চারদিকে জনসমুদ্রে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি! কেন হাজার হাজার মানুষ মরক্কো থেকে ঢুকে পড়ছেন স্পেনের দখলে থাকা শহরে?
বৃহস্পতিবার রাত থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় মরক্কোর সীমান্তবর্তী স্পেনীয় শহর সেউতায় প্রবেশ করেছেন অন্তত ৬০ হাজার জন, যা সেউতার মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের সমান।
অনেকটা পথ সমুদ্রে সাঁতরে, নৌকায় করে এসে সমুদ্রসৈকতের ঢেউ-প্রতিরোধক বাঁধ এবং বেড়াজাল টপকে পিল পিল করে শহরে ঢুকছেন একদল মানুষ। আর সেই রাশ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে! স্পেনের উপকূলীয় শহর সেউতায় ঘটা সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনা এখন সারা বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই দৃশ্য চমকে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় মরক্কোর সীমান্তবর্তী স্পেনীয় শহর সেউতায় প্রবেশ করেছেন অন্তত ৬০ হাজার জন, যা সেউতার মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের সমান। তাঁরা সকলেই মূলত এসেছেন মরোক্কো থেকে। তবে সামুদ্রিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে সেউতায় পৌঁছোতে গিয়ে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে। সেউতার স্থানীয় প্রেসিডেন্ট হুয়ান জিসাস ডিভাস জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। শুক্রবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অনেকে সমুদ্রে ডুবে মারা গিয়েছেন। আবার অনেকের মৃত্যু হয়েছে জনসমুদ্রে পদদলিত হয়ে।
বৃহস্পতিবার থেকে সমাজমাধ্যমে এই ‘অনুপ্রবেশ’ সংক্রান্ত নানা ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও সেই ভিডিয়োগুলির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম। ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, মূলত মরক্কোর নাগরিকদের একটি বিশাল দল তারাজল সমুদ্রসৈকতের ব্রেকওয়াটার (ঢেউ-প্রতিরোধক বাঁধ) পেরিয়ে সেউতার রাস্তাগুলির দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সমুদ্র সাঁতরে সেউতায় প্রবেশ করছেন।
এঁদের মধ্যে বেশির ভাগই পুরুষ (মূলত তরুণ) হলেও, নারী এবং শিশুদের নিয়েও একাধিক পরিবারকে সীমান্ত টপকাতে দেখা গিয়েছে। সীমান্ত পার করার সময় অনেক অভিবাসীকে ‘ভিভা এস্পানিয়া (স্পেন দীর্ঘজীবী হোক)’ বলে স্লোগানও দিতে শোনা যায়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোট্ট স্পেনীয় শহরে মূলত সাঁতরে পৌঁছোনোর চেষ্টা করা অভিবাসীদের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পরই স্পেন এবং মরক্কো সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তের মরক্কো অংশে অভিবাসীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর সংঘর্ষের জেরে সেখানকার পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
আরও পড়ুন:
সেউতায় স্পেন সরকারের প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে অন্তত ন’জন মারা গিয়েছেন। মৃত্যুর কারণ বা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও, মৃতদেহগুলিকে সমুদ্রের জলে ভাসতে দেখা গিয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, সাঁতরে সেউতায় পৌঁছোনোর চেষ্টা করার সময়েই প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা।
বিপুল সংখ্যক মানুষের সীমান্ত বেড়া ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়ার ঘটনায় সৃষ্ট সঙ্কট সামাল দিতে সেউতার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত বাহিনী চেয়েছিলেন। মাদ্রিদ জানিয়েছে, অনুপ্রবেশ আটকাতে সেউতায় তারা সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি ডুবুরিও পাঠাচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নয়। সেউতায় রাস্তা দিয়ে বইছে অভিবাসীদের সমুদ্র! স্পেন সরকার জানিয়েছে, সেউতা শহরের নিরাপত্তা বজায় রাখার কাজে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করতে সশস্ত্র বাহিনী পাঠানো হবে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের অনেককেই ইতিমধ্যে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার এক ভাষণে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ় এই অনুপ্রবেশকে ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন’ বলে অভিযোগ করেছেন। মানব পাচারকারীদের দুষেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী। অন্য দিকে, সেউতার মেয়র তথা প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘সেউতা বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কোনও ভাবেই বেশি দিন চলতে পারে না।’’
সেউতার সীমান্তে দায়িত্বরত নিরাপত্তাবাহিনী ‘স্প্যানিশ সিভিল গার্ড’-এর এক কর্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এবং এই ক’দিনে হাজার হাজার অভিবাসী সীমান্ত পার হয়ে গিয়েছেন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। উত্তর মরক্কোর ‘মরক্কান অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস’-এর সদস্য আশরাফ মাইমুনি এই পরিস্থিতিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আরও পড়ুন:
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেউতার পরিস্থিতিকে ‘আক্রমণ বা আগ্রাসনের’ মতো বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। নভেম্বরে হতে চলা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘‘রিপাবলিকানেরা যদি নির্বাচিত না হয়, তবে আমাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে— বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’’ পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন বলেছেন, ‘‘সেউতাতে যে ঘটনা দেখা যাচ্ছে সেগুলি গ্রহণযোগ্য নয়।’’ এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নিয়মকানুন মেনে না চলে কাউকে আমাদের ইউনিয়নে প্রবেশ করতে দেওয়া যায় না।’’
মরক্কোর কর্তৃপক্ষ অবশ্য সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি। মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্য দিকে, স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে মরক্কো সরকার স্পেনের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ ভাবে সহযোগিতা’ করছে এবং সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টাকারী অসংখ্য মানুষকে ‘আটকে দিচ্ছে’ মরক্কোর পুলিশ। উভয় দেশই সেউতায় অবৈধ ভাবে প্রবেশ করা সকল মানুষকে ‘যত দ্রুত সম্ভব ফেরত পাঠানোর’ বিষয়ে যৌথ ভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
কিন্তু মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতায় কেন বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর ঢল নেমেছে? ১৫৮০ সাল থেকে মরক্কোর উত্তর উপকূলের সেউতা ছিটমহল স্পেনের অধীনে। সেউতায় খ্রিস্টান এবং মুসলিম— উভয় ধর্মাবলম্বী মানুষেরই বসবাস। জনসংখ্যা মেরেকেটে ৮৫ হাজার। প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে মরক্কো থেকে মানুষ ঢুকে পড়েন ওই এলাকায়। তবে বৃহস্পতিবার থেকে সেই সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কেউ জলপথে, কেউ আবার স্থলপথে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় ঢুকে পড়েছেন।
শুধু সেউতা নয়, আফ্রিকা মহাদেশে স্পেনশাসিত আরও একটি ভূখণ্ড রয়েছে— মেলিলা। ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাতে বরাবরই সীমান্তে কড়া নজর রাখেন নিরাপত্তাকর্মীরা। বৈধ নথি না থাকলে তড়িঘড়ি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে সেই রাশ উপেক্ষা করেই দলে দলে মানুষের ঢল ঢুকছে সেউতায়।
স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা এবং মেলিলা স্পেনের অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলির মাধ্যমেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আফ্রিকার একমাত্র স্থলসীমান্ত যুক্ত। মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সেউতা মূল ভূখণ্ড স্পেন থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। ইউরোপে পৌঁছোতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের কাছে এটি দীর্ঘ কাল ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বা গন্তব্য হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মরক্কো আনুষ্ঠানিক ভাবে সেউতা এবং মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসাবে স্বীকৃতি দেয় না এবং সেগুলিকে ‘দখল করা জমি’ হিসাবে চিহ্নিত করে।
সাম্প্রতিক সময়ে স্পেন এবং মরক্কোর মধ্যেকার কূটনৈতিক সঙ্কটের ক্ষেত্রে সেউতা একটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২১ সালে শেষ বার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন পশ্চিম সাহারার সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাদ্রিদের সঙ্গে বিরোধের জেরে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ হাজার মানুষকে সীমান্ত অতিক্রম করার সুযোগ করে দিয়েছিল বলে অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী মতাদর্শের বিস্তারের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হল অভিবাসন সমস্যা। ২০১৫-’১৬ সালের সঙ্কট জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্ক এবং ইটালিতে ডানপন্থী রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর তথ্য মতে, উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে কিংবা নিজেদের দেশে ‘হিংসা’ থেকে বাঁচতে ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসন-প্রত্যাশীদের জন্য স্পেন একটি প্রধান প্রবেশপথ।
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সেউতায় পৌঁছোনোর জন্য অভিবাসীরা প্রায়ই মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে সাঁতার কেটে স্পেনীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। এই পথের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। আবার অনেকে নিকটবর্তী বেলইউনেশ শহর থেকেও এই পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। সে ক্ষেত্রে দূরত্ব কিছুটা কম হয়। আর সে কারণেই সেউতা এবং মেলিলার মতো শহরগুলিকে কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনীতে ঘিরে রাথা হয়েছে।
ঘটনাচক্রে, হাজার হাজার অভিবাসীদের মরোক্কো থেকে সেউতায় প্রবেশের এই ঢেউ স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর দেখা দিয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছোনোর চেষ্টার সময় সমুদ্রপথে আটক অভিবাসীদের তৎক্ষণাৎ মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর কথায়, মানব পাচারকারীরা আদালতের ওই রায়কে ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের এই ভুল ব্যাখ্যাটি গত কয়েক ঘণ্টায় মানব পাচারকারী চক্রগুলির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আর সে কারণেই আমরা অভিবাসীদের এমন ব্যাপক স্রোত দেখতে পাচ্ছি।”
কিন্তু কী বলছেন বিশেষজ্ঞেরা? ভৌগোলিক কারণ ছাড়াও এর নেপথ্যে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, স্পেনের বর্তমান সরকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী মতাদর্শের অনুসারী। অভিবাসনের বিষয়ে তারা বেশ সহানুভূতিশীল। বর্তমান সরকার অভিবাসীদের বৈধতা প্রদানের একটি কর্মসূচি চালু করেছে, যা অভিবাসীদের কাছে ইতিবাচক হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি পরিসংখ্যান বলছে মরক্কোয় জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ২০২৪ সালের ১৩.৩% থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৩%-এ নেমে এলেও, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী (৩৬.৭% থেকে বেড়ে ৩৭.২%) এবং মহিলাদের (১৯.৪% থেকে বেড়ে ২০.৫%) মধ্যে বেকারত্বের হার এখনও অনেক বেশি। ফলে অনেকেই অর্থ উপার্জনের আশায় স্পেন হয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় থাকেন।