কোন কোন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘দাদাগিরি’ চলে না? কোন ডিগ্রি ‘নিরাপদ’? কী বলছে এআই-এর প্রভাব-তালিকা?
আমেরিকার একটি নতুন গবেষণায় কলেজ পর্যায়ের বিভিন্ন বিষয়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাবের মাত্রার ভিত্তিতে ১০টি স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে সদ্য পা রাখা স্নাতকদের কাছে এআই-এর এই প্রভাব-তালিকার অর্থ কী? তা নিয়েই আলোচনা করা হল এই প্রতিবেদনে।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বা স্নাতক স্তরের পড়াশোনা চলাকালীন, কর্মজীবনে প্রবেশের ঠিক আগে চাকরির বাজার নিয়ে নানা প্রশ্ন ভিড় করে আসে। তার মধ্যে অন্যতম— কোন পেশায় ভাল আয় হবে? কিন্তু, দিন বদলেছে। এখন আর এই চিরাচরিত প্রশ্ন নয়। বরং অন্য একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেককে। আর সেটি হল, সাধারণ স্নাতক হওয়ার পর আদৌ কি কোনও চাকরির সুযোগ থাকবে?
সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর গবেষণা প্রকাশ পেতে এমনই প্রশ্ন করছেন পড়ুয়া থেকে নতুন চাকরিপ্রার্থীরা। চাকরির বাজারে উদ্বেগ দানা বাঁধছে নতুন করে। এই সমস্ত কিছুরই নেপথ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব। খবর, জেনারেটিভ এআই-এর দ্রুত বিস্তার শিক্ষানবিশ স্তরের চাকরিগুলির উপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এর ফলে অনেক কলেজপড়ুয়া এবং সদ্য স্নাতক হওয়া চাকরিপ্রার্থীরা ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে নিজেদের ভিন্ন ভাবে তুলে ধরার উপায় খুঁজছেন। সম্প্রতি ‘ইউএস সেনসাস ব্যুরো’র একটি নতুন ‘ওয়ার্কিং পেপারে’ চলতি বছরে সে দেশের কলেজগুলির বিভিন্ন বিষয় এবং তার সঙ্গে যুক্ত পেশার উপর এআই-এর প্রভাব কতটা, তার ভিত্তিতে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এআই-চালিত স্ক্রিনিং টুলের ব্যবহারের ফলে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পাওয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। সদ্য পাশ করা স্নাতকেরা একটি কঠিন কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন, যেখানে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি এবং নিজস্ব পরিসরে উচ্চ বেতনের চাকরি খুঁজে পাওয়াও কঠিন।
কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও এখন এআই-এর ব্যবহার ক্রমশ সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নিয়োগকারীরা আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করতেও সেটি ব্যবহার করছেন। এ দিকে, চাহিদা বাড়ছে এআই-এর দক্ষতাসম্পন্ন প্রার্থীরও। যদিও লিঙ্কড্ইনের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আরও বেশি সংখ্যক পড়ুয়া এই দক্ষতার উপর জোর দিচ্ছেন। অবশ্য তরুণ প্রজন্মের অনেকেই চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার এবং এটিকে একটি প্রয়োজনীয় কর্মদক্ষতা হিসেবে শেখার ব্যাপারে এখনও অনীহা প্রকাশ করছেন বলেও জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
‘ইউএস সেনসাস ওয়ার্কিং পেপার’-এর গবেষণা অনুযায়ী, এআই-এর প্রভাব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কর্মী প্রতিস্থাপন করা যায় এমন পেশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার সায়েন্স, অ্যাকাউন্টিং, জার্নালিজ়ম এবং বেশ কয়েকটি ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রের মতো বিষয়। এর বিপরীত প্রান্তে আরও একটি বিভাগ রয়েছে যাকে ওই রিপোর্টে লেভেল ১ এবং ২ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
দাবি, সমীক্ষায় তালিকাভুক্ত মোট ২৬টি বিষয়ের মধ্যে লেভেল ১ এবং লেভেল ২-এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলির উপর এআই-এর প্রভাব সবচেয়ে কম। এগুলির মধ্যে রয়েছে নার্সিং, শিক্ষকতা, থেরাপি, স্বাস্থ্যসেবা, বনবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা এবং আরও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্র।
তবে, এর মানে এই নয় যে, এই বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পেশাগুলি এআই-এর প্রভাব ঠেকাতে পারে বা এই পেশায় শুরুতেই বেশ মোটা মাইনের সম্ভাবনা থাকে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, এর সহজ অর্থ হল, এই নির্দিষ্ট গবেষণা করার সময়ে এই বিষয়গুলির সঙ্গে যুক্ত পেশায় এআই-এর প্রভাব সর্বনিম্ন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে কম প্রভাব রয়েছে এমন বিভাগে ন’টি বিষয় রয়েছে। বিষয়গুলি হল— নার্সিং, থেরাপি, প্রাথমিক ও প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষাদান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের একাধিক স্তর, চিকিৎসা প্রযুক্তি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষকতা, শিক্ষা প্রশাসন ও তত্ত্বাবধান, চিকিৎসা সহায়তা পরিষেবা। এর মধ্যে সমীক্ষার ২০১৮ থেকে ২২ সালের তথ্য অনুযায়ী নার্সিং থেকে সর্বাধিক সংখ্যক স্নাতক পাওয়া গিয়েছে। গবেষণাপত্রটি এই বিষয়গুলিকে ‘জিপিটি-৪ বিটা এক্সপোজ়ার ডেসাইল ১’-এ অর্থাৎ এর সর্বনিম্ন ‘এক্সপোজ়ার গ্রুপে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আরও পড়ুন:
লেভেল ২-এ স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষকতা থেকে শুরু করে প্রাণিবিদ্যা, বনবিদ্যা এবং প্রাণীবিজ্ঞান পর্যন্ত আরও ১৭টি ক্ষেত্র যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়গুলি হল— সাধারণ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা, বাস্তুবিদ্যা, ফৌজদারি বিচার এবং অগ্নি সুরক্ষা, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিল্পকলা এবং সঙ্গীতশিক্ষা, পরিবহণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গণিতের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ভাষা এবং নাটক, ফিটনেস প্রশিক্ষণ, অরণ্য সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণ, প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং কৃষিবিদ্যা। গবেষণাপত্রটি এই ক্ষেত্রগুলিকে ‘জিপিটি-৪ বিটা এক্সপোজ়ার ডেসাইল ২’-এর অন্তর্ভুক্ত করে।
গবেষণাপত্রটির ২০১৮-২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, নার্সিংয়ের পেশাটি সর্বনিম্ন ‘এআই এক্সপোজ়ার ক্যাটাগরি’তে রয়েছে। এই কাজের মধ্যে রয়েছে সরাসরি রোগীর সেবা, শারীরিক পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ এবং পরিবর্তনশীল ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
জানানো হয়েছে, এর অর্থ এমনটা নয় যে নার্সিং পেশা এআই-এর প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কিন্তু, এই গবেষণায় পেশাটির ঝুঁকির মাত্রা সর্বনিম্নগুলির মধ্যে অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, “বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবায় নার্স বা সেবিকারাই বৃহত্তম পেশা-গোষ্ঠী এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ।”
গবেষণা রিপোর্টে লেভেল ১ এবং ২-এর বেশির ভাগ অংশ জুড়েই শিক্ষা-সম্পর্কিত বিষয়গুলির প্রাধান্য রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন পড়ুয়াদের শিক্ষাদান, শিশুশিক্ষা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের একাধিক ক্ষেত্র সর্বনিম্ন ‘এআই এক্সপোজ়ার ক্যাটাগরি’তে স্থান পেয়েছে।
পাঠ-পরিকল্পনা, ওয়ার্কশিট এবং অন্যান্য নোট্স তৈরি করতে পারে এআই। বলে রাখা ভাল, এই শ্রেণিবিন্যাসটি পেশাগত কাজের পরিধির উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ওই গবেষণায়। এআই একজন শিক্ষকের কাজের অংশবিশেষে সহায়তা করতে পারে কি না তার উপর ভিত্তি করে নয়। সর্বনিম্ন দু’টি এক্সপোজ়ার স্তরে নার্সিংয়ের সঙ্গে থেরাপি, মেডিক্যাল টেকনোলজি, মেডিক্যাল অ্যাসিস্টিং এবং সাধারণ স্বাস্থ্য পরিষেবাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভারতের স্বাস্থ্যকর্মী বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৫,২৯৯টি নার্সিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার পেশাদার পা রাখেন চাকরির বাজারে। একইসঙ্গে, আরও বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং আরও বেশি সংখ্যায় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে এমন বিষয়ে স্নাতকদের প্রাথমিক আয় সাম্প্রতিক সময়ে ১৩ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এতে বলা হয়নি যে, লেভেল ১ বা লেভেল ২-এর অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি বিষয়ে স্নাতকেরা বেশি উপার্জন করেন। এই সমীক্ষাটি পরিমাপ করেছে, এআই-এর প্রভাবের ফলে কর্মসংস্থান এবং উপার্জন কী ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সেখানে ডিগ্রির ভিত্তিতে কোনও বেতনক্রম তৈরি হচ্ছে কি না।
আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এই রিপোর্টে প্রকাশিত সমস্ত তথ্যই আমেরিকার স্নাতক এবং সে দেশের শ্রম-বাজারের উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। এগুলি কোনও ভারতীয় র্যাঙ্কিং নয়। গবেষণাটিতে এও বলা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে পরিমাপটি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি প্রযুক্তির ক্ষণস্থায়ী চিত্র।
অন্য দিকে, ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বিতর্কে প্রশ্ন উঠছে, এআই কি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান ধ্বংস করবে? আসলে প্রশ্ন হল, যখন দেশের উন্নতির জন্য লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মীর প্রয়োজন, তখন এআই কি কর্মজীবনের সিঁড়িকে দুর্বল করে দেবে? বিশ্বব্যাঙ্কের মতে, আগামী দুই দশকে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ তরুণ ভারতের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার (আইএমএফ)-এর হিসাব অনুযায়ী, যদি শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছোয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে ১৪ কোটি ৮০ লক্ষ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ মোট ৩২ কোটি ৪০ লক্ষ কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হবে।
জানা যাচ্ছে, ২০১২-২৩ সাল পর্যন্ত ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। পূর্বের প্রযুক্তিগত রূপান্তরগুলি শ্রমিকদের কর্মচ্যুত করলেও অবশেষে নতুন শিল্প এবং পেশার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু শিল্পায়ন ঘটেছিল প্রজন্ম ধরে। বর্তমানে জেনারেটিভ এআই অনেক দ্রুত এবং সরাসরি বিভিন্ন কাজ যেমন লেখা, কোডিং, অনুবাদ, গ্রাহক পরিষেবা, নথি প্রক্রিয়াকরণ এবং গতানুগতিক বিশ্লেষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
দেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রবীণদের পরিচর্যা এবং নার্সিং, রান্না, বেকিং, ডাই বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাদান এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধার— এই ধরনের কাজগুলি মূলত এআই-এর কোপের বাইরে থাকবে। কারণ এগুলি এমন মানবিক সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল যা বর্তমান প্রযুক্তির পক্ষে নকল করা কঠিন। এর মধ্যে রয়েছে সহমর্মিতা এবং আবেগনির্ভর পেশা যেমন, বয়স্ক ও শিশুদের পরিচর্যা, নার্সিং, মানসিক স্বাস্থ্যের পরামর্শ, সমাজকর্ম এবং রোগী কেন্দ্রিক পরিষেবা। এ ছাড়াও রয়েছে, হাতে-কলমে কারিগরি, প্লাম্বিং, ইলেক্ট্রিকাল কাজ, নির্মাণ, মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং কারুশিল্প। সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক সমীক্ষার সুর আশাবাদী হলেও সতর্ক থাকতে হবে। দাবি, চাকরির বাজারে ঝুঁকি তৈরি করলেও, মানবকেন্দ্রিক নীতি এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ধ্বংসের বদলে চাকরি সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।