E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

হন্তারক

মা আর আমার তখন ছোট্ট সংসার। আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। বাবার মৃত্যুতে সংসারে অভাব আসেনি, শূন্যতা এসেছিল।

শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৫৩
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

এইমাত্র আমি একটা খুন করেছি। জীবনের প্রথম খুন। খুনটা খুব আবশ্যক ছিল। তবে বিশ্বাস করুন, আমি কিন্তু কোনও প্রতিশোধ বা ঘৃণার জন্য খুনটা করিনি। আমি খুন করেছি ভালবেসে। খুন করার ক্লান্তি আমাকে গ্রাস করছে। এই সময় এক কাপ চা অথবা কফির খুব দরকার ছিল। চা-কফি আমি নিজেও করে নিতে পারি। কিন্তু করতে ইচ্ছে করছে না। আমার স্ত্রী আমাকে চা দিতেই পারত, ও দেবে না। গভীর ক্লান্তি আর অবসাদ মেখে, ও ঘুমিয়েআছে। ও কি বুঝতে পারল, আমি ওকে খুন করলাম!

আমার স্ত্রী সায়নী, ভীষণ ভাল মানুষ। আমার ছত্রিশ বছরের জীবনে ওর মতো মানুষ খুব কমই দেখেছি। আমাদের বিয়ে হয়েছিল সম্বন্ধ করে। কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে আমার মা সায়নীর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে। সে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগেকার কথা।

মা আর আমার তখন ছোট্ট সংসার। আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। বাবার মৃত্যুতে সংসারে অভাব আসেনি, শূন্যতা এসেছিল। বাবার রেখে যাওয়া অর্থ, আমাদের নিশ্চয়তা দিয়েছিল, অস্বীকার করার উপায় নেই। আমিও সেই নিশ্চয়তা এবং মেধা সম্বল করে একের পর এক সাফল্যের হার্ডল টপকে গেছি। ইঞ্জিনিয়ার হয়ে, দামি চাকরি পেয়ে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছি। এবং তারই দৌলতে, আহিরীটোলার শরিকি বাড়ি থেকে নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে আরামের জীবন। মা শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করতে চায়নি। আমার বাস্তববাদী মাকে, সেই প্রথম খুব আবেগপ্রবণ মনে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার জেদের কাছে তাকে হার মানতে হয়।

সায়নীর বাড়ি হাওড়া ময়দানের কাছে। বাবা-মা-মেয়ের ছোট্ট ছিমছাম গোছানো সংসার। বাবা রেলের চাকুরে, মা গৃহবধূ। সায়নী ইংরেজি নিয়ে এম এ পাশ করে একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করত। বিয়ের আগেই সে চাকরি ছেড়ে দেয়।

সায়নীর বাবা-মা আমাকে এক বার দেখেই পছন্দ করেছিলেন। তবে সায়নীর উত্তর এসেছিল বেশ কিছু দিন পর।

এক দিন বিকেলে আমার কাছে মেসেজ এসেছিল, “আমি অপেক্ষা করতাম এক রাজকুমারের। এ কথা বললে যে কোনও মানুষ আমাকে পাগল ভাববে। তা ভাবুক। তোমাকে দেখে মনে হল, এর পর থেকে আমার অপেক্ষার রূপ বদলে যাবে। আমি সারা দিনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অপেক্ষা করব তোমার। ভাবব, কখন ফিরবে তুমি।”

আমরা স্বীকার করি অথবা না করি, সবাই বোধহয় মনে মনে এক জন অপেক্ষা করার মানুষ খুঁজি। এক বসন্তসন্ধ্যায়, আমার আর সায়নীর বিয়ে হয়েছিল।

মায়ের সঙ্গে সায়নীর খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কিন্তু সে সুখ দু’জনের কপালেই বেশি দিন স্থায়ী হল না।আমাদের বিয়ের দেড় বছরের মাথায় মা চলে গেলেন। আচমকা সেরিব্রাল অ্যাটাক, আধঘণ্টাও সময় দেননি। নিউ টাউনের বারোশো স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে তার পর থেকে আমি আর সায়নী। তিন বছরেও আমাদের সন্তান আসেনি। ডাক্তার দেখিয়েছি। লম্বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ডাক্তার বলেছিলেন, আমরা দু’জনেই সুস্থ, স্বাভাবিক। ঈশ্বরের কৃপা যে কোনও সময় আসতে পারে। কী অদ্ভুত এ জীবন! ঈশ্বরকৃপা থেকে এখনও বঞ্চিত হয়েই রয়ে গেলাম।

সারা দিন ফ্ল্যাটে একাই থাকে সায়নী। মনে হত, ওর কেমন করে সারাটা দিন কাটে এই চার দেওয়ালের মধ্যে! আমি প্রায়ই ওকে বলতাম, “একটা চাকরিতে জয়েন করো। অথবা যদি কোনও বিজ়নেস করতে চাও, করতে পারো।”

সায়নী খুব অবাক হয়ে বলে উঠত, “আমার চাকরি করার কি খুব দরকার আছে? থাকলে অবশ্যই আমি চাকরি খুঁজব।”

আমি বলেছিলাম, “সংসারের দরকার, অথবা আমার দরকার, সে কথা এক বারও বলিনি। আমি তোমার জন্যই বলছি।”

সায়নী জিজ্ঞেস করেছিল, “আমার জন্য! কিন্তু কেন?”

বলেছিলাম, “এই যে সারা দিন একা একা বাড়িতে থাকো। তোমার খারাপ কিংবা একঘেয়ে লাগতে পারে ভেবেই বললাম।”

ও বলেছিল, “খারাপ লাগবে কেন? সারা দিন কী ভাবে যে কেটে যায়, টেরই পাই না।”

“কী করো সারাটা দিন?”

“সংসারের কত রকম কাজ থাকে সে সব কি তুমি জানো মশাই! টুকিটাকি কাজকম্ম করতে করতেই কত সময় কেটে যায়। ঘরের ডেকোরেশনের সামান্য অদলবদল করলে, তোমার ভাল লাগে। সেটাও করি। আর যেই দিনের আলো নিভু-নিভু হতে থাকে, আমি অপেক্ষা করতে থাকি। সারা দিন কাজের ফাঁকে যে অপেক্ষায় ফাঁকি থেকে যায়, বিকেল থেকে সে অপেক্ষায় আমার সন্ধ্যা নেমে আসে। রাত হয়ে যায়।”

সায়নী আর আমার জন্য অপেক্ষা করবে না। এটা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু আমি জানি, সায়নীর সব অপেক্ষা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এবং সেটার জন্য এক পাগলি দায়ী।

রিজিয়া আমাদের অফিসের নতুন রিক্রুট। ওর ইমিডিয়েট বস আমি। যদিও বস কথাটা উপর উপর শুনতে ভাল লাগে, আদপে সবই এক গোয়ালের গরু। রিজিয়া আমার দেখা এ পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক মানুষ। সায়নী যদি গাছের ছায়া হয়, রিজিয়া তা হলে কালবৈশাখী। কোনও কাজ নিয়ে হয়তো গলদঘর্ম হয়ে আছি। হঠাৎ আমার কেবিনে ঢুকে পড়ত রিজিয়া। হাতে ধোঁয়া-ওঠা কফির মগ।

কপট রাগ দেখিয়ে বলত, “এমন গোমড়াথোরিয়াম হয়ে কাজ করেন কী করে? কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান গাইবেন। দেখবেন, কাজে মন বসবে।”

আমি ওর কথার কোনও উত্তর না দিয়ে অল্প হাসতাম।

আবার আচমকা ও বলে উঠত, “আচ্ছা, আপনি ‘আবোল তাবোল’ পড়েছেন? ওখান থেকে একটা কবিতা বলুন তো শুনি।”

কোন ছেলেবেলায় পড়া ‘আবোল তাবোল’ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। নিজেকেই অবাক করে আবৃত্তি করে উঠতাম, “আয় রে ভোলা, খেয়াল খোলা/ স্বপন দোলা নাচিয়ে আয়…”

বিভোর হয়ে শুনত রিজিয়া। সেই পাঁচ-দশ মিনিটের হাসিঠাট্টা আমাকে রিফ্রেশ করে দিয়ে যেত।

কথাটা এক দিন কফি শপে বসে রিজিয়াকে বলেওছিলাম। উত্তরে রিজিয়া মৃদুস্বরে বলেছিল, “আমি বোধহয় আপনার জীবনটা তছনছ করে ফেললাম। কিন্তু সত্যি আমি এমনটা চাইনি।”

“আমি কি তোমাকে এমন কিছু বলেছি রিজি! কেন এমন বলছ?”

“আপনি সায়নীদিকে খুব ভালবাসেন, টের পাই। কিন্তু আমিও যে আপনাকে ছাড়তে পারছি না! আপনার কাছ থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবলেই আমার পায়ের নীচের মাটি কেঁপে ওঠে।”

বলেছিলাম, “মুখ ফেরানোর কথা উঠছে কেন?”

ও বলেছিল, “তা হলে এ সম্পর্কের পরিণতি কী? আপনি আমার সঙ্গে থেকে অপরাধবোধে ভুগবেন! আর আমিও জ্বলব!”

এর উত্তর হয় না। সত্যি, এ সম্পর্কের পরিণতি কী? সায়নীকে ত্যাগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আবার রিজিয়াকে ছাড়া আমার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব।

রিজিয়ার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল এক কালবৈশাখীর দিনে। তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা, অফিস থেকে বেরিয়ে বুঝতে পারি, শহরের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। আমাদের সতেরো তলার অফিসে বসে তা টের পাইনি। গাড়ি নিয়ে সেক্টর ফাইভ কলেজ মোড়ের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে লক্ষ করি, রিজিয়া গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। ঝড়ের রাতে গাড়ি পেতে অসুবিধে হবে সন্দেহ নেই।

আমি গাড়ি সাইড করে ওর কাছে গিয়ে বলি, “মিস বর্মণ, আপনি আমার গাড়িতে চলে আসুন।”

“না না, স্যর। আমি ঠিক আছি। একটু দাঁড়ালেই গাড়ি চলে আসবে। না হলে অ্যাপ-ক্যাব ডেকে নেব।”

“রাস্তা দেখে আপনার মনে হচ্ছে, খুব সহজেই অন্য দিনের মতো গাড়ি পাবেন? ক্যাব কত টাকা চাইবে, তার কোনও আন্দাজ আছে আপনার? রাত বাড়ছে, অহেতুক সময় নষ্ট করবেন না। চলে আসুন...”

রিজিয়াও কী মনে করে গুটিগুটি পায়ে আমার গাড়িতে এসে বসেছিল। গাড়ি স্টার্ট করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাকে কোথায় নামালে সুবিধে হয়?”

ও বলেছিল, “কসবা পোস্ট অফিসের সামনে। পোস্ট অফিসের পাশের গলিতেই আমার বাড়ি। আপনি কি ওই দিকেই থাকেন?”

“না। আমার বাড়ি নিউ টাউনে।”

“এ হে! তা হলে তো আপনার একেবারে উল্টো রাস্তা। আপনার খুব দেরি হয়ে যাবে বাড়ি পৌঁছতে!”

“তা কেন হবে? গাড়িতে যেতে খুব বেশি সময় নষ্ট হবে না। শুধু...”

“শুধু কী, স্যর?”

“কিছু না। আজ সায়নীর অপেক্ষা আর একটু দীর্ঘতর হবে।”

রিজিয়ার সঙ্গে সেই কথা বলার শুরু। কথা বলতে বলতে, কথা শুনতে শুনতে কবে যে আমার ‘আপনি’ সম্বোধন সরে ‘তুমি’ শুরু হয়ে গেল, আজ আর মনে নেই। অফিসের হাজার কাজের চাপের মধ্যে একমাত্র মরূদ্যান ছিল রিজিয়া। অফিস থেকে বেরিয়ে মাঝে মাঝে গাড়ি নিয়ে আমরা অনর্থক এ দিক-ও দিক ঘুরতাম। বাড়ি ফিরতে রোজই দেরি হচ্ছিল।

সায়নীর অবশ্য তাতেও কোনও অভিযোগ ছিল না। শুধু আগে আমি বাড়ি ফেরার পর, আমার কাছে-কাছে থাকত। কখনও ওকে গলা তুলে ডাকতে হয়নি। এই বার সেটা বদলে গেল। নিজের কর্তব্যটুকু করেই সায়নী আর আমার সামনে নেই। গলা তুলে ডাকলেও সাড়া পেতাম না।

জানতাম, ওর প্রিয় জায়গা আমাদের ব্যালকনি। সেখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আটতলায় আমাদের ফ্ল্যাট। আমাদের ব্যালকনি থেকে পরিষ্কার আকাশ দেখা যায়। সায়নী বিভোর হয়ে আকাশ দেখছে। গায়ে হাত দিয়ে ডাকার পর সায়নীর বোধ ফিরত। কিছুটা অপ্রস্তুত সুরে বলে উঠত, “অনেক রাত হয়ে গেছে। খেতে এসো।”

আমার কাছ থেকে কোনও কথা শোনার পরোয়া না করে, ডিনার টেবিল গোছাতে চলে যেত। খাওয়াদাওয়া সেরে শুতে যাওয়ার সময় এক দিন খুব অদ্ভুত সুরে সায়নী আমায় বলেছিল, “তুমি কি আমাকে কিছু বলবে?”

অবাক হয়েছিলাম, “আমি! কেন, কিছু বলার নেই তো।”

“বেশ। যে দিন তোমার মনে হবে, বোলো। আমি শুনব।”

তার পর থেকে রোজ রোজ একই কথা। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যায়। মুখোমুখি অথবা ওয়টস্যাপে এক লাইনের মেসেজ, “তুমি কি আমাকে কিছু বলবে?”

কী করে বোঝাই তোমাকে সায়নী! আমার অনেক, অনেক কিছু বলার ছিল তোমাকে। সব তুমি বুঝতে পারতে কি না জানি না। কিন্তু কষ্ট পেতে। তোমাকে কষ্ট দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

এর কিছু দিন পরেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সেদিনও সেই রাত্রিবেলা। খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা পত্রিকার পাতা উল্টোচ্ছি। সায়নী আমার পাশে শুয়ে আছে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝতে পারছি, বেচারি ঘুমিয়ে পড়েছে। আচমকা আমার ওয়টস্যাপে রিজিয়ার মেসেজ ভেসে ওঠে, “স্যর, ঘুমিয়ে পড়েছেন?”

“না। ঘুমের তোড়জোড় চলছে।”

“এইমাত্র একটা সিনেমা দেখলাম। আর সিনেমাটা দেখতে দেখতে বার বার আপনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।”

“কোন সিনেমা?”

“ইজাজ়ত।”

“সিনেমাটা আমারও খুব প্রিয়। আর গানগুলো অসম্ভব প্রিয়।”

“আপনার মায়া চরিত্রটা কেমন লাগে স্যর?”

“মায়া একদম কবিতার মতো।”

“কী সুন্দর বললেন! জানেন, সিনেমায় এক জায়গায় মহেন্দ্রকে মায়া বলছে, একটা লম্বা শ্বাস ধার দিতে। কারণ তার নিঃশ্বাস বড় ছোট হয়ে যাচ্ছে।”

“হুম, মনে আছে।”

“আমাকে একটা লম্বা শ্বাস ধার দেবেন স্যর? আমি আর আপনাকে জ্বালাতন করব না।”

রিজিয়ার এ পাগলামির কোনও উত্তর আমার জানা নেই। তাড়াতাড়ি ওর সঙ্গে কথা শেষ করি। ফোন রেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলাম।

পরের দিন সকালে সায়নী বলেছিল, “তোমার কিছু বলার নেই, সেটা বুঝতে পারছি। আমার বলার আছে, কোনও সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় নষ্ট করা উচিত নয়। পুরুষের কাছে সেটা কাম্য নয়। তুমি সিদ্ধান্ত নিতে অনর্থক সময় নষ্ট করছ।”

সায়নী আমার মোবাইল ঘেঁটে দেখেনি। এ বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। তা হলে কী করে টের পেয়েছে সায়নী! তেমন করে ভালবাসলে, সত্যি কি এ ভাবে টের পাওয়া যায়! ওকে ত্যাগ করে আমি রিজিয়ার সঙ্গে নতুন করে পথ চলা শুরু করতেই পারি, কিন্তু মন কেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে! কেন বার বার মনে হচ্ছে, সায়নী আর আমার জন্য অপেক্ষা করবে না! আমার আর সায়নীর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে, আবার সায়নীর জীবনে এক জন নতুন মানুষ আসবে। সায়নী তাকে ভালবাসবে। ব্যালকনি থেকে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করবে শুধু তারই জন্য।

এই পর্যন্ত ভাবতে ভাবতে মাথায় আগুন লেগে গেল। অনর্থক হিংসায় আমি পুড়ছিলাম সারা ক্ষণ। সায়নীকে আমি হারাতে পারব না। সেই দিন থেকেই আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম একটা দানবীয় রাত্রির জন্য। রাতেই ভিতরের দানব ঠিকঠাক জেগে ওঠে।

আজ একটু আগেই সেই দানব জেগে উঠেছিল। এখন খুন করার ক্লান্তিতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ঘুমে তলিয়ে যেতে মনে পড়ে যায়, কাল সকালে থানা-পুলিশ, মিডিয়া, আত্মীয়স্বজন, ব্রেকিং নিউজ়, হাজার হাজার প্রশ্ন। আমি উত্তর খোঁজার সময় পাচ্ছি না, ঘুম আমার চেতনা গ্রাস করছে।

সকাল হয়ে গেছে। সায়নী কেন যে জানলার পর্দা টেনে দেয়নি! চোখে আলো পড়ছে। রাতে ঘুম হয়নি ভাল। চোখ জ্বালা করছে, তাকাতে ইচ্ছে করছে না।

সকালে সায়নী চা নিয়ে এলে তবেই চোখ খুলি রোজ। সায়নী এখনও চা আনছে না কেন? আমি চোখ না খুলেই, ঘুম জড়ানো গলায় ডাকতে থাকি, “সায়নী... সায়নী...”

কে যেন এসে দাঁড়াল মাথার কাছে। গরম চায়ের চেনা গন্ধ আসছে নাকে। রোজকার মতোই।

“তোমার চা,” কে বলল? আবারও পরিচিত স্বর বলে উঠল, “চা ঠান্ডা হয়ে যাবে। ওঠো।”

আমি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিতে গিয়েও থমকাই।

ও যে দেখতে পাবে, আমার হাতে রক্তের দাগ!



এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Short Story Short story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy