বিষয়বস্তু বিতর্কিত, অভিনেতা ‘নরখাদক’! নিষিদ্ধ সিনেমা ‘ইউরোপের ধুরন্ধর’-এর সমর্থনে কেন গলা ফাটাচ্ছেন ইলন মাস্ক?
কেন এত বিতর্ক ‘ইউরোপের ধুরন্ধর’ নিয়ে? বিশেষজ্ঞদের দাবি, গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, ছবির মূল গল্পের আড়ালে তুলে ধরা হয়েছে ইউরোপে অভিবাসীদের নিয়ে সমস্যা এবং ওই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ।
অভিবাসীদের নিয়ে সিনেমা। পরিচালনা করেছেন জার্মান পরিচালক। কিন্তু জার্মানি চায় না সেই ছবি আমজনতা দেখুক। অন্য দিকে, বিতর্কিত সেই ছবির প্রচার করতে আসরে নেমেছেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি তথা টেসলা-কর্তা ইলন মাস্ক।
ইউরোপের প্রেক্ষাপটে অভিনেতা আর্মি হ্যামার অভিনীত সেই ছবির নাম ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’। ছবিটিকে ইতিমধ্যেই রণবীর সিংহ অভিনীত বলিউডের অন্যতম সফল ছবি ‘ধুরন্ধর’-এর সঙ্গে তুলনা করা শুরু হয়েছে। কারণ অনেকেই দাবি করেছেন, ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে যেমন দেশের শত্রুদের কারণে ভারতের হওয়া এমন অনেক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা অনেক মানুষকে ভাবালেও তা নিয়ে এত দিন বিশেষ আলোচনা হত না, ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’-এর ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই। তবে ওই ছবির প্রেক্ষাপট ইউরোপের বিশেষ কিছু সমস্যা।
কারণ ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’ এমন একটি সিনেমা যা ন্যায়বিচারের গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি বলে মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে জটিল এবং গভীর কিছু বার্তা। জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা উভে বল পরিচালিত ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’ ছবিটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মাইকেল স্যান্ডার্স নামে এক চরিত্রকে কেন্দ্র করে। অপরাধমূলক অতীত রয়েছে এমন সন্দেহভাজন অভিবাসীদের খুঁজে বার করে শাস্তি দেওয়া এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের মুখোশ উন্মোচন করা তার কাজ।
কিন্তু কেন এত বিতর্ক ‘ইউরোপের ধুরন্ধর’ নিয়ে? বিশেষজ্ঞদের দাবি, গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, ছবির মূল গল্পের আড়ালে তুলে ধরা হয়েছে ইউরোপে অভিবাসীদের নিয়ে সমস্যা এবং ওই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ।
ছবিতে মাইকেল নামের ‘ভিজিল্যান্টে’ বা স্বনিযুক্ত ন্যায়বিচারকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা হ্যামার। চরিত্রটিকে সাধারণ মানুষ নায়ক হিসাবে গণ্য করে। তবে অভিনেতা কস্টাস ম্যান্ডাইলোর অভিনীত ইন্টারপোল প্রধান হেনরি বিষয়টিকে ভিন্ন ভাবে দেখেন এবং স্যান্ডার্সকে সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলে মনে করেন।
আরও পড়ুন:
ছবির গল্প অনুযায়ী, মাইকেল প্রাক্তন মার্কিন সেনা। কিন্তু পৈতৃক সূত্রে ব্যবসা এবং বাড়ি পেয়ে ইউরোপ গিয়েছেন তিনি। কিন্তু ইউরোপে গিয়ে তিনি দেখেন, অপরাধের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। মহিলারা ধর্ষিত হচ্ছেন। প্রকাশ্যে খুন করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আর এই সব অপরাধের মূলে রয়েছেন কিছু অভিবাসী। কিন্তু আইন এবং রাজনীতি তাঁদের ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তখনই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় মাইকেল। আইন নিজের হাতে তুলে নেয় সে। যারা ইউরোপে ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত, তাদের পরিবারকে খুঁজে খুঁজে শাস্তি দিতে শুরু করে।
ইউরোপের রাজনৈতিক মহল এবং বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, ইউরোপে অপরাধ বৃদ্ধির জন্য দায়ী অভিবাসীরা। ২০২৪ সালে ইটালির প্রধানমন্ত্রী খোদ জর্জিয়া মেলোনি মন্তব্য করেছিলেন, ইউরোপে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী অভিবাসীরা।
ইতিমধ্যেই আলোচনায় রয়েছে ব্রিটেনের তরুণী-কিশোরীদের জীবন ছিঁড়ে খাওয়া পাক ‘গ্রুমিং গ্যাং’। ইংলিশ চ্যানেলের পারে দাপিয়ে বেড়ানো পাকিস্তানের সেই গ্যাং অনেক দিন ধরেই চিন্তার কারণ ব্রিটেনের জন্য। তাদের ভয়ে কাঁটা ব্রিটিশ শৈশব। অভিযোগ, নাবালক-নাবালিকাদের যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে মাদকাসক্তি বা ধর্ম পরিবর্তন, কিছুই নাকি বাকি রাখে না পাক দুষ্কৃতীরা।
ইউরোপীয়দের একাংশের দাবি, শুধু ব্রিটেন নয়, গ্রুমিং গ্যাংয়ের মতো ঘটনা অন্য দেশেও হচ্ছে। আর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংগঠিত অপরাধের অধিকাংশের জন্য দায়ী অভিবাসীরাই। আবার গত কয়েক বছরে ইউরোপীয়দের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ায় অনীহা দেখা দিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্মহার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে বলেও উঠে এসেছে রিপোর্টে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে দাবি, যে সব অভিবাসী ইউরোপে রয়েছেন, তাঁদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার তুলনামূলক ভাবে বেশি। ফলে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপের জনতত্ত্ব এবং রাজনীতি বদলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এ-ও মনে করছেন, ইউরোপ চাইলেই অভিবাসীদের তাড়াতে পারবে না। তেমনটা করলে মহাদেশটির অর্থনীতি ভেঙে যেতে পারে।
ফলে ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’ সিনেমা দেখার পর অনেকে মনে করছেন, ইউরোপীয়দের একাংশের মনে যা আছে, তা-ই বলানো হয়েছে ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’-এর মূল চরিত্র মাইকেল চরিত্রের মুখ দিয়ে। অনেক বিতর্কিত বিষয় উঠে এসেছে ছবির কাহিনিতে। এমনকি সরকারকেও হুমকি দিতে দেখা যায় মাইকেল চরিত্রটিকে।
যদিও সমালোচকেরা দাবি করেছেন, ছবিটি ইউরোপের জাতিগত বিদ্বেষ এবং উদ্বেগের এক একপেশে চিত্রায়ন, যেখানে সাধারণ অপরাধের চেয়ে বরং মুসলিম অভিবাসীদের প্রতি বিশেষ বিদ্বেষ বা ভীতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
ছবিটি মূলধারার বিনোদনের মোড়কে অভিবাসন নিয়ে ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীদের ভীতিকেই তুলে ধরেছে বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হোক বা না হোক, ছবিটি ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক মনোভাব দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত বলেও অনেকে মনে করছেন।
জনশ্রুতি, ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’ ছবিটি ২০১৬ সালে হামবুর্গে ঘটা একটি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। অভিযোগ, ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরীকে গণধর্ষণ করে একদল অভিবাসী পুরুষ। কিন্তু অপরাধীরা ‘সাসপেন্ডেড সেন্টেন্স’ বা স্থগিত কারাদণ্ড পাওয়ায় তাদের সরাসরি জেল খাটতে হয়নি।
সম্ভবত এটিই ছবিটির একমাত্র উপাদান যা সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত বলে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে দাবি করা যেতে পারে। পরিচালক উভে ছবিটি ক্রোয়েশিয়ায় চিত্রায়িত করেছেন। ছবিটির প্রাথমিক নাম রাখা হয়েছিল ‘দ্য ডার্ক নাইট’। কিন্তু নির্মাতাদের সেই নাম পরিবর্তন করতে হয়েছিল কারণ ‘ওয়ার্নার ব্রাদার্স’-এর কাছে ইতিমধ্যেই সেই নামের কপিরাইট বা স্বত্ব সংরক্ষিত রয়েছে।
ইউরোপের একাধিক দেশ ইতিমধ্যেই ছবিটি প্রদর্শনের আগে কাঁচি চালিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছবিটি প্রদর্শন বন্ধের দাবিও উঠেছে। সিনেমা সমালোচকদের একাংশ বিস্তর সমালোচনা করেছেন ছবিটিকে নিয়ে। ছবিটি নিয়ে সমালোচক এবং সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও তা নজর কেড়েছে টেসলা এবং স্পেসএক্সকর্তা তথা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মাস্কের।
মাস্ক সমাজমাধ্যমে ছবিটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘সিনেমাটির বিষয়বস্তু ঠিক এমন, যা মানুষ দেখতে চান।” উল্লেখ্য, মাস্ক মূলত তাঁর ডানপন্থী মতাদর্শের জন্য পরিচিত। জার্মানিতে ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’ ছবিটি প্রথমে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এর হিংসাত্মক বিষয়বস্তুর কারণে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বাস্তব জীবনে হিংসা উস্কে দেওয়ার আশঙ্কায় ছবিটিকে কোনও বয়সভিত্তিক রেটিং দিতে রাজি হয়নি। তবে ২৫ জুন মাস্ক তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে সিনেমাটির লিঙ্ক পোস্ট করেন।
মাস্কের শেয়ার করা লিঙ্কটি এখন আর কাজ করছে না, তবুও অন্য ‘এক্স’ ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে ছবিটির কথা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে ইতিমধ্যেই ছবিটি দেখে ফেলেছেন। অনেকে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পরিচালক উভেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে তৈরি একটি ছবি সমাজমাধ্যমে শেয়ার করেন। ছবিটিতে দেখা গিয়েছে, হ্যামারের চরিত্রটি ‘সুপারগার্ল’-এর পোশাক পরিহিত এক মহিলার নিথর দেহের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে সমাজমাধ্যমে ছবিটি নিয়ে ব্যাপক সাড়া পড়ার পর পরিচালক ঘোষণা করেছেন যে, ছবিটির পরবর্তী পর্ব বা সিক্যুয়েল তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তিনি ভক্তদের তৈরি এআই-ভিত্তিক একটি পোস্টার শেয়ার করে লেখেন, ‘‘দেখতে থাকুন ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’। তা হলে আমরা শীঘ্রই দ্বিতীয় পর্বের শুটিং শুরু করতে পারব।”
তবে ছবিটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে আরও। ছবির মূল চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, সেই আর্মি হ্যামারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন এবং নরমাংস ভক্ষণের অভিযোগ উঠেছিল। হ্যামারের পাঠানো বলে দাবি করে কিছু আপত্তিকর এবং খোলামেলা বার্তা সমাজমাধ্যমে ফাঁস করেন একাধিক মহিলা। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সব বার্তায় চরম পর্যায়ের যৌন চর্চা এবং বিকৃত যৌন কল্পনার বিস্তারিত বিবরণ ছিল। এমনকি একটি বার্তায় অভিনেতা নাকি দাবি করেছিলেন যে তিনি নরখাদক। যৌন অসদাচরণের অভিযোগের জেরে ২০২১ সালে ট্যালেন্ট এজেন্সি ‘ডব্লিউএমই’ তাঁকে নিষিদ্ধ করেছিল।
যদিও হ্যামার বরাবরই এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ দায়ের না করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিতর্কের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে হ্যামারের কেরিয়ার। তা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে তিনি বেশ কয়েকটি স্বল্প বাজেটের ‘ইন্ডি’ বা স্বাধীন চলচ্চিত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ‘সিটিজ়েন ভিজিল্যান্টে’ সেগুলোরই একটি। ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ এবং ‘কল মি বাই ইয়োর নেম’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের জন্য পরিচিত হ্যামারের শেষ বড় ছবি ছিল ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডেথ অন দ্য নাইল’।