কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব জুড়ে প্রবল খাদ্যসঙ্কটের আশঙ্কা! বিশ্ববাসীকে সতর্ক করল ভারত, দিল জোড়া কারণ
আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব জুড়ে দেখা দিতে পারে চরম খাদ্যসঙ্কট। এই মর্মে এ বার গোটা দুনিয়াকে সতর্ক করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। কিন্তু কেন?
দুনিয়া জুড়ে দেখা দেবে ভয়ঙ্কর খাদ্যসঙ্কট! দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটাতে হিমসিম খেতে পারে বিশ্বের বহু দেশ। শুধু তা-ই নয়, আধপেটা খেয়ে বা অনাহারে দিন কাটতে পারে কয়েক কোটি মানুষের। ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যন জয়শঙ্করের এ-হেন সতর্কবার্তায় পড়ে গিয়েছে হইচই। তাঁর দেওয়া সঙ্কটের পূর্বাভাসকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল।
সম্প্রতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের ‘এশিয়া সোসাইটি’তে ভাষণ দেন জয়শঙ্কর। সেখানেই সম্ভাব্য খাদ্যসঙ্কট নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেন তিনি। এই সঙ্কটের কারণ হিসেবে বেশ কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এবং সংঘাতকে কেন্দ্র করে সার সরবরাহে সমস্যা এবং এল নিনোর প্রভাব অন্যতম।
‘এশিয়া সোসাইটি’র অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, ‘‘যখন কোনও সংঘর্ষ বা জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখনই যাবতীয় সম্পদ দ্রুত গতিতে পশ্চিমি দুনিয়ার দিকে ছুটতে শুরু করে। এতে সর্বাধিক বঞ্চিত হয় দক্ষিণ গোলার্ধ। বর্তমানে সেই ছবিই দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি, খাদ্য, সার ও অর্থনীতি, সব দিক দিয়ে মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর দক্ষিণাঞ্চল।’’
জয়শঙ্করের এই অভিযোগ ফেলে দেওয়ার নয়। এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নিয়ে ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে দুনিয়ার তাবড় হাওয়া অফিস। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্পিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা এনওএএ-র কথা বলা যেতে পারে। এল নিনো ক্রমাগত শক্তি বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।
এনওএএ-র দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরে (পড়ুন, ২০২৬-’২৭) উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীতকালের আবহাওয়ায় আমূল পরিবর্তন আসার ৯০ শতাংশ আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বাড়তে পারে পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা। এর প্রভাব যে আশপাশের দেশগুলির উপরে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
আরও পড়ুন:
মার্কিন সমুদ্র-বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এল নিনোর সর্বাধিক প্রভাব দেখবে বিশ্ব। সেই সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া পূর্ববর্তী এল নিনোগুলির চেয়ে এ বারের প্রভাব অনেক বেশি হতে চলেছে। আগামী বছরের (পড়ুন, ২০২৭ সাল) মার্চ পর্যন্ত সেটা স্থায়ী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আবহবিদদের দাবি, এশিয়ায় রবি শস্য রোপন, অস্ট্রেলিয়ায় ফসল কাটা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ভুট্টা চাষের সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছোবে এল নিনো। এর জেরে মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হতে পারে কৃষিপণ্যের উৎপাদন। সেই ধাক্কা ইতিমধ্যেই লেগেছে ভারতের গায়ে। এ বছর দেশ জুড়ে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮৭ শতাংশ।
চলতি বছরের জুনে এ দেশে বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৯.৫ মিলিমিটার, যেটা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে, এ বার ১৯০১ সালের পর ১৩তম সর্বনিম্ন এবং ২০০১ সালের পর চতুর্থ সর্বনিম্ন বর্ষা দেখল ভারত। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে ২৪ শতাংশ। দেশের ৩৬টি হাওয়া অফিসের ১৭টিতেই নথিবদ্ধ হয়েছে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি। এর জেরে চলতি অর্থবর্ষে (পড়ুন, ২০২৬-’২৭) খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে সরকার। কারণ, রবিশস্যের চাষ আংশিক ভাবে জমে থাকা জলের উপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন:
ভারতে অবশ্য তার পরেও খাদ্যসঙ্কট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা কম। কারণ, বিপুল পরিমাণে খাবার মজুত রেখেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এফসিআই)। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ১ জুলাই পর্যন্ত গুদামে থাকা চালের পরিমাণ ৪.০৩ কোটি টন। এ ছাড়া, ৩.৮৭ কোটি টন বীজধানও হাতে রেখেছিল তারা। যদিও সেটা মুদ্রাস্ফীতির চাপ আটকানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
এফসিআইয়ের কাছে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও খুচরো বাজারে উচ্চ মানের চালের দাম বেড়েছে। সরকারি গুদামে অবশ্য বেশি করে সাধারণ মানের চালই রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধান উৎপাদন কমতে পারে দুই থেকে আট শতাংশ। সে ক্ষেত্রে তাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলি চাল রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি কম বৃষ্টিপাত দেখেছে তাইল্যান্ড। খরার কারণে কম্বোডিয়ায় এক লক্ষ হেক্টরের বেশি জমির ধানচাষ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া, ফিলিপিন্সের চাল উৎপাদন কমে ১.২২ কোটি টনে পৌঁছোবে বলে জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দফতর। ফলে তাদের আমদানি বেড়ে ৫২ লক্ষ টনে পৌঁছোনোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়াও একটি আমদানিনির্ভর দেশ। বিশেষজ্ঞদের কথায়, সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা খেলে এশিয়ার ভারসাম্যকে সঙ্কুচিত করতে পারে জাকার্তা। ধানের পাশাপাশি ডিসেম্বর পর্যন্ত হওয়া ভুট্টাচাষও এল নিনোর জন্য হুমকির মুখে পড়েছে। ২০১৫-’১৬ আর্থিক বছরে প্রায় একই রকম পরিস্থিতির জেরে খাদ্যসঙ্কটের মুখে পড়েন চার কোটি মানুষ। সে বার জ়িম্বাবোয়ে এবং মালাউইতে ভুট্টার ফলন অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল।
বিশ্বব্যাঙ্ক ইতিমধ্যেই পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলির খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। দু’বেলা পেট ভরে খাবার না-ও পেতে পারেন সেখানকার ৬.৭ কোটি মানুষ। ইতিমধ্যেই সুদানের ১৪টি এলাকা দুর্ভিক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এ বছর ভুট্টার ফলন হয়েছে ১.৭৪ কোটি টন। এই পরিসংখ্যান অবশ্য স্বস্তির।
রাষ্ট্রপুঞ্জের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এল নিনোর কারণে তীব্র ক্ষুধার কবলে পড়তে পারেন প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অন্য দিকে, খাদ্যসঙ্কটের কারণ হিসাবে আরও একটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন জয়শঙ্কর। সেটা হল, সার সরবরাহে ঘাটতি। রাশিয়া-ইউক্রেন এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জন্য সেটা মারাত্মক ভাবে কম গিয়েছে। এতে ফসলের উৎপাদনে বড় রকমের ধাক্কা খেতে চলেছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
পশ্চিম এশিয়ায় লড়াইয়ের কারণে বন্ধ রয়েছে সমুদ্র-বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হরমুজ় প্রণালী। সেখান দিয়ে প্রায় এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া, ২০ শতাংশ অ্যামোনিয়া এবং ২০ শতাংশ ফসফেট বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ হয়ে থাকে। এ ছাড়া, রাশিয়ার থেকেও বিপুল পরিমাণে সার আমদানি করে ভারত। কৃষ্ণ সাগরে লড়াইয়ের কারণে সেটাও বর্তমানে যথেষ্ট কমে গিয়েছে।
হরমুজ় বন্ধ হতেই হু-হু করে বাড়তে থাকে ইউরিয়ার দাম। এপ্রিলে সেটা টনপ্রতি ৮৫০ ডলারে গিয়ে পৌঁছোয়। ফেব্রুয়ারির নিরিখে সংশ্লিষ্ট সারটির ৮০ শতাংশ চড়েছে দর। ২০২২ সালের পর কখনওই ইউরিয়ার এতটা মূল্যবৃদ্ধি দেখতে পাওয়া যায়নি। একই ভাবে ২৫-৩০ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ফসফেটের দাম। রুশ সারের আমদানি বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে দিল্লি।
এল নিনোর প্রভাবে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালে চাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ভারত। পরে একই রাস্তায় হাঁটতে দেখা যায় মায়ানমার, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম এবং তাইল্যান্ডের মতো দেশগুলিকেও। ফলে বিশ্ববাজারে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় চালের দাম। সেই পরিস্থিতি এ বছর ফিরতে পারে বলে সতর্ক করেছে পর্যবেক্ষক মহল।
রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজ়েশন’ (এফএও)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, খাদ্যে স্বয়ংম্পূর্ণতা রয়েছে ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের মতো হাতেগোনা কয়েকটি দেশের। ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে পাকিস্তান, আফগানিস্তান-সহ পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার একাধিক দেশ। তা ছাড়া, যুদ্ধের কারণে গত কয়েক মাসে প্রবল ভাবে বেড়ে গিয়েছে খনিজ তেলের দাম। এতে খাদ্যশস্যের পরিবহণ খরচও যে বাড়তে চলেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে খাদ্যসঙ্কটের কথা বলে প্রকারান্তরে যুদ্ধ থামানোর বার্তা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রই তাকিয়ে আছে ভারত, তাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের দিকে। শেষ পর্যন্ত এরা চাল-গমের রফতানিতে কোনও রাশ টানে কি না, সেটাই এখন দেখার।