের প্রথম স্ত্রীও স্বামীর থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। উল্টে তাঁর মাথা হয়তো আইনস্টাইনের থেকেও বেশি ভাল চলত। অনেকে তেমনটাই দাবি করেন। কিন্তু দুঃখ একটাই। এ বিশ্ব আইনস্টাইনকে যতটা সম্মান দিয়েছে, তার সিকি ভাগও জোটেনি বিজ্ঞানীর স্ত্রীর কপালে। উল্টে অর্ধেকের বেশি মানুষ সেই মহিয়সীর পরিচয়ই জানেন না।
আইনস্টাইনের প্রথম স্ত্রীর নাম মিলেভা মারিচ। গণিত চর্চায় তাঁর আগ্রহ ছিল। ১৯০৩ সালে মিলেভার সঙ্গে আইনস্টাইনের বিয়ে হয়। যদিও সেই বিয়ে বেশি দিন টেকেনি। ১৯১৪ সাল থেকে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন।
১৯১৯ সালে আইনস্টাইন এবং মিলেভার বিচ্ছেদ ঘটে। ডিভোর্স পাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অ্যালবার্ট দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পাত্রী ছিলেন আইনস্টাইনের তুতো বোন এলজ়া, বাল্যে যাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল আইনস্টাইনের। তবে মিলেভার সঙ্গে ১৬ বছরের এই দাম্পত্যজীবনে আইনস্টাইনের প্রাপ্তি ছিল অনেক। জনশ্রুতি, আইনস্টাইনের বিজ্ঞানী জীবনের প্রথম দিকের বেশির ভাগ তত্ত্বই নাকি লিখতে সাহায্য করতেন মিলেভা।
এ কথা শুনে ভাবতেই পারেন যে, বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর তত্ত্ব যে কোনও গণিতবিদের পক্ষে লেখা কী করে সম্ভব? এ ভাবনা ভ্রান্ত নয়। কিন্তু মিলেভা যে সাধারণ গণিতবিদ ছিলেন, এ কথা ভাবা ভুল হবে।
আরও পড়ুন:
১৮৭৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর জন্ম হয় মিলেভার। ছোট থেকেই তাঁর বাঁ নিতম্বের হাড়ে সমস্যা ছিল। সেই কারণে তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। ফলস্বরূপ ছোটবেলায় তাঁর বন্ধুসংখ্যা নেহাতই কম ছিল বা ছিল না বললেই চলে। স্কুলে সহপাঠীরা তাঁকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকতেন। মিলেভার মনে কী চলছে তা কখনও তাঁর সহপাঠীরা জানতে চাননি।
কিন্তু মেধাবী মিলেভা একাকিত্বেই সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন। পড়াশোনায় ডুবে থাকতেন তিনি। মিলেভাকে অনুপ্রেরণা জোগাতেন তাঁর স্নেহশীল বাবা। স্কুলে দুর্দান্ত ফল করার পর মিলেভা পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করেন।
বিশের দশকে যে গুটিকয়েক মহিলা বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ‘ধৃষ্টতা’ দেখিয়েছিলেন, মিলেভা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সামাজিক বাধা পেরিয়ে তিনি সুইৎজ়ারল্যান্ডের জ়ুরিখ পলিটেকনিক কলেজে পড়তে যান। সেখানে তিনি গণিতশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেই ক্লাসে মিলেভা একাই মহিলা ছিলেন। তাঁর সহপাঠীরা সকলে পুরুষ ছিলেন।
আইনস্টাইনের সঙ্গে মিলেভার সেখানেই আলাপ হয়। মিলেভা তাঁর থেকে তিন বছরের বড় ছিলেন। মিলেভার প্রতিবন্ধকতা কখনও আইনস্টাইনের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেনি। সমস্ত কিছু উপেক্ষা করেই মিলেভার বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন আইনস্টাইন। ক্রমে সেই বন্ধুত্ব প্রেমের দিকে বাঁক নেয়।
আরও পড়ুন:
আইনস্টাইনের প্রথম প্রেমিকা মারির মতো সুন্দরী ছিলেন না মিলেভা। কিন্তু গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি মিলেভার ভালবাসা আইনস্টাইনকে তাঁর প্রেমে পড়তে বাধ্য করে।
পড়াশোনা এবং প্রেম উভয়ই পাশাপাশি চলতে থাকে। দু’জনেই কলেজের পরীক্ষাগুলিতে খুব ভাল ফল করেন। কিন্তু এর মাঝেই ঘটে যায় এমন একটি কাণ্ড যা মিলেভার লক্ষ্যের পথে প্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মিলেভা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।
মিলেভা প্রথমে বিষয়টি সকলের থেকে লুকোনোর চেষ্টা করেন। যদিও আগত সন্তানের পিতা অ্যালবার্ট সবটাই জানতেন। মিলেভার শরীরে যখন পরিবর্তন ফুটে ওঠা শুরু করে, সেই সময় বাড়ি ফিরে আসা ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। সেই সময়ে দাঁড়িয়েও মিলেভার মা-বাবা তাঁর পাশে ছিলেন।
কন্যাসন্তানের জন্ম দেন মিলেভা। নাম রাখা হয় লিজের্ল। কিন্তু পরবর্তী কালে সেই কন্যাসন্তানের সঙ্গে কী হয় সে সংক্রান্ত কোনও নথি ইতিহাসের পাতায় অনেকটাই ধুসর।
মিলেভা পুনরায় জ়ুরিখে ফিরে যান। পড়াশোনায় মন দেন। কিন্তু বিয়ের আগেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া এবং বাচ্চার থেকে দূরে চলে আসার হতাশা তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে। মিলেভার চাল-চলনে বদল দেখা যায়। ওজন বাড়তে থাকে। তিনি নিজের যত্ন নেওয়া একপ্রকার ভুলে যান বললেই চলে।
ফলস্বরূপ কলেজ পর্বের অন্তিম পরীক্ষায় পাশ করতে ব্যর্থ হন মিলেভা। তিনি পুনরায় পরীক্ষা দেন। তা সত্ত্বেও ব্যর্থ হন। ডিপ্লোমা এবং পিএইচডি করার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়।
আইনস্টাইনের মা পাওলিনের মোটেই পছন্দ ছিল না মিলেভাকে। কিন্তু সে সবে কর্ণপাত করেননি পুত্র। দীর্ঘ টানাপড়েনের পর মিলেভাকে বিয়ে করেন আইনস্টাইন। এর পর তাঁদের কোলে দুই পুত্রসন্তান আসে। মিলেভা ঘোর সংসারী বৌমায় পরিণত হন।
কিন্তু সংসারজীবনের প্রথম দিকেও মিলেভার বিজ্ঞানের প্রতি টান যায়নি। তিনি আইনস্টাইনকে তাঁর গণিতের কঠিন সমস্যাগুলি সমাধান করতে সাহায্য করতেন। পরবর্তী কালে মিলেভার আইনস্টাইনকে এবং তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধু হেলেন সাভিচকে লেখা চিঠিগুলি পড়ে সেই ধারণাই পাওয়া যায়। সেখানে বহু জায়গায় অ্যালবার্টের কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিলেভা ‘আমাদের কাজ’ বলে উল্লেখ করেছেন বলে দাবি করছে সূত্র। যদিও আইনস্টাইনের কোনও তত্ত্বেই স্বীকারোক্তিতে মিলেভার নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
মিলেভাকে নিয়ে গবেষণা করা বহু বিজ্ঞজনের মত, ১৯০৫ সালে আলোড়ন সৃষ্টি করা অ্যালবার্টের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব নাকি তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রী মিলেভার থেকেই অনুপ্রাণিত। যদিও এর কোনও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে, সেই বছরই বন্ধু হেলেনকে লেখা চিঠিতে মিলেভা জানিয়েছিলেন যে তাঁদের (তাঁর এবং আইনস্টাইনের) আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি পেলে তিনি বেজায় খুশি হবেন। সেই চিঠিতেই তিনি তাঁর বন্ধুর সঙ্গে আপেক্ষিক তাপের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
যে নারী সেই সময় মধ্যবিত্ত পরিবারে থেকেও বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার স্পর্ধা দেখান, স্বামীকে তাঁর কাজে সাহায্য করেন, পরবর্তী কালে এসে তিনি যে কেবল গৃহিণী হিসাবে থেকে যেতে পারবেন না তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চব্বিশ ঘণ্টা গবেষণায় ব্যস্ত থাকা স্বামী এবং দুই সন্তানের পরিচর্যা করে চলা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে মিলেভার জন্য। মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন তিনি। দাম্পত্যকলহও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। নেপথ্যে বিশ্বকাঁপানো তত্ত্বে অবদান থাকার পরও নিজের নাম দেখতে না পাওয়া স্ফুলিঙ্গ হিসাবে কাজ করেছিল কি না তা যদিও জানতে পারা যায়নি।
আইনস্টাইন-মিলেভার সমীকরণ দ্রুত গড়িয়ে পড়তে শুরু করে পাক খেতে খেতে। আইনস্টাইন ব্যক্তিগত বেদনা থেকে অব্যাহতি পেতে আরও বেশি একাকী ও কাজে মগ্ন হতে থাকেন। উল্টো দিকে মিলেভাও কিছু দিনের জন্য বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
ঝামেলা আরও বাড়লে মিলেভা দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ছাড়েন। অ্যালবার্টের বন্ধু রসায়নবিদ ফ্রিৎজ় হাবের-এর বাড়িতে চলে যান। হাব মিলেভাকে বুঝিয়ে পুনরায় স্বামীর কাছে পাঠান। কিন্তু সেই সময় আইনস্টাইন নানা শর্তে সম্পর্ককে বেঁধে রাখেন।
সে সমস্ত শর্তে মিলেভাকে ঘরের কাজ কোনটা কী ভাবে করতে হবে থেকে শুরু করে তিনি কোন সময় কী ভাবে অ্যালবার্টের সঙ্গে কথা বলবেন, কখন কথা বলবেন না সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বলা ছিল। এমনকি বলা ছিল যে মিলেভা বাড়িতে স্বামীর পাশে বসবেন না, স্বামীর সঙ্গে কোথাও যাবেন না, তিনি স্বামীর নৈকট্য আশা করবেন না, স্বামীকে ভর্ৎসনাও করবেন না। কয়েক মাস সহ্য করার পর দুই ছেলে নিয়ে মিলেভা বার্লিন ছেড়ে চলে যান জ়ুরিখ। আর ফেরেননি আইনস্টাইনের জীবনে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আইনস্টাইন ডিভোর্স পান ১৯১৯ সালে।