গুলি করে খুন ১৪ হাজার, পরিকল্পনা আরও ৮৮০০ হত্যার! আচমকা কেন হাজার হাজার ভালুক মারছে ‘সূর্যোদয়ের দেশ’?
ঠান্ডা মাথায় ভালুকদের খুন করে চলেছে জাপান। যদিও টোকিয়োর এই সিদ্ধান্তকে ‘নৃশংসতা’র তকমা দেওয়ার আগে নেপথ্যে থাকা কারণটি সম্বন্ধে অবগত হওয়া জরুরি।
প্রযুক্তির দেশ জাপানের অধিবাসীদের শান্তিপ্রেমী বললে ভুল বলা হবে না। তাঁদের জীবনধারা থেকে শুরু করে সব কিছুই বাঁধা রয়েছে নিয়মের সুতোয়। ধরাবাঁধা ছকে জীবনের সাগরে ভেসে যেতে পছন্দ করেন ‘ইকিগাই’য়ের দেশের মানুষেরা। জাপানের অ্যানিমেগুলিতেও (জাপানিদের বানানো অ্যানিমেশন সিনেমা) ধরা পড়ে শান্তিপূর্ণ জীবনের চিত্র।
কিন্তু সেই শান্তিপ্রেমী অধিবাসীদের দেশের সরকারই করছে এক ভয়ঙ্কর কাজ। জাপানে নির্বিচারে মেরে ফেলা হচ্ছে একের পর এক ভালুককে। যদিও টোকিয়োব এই সিদ্ধান্তকে ‘নৃশংসতা’র তকমা দেওয়ার আগে নেপথ্যে থাকা কারণটি সম্বন্ধে অবগত হওয়া জরুরি।
এপ্রিল ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে জাপান সরকার ১৪ হাজারেরও বেশি ভালুক হত্যা করেছে। টোকিয়োর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকায় ১২ হাজার বাদামি ভালুক এবং দু’হাজার কালো ভালুক রয়েছে।
২০২৬ শুরু হওয়ার পর থেকে চার হাজার ভালুক হত্যা করেছে জাপান সরকার। এখনও আরও ৮৮০০টি ভালুক মেরে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। কিন্তু কেন ভালুক নিয়ে এত চিন্তায় জাপান? কেন সেগুলিকে এ ভাবে হত্যা করা হচ্ছে?
জাপান সরকারের ভালুক হত্যার কারণ, মানুষের উপর তাদের আক্রমণ। প্রতি বছর জাপানিরা যে কারণে মারা যান, তার মধ্যে ভালুকের আক্রমণ অন্যতম। বছর বছর জাপানিরা ভালুকের আক্রমণের শিকার হন। সেই কারণে ‘বাধ্য হয়ে’ জাপানের সরকার ভালুক মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আরও পড়ুন:
বিপুল সংখ্যায় ভালুক হত্যা করার পরও চলতি বছর ইতিমধ্যেই ছয় জন ভালুকের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতি বছরই জাপানে এই চিত্র দেখা যায়। অনেকে গুরুতর আহত হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। আবার কারও ভাগ্যে ভালুকের হাতে মৃত্যু লেখা থাকে।
প্রতি বছর গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে জাপানিরা নাগানো প্রদেশের কারুইজাওয়ায় ভিড় জমান। আসামা পর্বতের পাদদেশে বাঁশবাগানে ঘেরা এই জায়গা জাপানিদের গরম থেকে স্বস্তি দেয়। কিন্তু এই জঙ্গল ভালুকদেরও বড্ড প্রিয়।
হিংস্র শ্বাপদেরাও সেখানে খাবারের খোঁজে আসে। তখন মানুষের মুখোমুখি হলেই ঘটে মুশকিল। হিংস্র চারপেয়েরা মানুষকে আক্রমণ করে।
জাপানে বরাবরই ভালুকের উৎপাত রয়েছে। সেই কারণে ১৯৯০ সাল থেকে সেখানে ভালুক তাড়ানোর এক অভিনব পন্থা চালু রয়েছে। ‘পিকিও’ নামে এক জাপানি সংস্থা ভালুক তাড়ানোর কাজে সাহায্য করে। কোথাও ভালুক দেখা গিয়েছে সেই খবর পেলেই তারা হাজির হয় তিনটি কুকুর নিয়ে। সেই কুকুরগুলিকে ভালুক তাড়ানোর জন্য আলাদা ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সারমেয়রা এসে ভালুক তাড়াতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন:
সারমেয়রা ভালুক তাড়াতে বিফল হলেও ক্ষতি নেই। সেই সংস্থার তরফে ভালুকদের চেতনানাশক দিয়ে গভীর জঙ্গলে পাঠানোর কাজও করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও আর পেরে উঠছে না। ভালুকগুলিও যেন মানুষের উদ্দেশ্য ধরে ফেলেছে। পাশাপাশি, ভালুক-মানুষের সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই নিয়ম মেনে চলাও এক প্রকার অসম্ভব হয়ে উঠছে।
জাপানে ভালুকের আক্রমণের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে ইংল্যান্ড-সহ বিভিন্ন দেশের সরকার অধিবাসীদের জাপান ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে। জাপানের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও সে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভালুকের হানা সম্পর্কিত পোস্টার টাঙানো হয়েছে।
ভালুকের রোষ থেকে নিজেদের এবং ফসল বাঁচানোর লক্ষ্যে সেখানকার কৃষকেরা জমিতে লাল আলো জ্বলা চোখের নেকড়ের মূর্তি বসাচ্ছেন। এমনকি জাপানের বিমা সংস্থাগুলি ‘ভালুক বিমা’ প্রদান করা শুরু করেছে। সেই বিমায় ভালুকের দ্বারা ক্ষতি হওয়া সম্পত্তি মেরামত করার খরচ দেওয়া হয়।
বেশির ভাগ ভালুকের আক্রমণের খবর মেলে জাপানের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল ইওয়া এবং আকিতাতে। গত বছর প্রায় ২৩০ জন জাপানি ভালুকের আক্রমণের সম্মুখীন হন। এর মধ্যে ১৩ জনের প্রাণ যায়। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর জাপানে ভালুকের আক্রমণের পরিমাণ ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে জাপান সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রচুর সমালোচনাও কুড়োচ্ছে। এশীয় দেশের কালো ভালুক এমনিতেই বিলুপ্তির পথে রয়েছে। এর মধ্যে জাপান সরকারের সেগুলিকে মেরে ফেলায় সেগুলি বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
‘জাপান বেয়ার অ্যান্ড ফরেস্ট সোসাইটি’র চেয়ারম্যান ইউকো মুরোয়া জানিয়েছেন, এই পরিমাণে ভালুকদের হত্যা করা হলে সেগুলি বিলুপ্ত হতে বিশেষ সময় লাগবে না। তাঁর মতে, ভালুকদের মেরে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবেশগত কারণে ভালুকগুলি মানুষের থাকার জায়গায় ঢুকে পড়ছে। সে দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি বলে মনে করছেন ইউকো।
অনেকেই মনে করছেন, বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হওয়ার কারণেই ভালুকেরা জনবসতিতে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে। খাদ্যের খোঁজেই সেগুলি জনবসতিতে ঢুকে পড়ছে।
জাপানের পরিবেশ মন্ত্রক থেকে সেই কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন প্রতিরোধক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাড়ির কাছাকাছি অংশে ফলের গাছ না লাগানো, জনবসতির পাশে বেড়া দেওয়ার মতো বিভিন্ন নির্দেশের কথা বলা রয়েছে তাতে। এর পাশাপাশি জনসাধারণকে ভালুক তাড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও বলা রয়েছে।
জাপান বরাবরই এশীয় ভালুকদের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। আগের মতোই ভালুক এবং মানুষ নিজেদের মতো মিলেমিশে থাকতে পারলে ভাল হয় বলেই মনে করছেন অনেকে। জাপানের সরকারের কাছে সেই আর্জিও জানাচ্ছেন তাঁরা। হিংস্র শ্বাপদদের মেরে ফেলাই একমাত্র উপায়, না অন্য কোনও পথ সে দেশের সরকার খুঁজে পাবে তা সময়ই বলতে পারবে।