ছোট হয়ে যাবে কাজিরাঙা, তৈরি হবে বিলাসবহুল হোটেল! ক্ষতি কার? নির্মাণ নিয়ে কেন তুঙ্গে বিতর্ক?
বিচার বিভাগীয় হেফাজতে অসমের আদিবাসী অধিকার কর্মী প্রণব দোলে। কাজিরাঙার আদিবাসী পরিবারগুলি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের জন্য পৈতৃক জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবেন তাঁরা।
অন্ধকার সবে পাতলা হয়েছে। ফুটছে ভোরের আলো। সেই নরম আলোর সঙ্গে সঙ্গেই উঁচু তৃণভূমির উপর দিয়ে উঠতে থাকে কুয়াশা। জলাভূমির পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে রাস্তা। তার মাঝেই বন্য প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে আপন মনে ঘুরে বেড়ায় হাতির দল। আর ঘাসের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে একশৃঙ্গ গন্ডার।
বিকেল হলে এই দৃশ্যই বদলে যায় সাফারির পথে। সেখানে দেখা মেলে বুনো মহিষ, হরিণ এবং হাতির। ভারতের অন্যতম বিখ্যাত এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল। কাজিরাঙা— ভারতের আদিম প্রাকৃতিক স্থানগুলির মধ্যে একটি। এই জাতীয় অরণ্যটি অসমের গোলাঘাট এবং নগাঁও জেলা জুড়ে বিস্তৃত। নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এই অরণ্যটি ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এও জায়গা করে নিয়েছে।
কিন্তু, কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের সীমানার বাইরে আরও একটি বিতর্ক দানা বাঁধছে। কাজিরাঙার সংরক্ষিত ভূখণ্ড এবং তাকে ঘিরে থাকা শহর, বাড়িঘর এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কতটা জায়গা রাখা উচিত? কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের বাফার জ়োন সঙ্কোচনে বিতর্ক কেন? এতে ক্ষতি কার? লাভবানই বা হবে কারা?
অসমের বিজেপি সরকারের প্রস্তাব, ১০ কিলোমিটার নয়, ‘ইকো সেনসিটিভ জ়োন’-এর (ইএসজ়েড) পরিধি হবে ১-৩ কিলোমিটার। কমিয়ে আনা হবে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের ইকো সেনসিটিভ জ়োনের পরিধি। সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে কংগ্রেস। অভিযোগ, অবৈধ খননে মদত দিচ্ছে সরকার। অভয়ারণ্যের সুরক্ষা বলয়ের দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত হলে ভারসাম্য হারাবে জীববৈচিত্র।
কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের নিকটবর্তী ইংলে পাথারে প্রস্তাবিত হায়াত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অভিযোগে বৃহত্তর কাজিরাঙা ভূমি এবং মানবাধিকার সুরক্ষা কমিটির (জিকেএলএইচআরপিসি) আহ্বায়ক প্রণব দোলেকে গত ১২ জুলাই গ্রেফতার করা হয়। কাজিরাঙাকে ঘিরে চলমান জমি এবং পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আদিবাসী অধিকারকর্মী প্রণবকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ৬০টিরও বেশি সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সংগঠন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকর্মী সংগঠন। দোলে-সহ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ধৃতের মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন:
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জমি এবং পরিবেশ রক্ষা করা কোনও ভাবেই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে না। আদিবাসী, কৃষক এবং পরিবেশকর্মীদের নিজেদের জমি, জীবিকা, বন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার দাবিতে শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার আছে। কাজিরাঙার কাছে প্রস্তাবিত হায়াত রিসর্ট প্রকল্প নিয়েও সংগঠনগুলি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, অসম সরকার ‘হায়াত গ্রুপ অফ হোটেলস’-এর সঙ্গে একটি মউ স্বাক্ষর করে। সেখানে কাজিরাঙার কাছে একটি বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই ঘোষণার পর থেকেই স্থানীয়েরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, প্রকল্পটি কাজিরাঙার ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। হোটেল প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত স্থান ইংলে পাথার স্থানীয়দের কাছে ‘হাতিদের খেলার মাঠ’ হিসাবে পূজনীয়। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের কোহোরা পর্যটনকেন্দ্রর কাছে অবস্থিত এই এলাকাটি ঐতিহ্যগত ভাবে হাতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং চলাচলের পথ হিসাবে কাজ করে আসছে।
কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান এবং ব্যাঘ্র সংরক্ষণকেন্দ্রের চারপাশে থাকা ‘ইকো সেনসিটিভ জ়োন’-এর পরিধি বর্তমানের ১০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ১ থেকে ৩ কিলোমিটারে করার প্রস্তাবকে ঘিরে অসমে রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত বিতর্ক তীব্র হয়েছে। অসম কংগ্রেস এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
২০০৬ সালে বাঘ সংরক্ষণাগার হিসাবে ঘোষিত এই উদ্যানে ১০০টিরও বেশি বাঘ রয়েছে। প্রায় ৪৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত কাজিরাঙা। এর মধ্যে রয়েছে কোহোরা পর্যটনকেন্দ্র। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ২০২৫-’২৬ সালে কাজিরাঙায় ৫,৪৮,০০০-এরও বেশি পর্যটক এসেছিলেন, যার মধ্যে ৩২,০০০-এরও বেশি ছিলেন আন্তর্জাতিক পর্যটক। এর ফলে প্রায় ১১ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানগুলি ওই এলাকায় পর্যটন পরিকাঠামো উন্নয়নে সরকারের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করেছে।
আরও পড়ুন:
সমালোচকদের যুক্তি হল, সংরক্ষিত এলাকা সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে পরিবেশগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ভূমির বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলটি ১০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে মাত্র ১ কিলোমিটার করার সিদ্ধান্তটি বিশেষ ভাবে খতিয়ে দেখার দাবিও করেছেন তাঁরা। তাঁদের মত, এর তাৎক্ষণিক পরিণতি সুস্পষ্ট— একটি বিশাল এলাকা নির্মাণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে, যার বেশির ভাগই সম্ভবত কর্পোরেট গোষ্ঠী, রাজনীতিবিদ বা অন্যান্য প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
জানা গিয়েছে, পশুদের সঙ্গে সহাবস্থান করে আদিবাসী পরিবারগুলি কয়েক দশক ধরে সম্মিলিত ভাবে এই জমিতে চাষ করে আসছেন। ওই এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, তাঁদের কাছে জমির দলিল রয়েছে এবং তাঁরা বছরের পর বছর ধরে জমির পাট্টা বাবদ রাজস্ব দিয়ে আসছেন। কাজিরাঙার আদিবাসী পরিবারগুলি জানিয়েছে, ২০২৩ সালে সরকার রাজস্ব আদায় বন্ধ করে দেয়। তার পরে তাঁরা জানতে পারেন, একটি প্রস্তাবিত বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্পের জন্য জমিটি ‘অসম ট্যুরিজ়ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এটিডিসি)’-কে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ প্রথমে শূকর খামারের কথা বলে জমিটি দখল করেছিলেন। পরে বাসিন্দারা জানতে পারেন যে, জমিটি আসলে একটি বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তাঁরা আরও জানান, এর পর মাঠের মাঝখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয় এবং পুলিশের পাহারায় নির্মাণকাজ শুরু হয়।
হোটেল প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের শিকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রতিবাদরত গীতা গোয়ালা প্রশ্ন তোলেন, “হোটেলটি তৈরি হয়ে গেলে ওরা নিজেদের লোক নিয়ে আসবে। সাফারির জন্য নিজেদের গাড়ি নিয়ে আসবে। ওরা আমাদের গাড়ি ব্যবহার করবে না বা কোনও স্থানীয় চালককে কাজ দেবে না। এতে আমাদের লাভ কোথায়?” তিনি বলেন, “আপনারা যদি বিলাসবহুল হোটেল বানাতে চান, তবে তা আপনাদের নিজেদের জমিতে বানান, আমাদের জমিতে নয়। আমরা আপনাদের এই জমি দেব না।”
কংগ্রেসের অভিযোগ, ইএসজ়েডের পরিধি কমানো হলে কাজিরাঙার পরিবেশগত সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে, ফলে অপরিকল্পিত নির্মাণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বিভাজন এবং বনভূমিতে মানুষের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাজিরাঙার চারপাশে পর্যাপ্ত পরিবেশগত সুরক্ষা বজায় রাখার জন্য অসম সরকারকে প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস।
অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা ইএসজ়েড কমানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করে বলেন, “কাজিরাঙার আশপাশে বসবাসকারীদের দীর্ঘ দিনের সমস্যা এবং উদ্বেগের কথা বিবেচনা করেই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে। বোকাখাত এবং কলিয়াবরের বাসিন্দারা দীর্ঘ দিন ধরে বিস্তৃত ইএসজ়েডের কারণে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সমস্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন এবং এই বিষয়টি নিয়ে তাঁরাই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে হোটেল এবং রিসর্টের মতো কার্যকলাপ কেবল কঠোর নিয়ম মেনেই সম্ভব। তাঁরা বলছেন, সরকার কাজিরাঙার কাছে একটি আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণের কথাও বিবেচনা করছে। এত বড় একটি প্রকল্পের ফলে যানজট, কোলাহল এবং নির্মাণকাজও আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। কাজিরাঙার জলাভূমি এলাকায় অবৈধ খনির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের নিয়মাবলিও সরকারকে মেনে চলতে হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
তা ছাড়া, কাজিরাঙার আরও একটি বড় সমস্যা হল বন্যা। প্রতি বছর বন্যার কারণে পশুরা উঁচু ভূমির দিকে যেতে বাধ্য হয়। রাস্তা পার হওয়ার সময় তাদের মধ্যে কেউ কেউ যানবাহনের ধাক্কায় মারা যায়। এ বার ওই জাতীয় উদ্যানের চারপাশে আরও রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, ঝলমলে আলো, কোলাহল এবং মানুষ জড়ো হলে পশুদের চলাচলের জন্য নিরাপদ জায়গা ক্রমশ কমে আসবে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে।
খবরে প্রকাশ, পর্যটন ইতিমধ্যেই ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র ১০ বছরে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১.৩ লক্ষ থেকে বেড়ে ৪.১ লক্ষ হয়েছে। পর্যটন মানুষকে বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জানতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত পর্যটক এবং অত্যধিক নির্মাণকাজ সেই সব প্রাণীরও ক্ষতি করতে পারে, যাদের দেখতে তাঁরা আসছেন। কাজিরাঙায় পশুদের আবাসস্থলের ঠিক পাশেই সুইমিং পুল, বিলাসবহুল রিসর্ট, চার লেনের রাস্তা আর কোলাহলপূর্ণ নির্মাণকাজের কোনও প্রয়োজন নেই বলেও দাবি করছেন স্থানীয়, আদিবাসী এবং আন্দোলনকারীরা। তাঁরা বলেন, “আমরা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কাজিরাঙাকে রক্ষা করে এসেছি। এখন এর বন্যপ্রাণীদের আরও ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর জায়গায় ঠেসে ফেলা আমাদের উচিত নয়। কাজিরাঙাকে শ্বাস নিতে দিন।”