রামের নামের খিচুড়ি খান কেউ, কেউ বা মেশান দুধ, তেঁতুলও! দেশ জুড়ে ‘অদ্ভুত’ সব খিচুড়ির গল্প
ভারতের নানা রাজ্যে চাল-ডালের মিশেলে তৈরি খিচুড়িরও নানা গল্প আছে। আছে রকমারি নামও। কোথায় কী নামে পরিচিত সেগুলি?
রামের নামেও খিচুড়ি হয়। অযোধ্যা নয়। সেই খিচুড়ি খাওয়া হয় খাস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজ্যে। এমন নামের খিচুড়ির কথা জানা ছিল কি?
খিচুড়ি বলতে চাল এবং ডালের মিশেলই বোঝায়। তাতে বাড়তি স্বাদ-গন্ধ যোগ করে উপযুক্ত ফোড়ন। পশ্চিমবঙ্গে যেমন নিরামিষ-আমিষ খিচুড়ির খাওয়ার চল, তেমনই দেশের নানা রাজ্যে তা খাওয়া হয়।
পশ্চিমবঙ্গে যে খাবার ‘খিচুড়ি’ নামে পরিচিত, কোথাও তার নাম ‘রাম’, কোথাও ‘বিসি বেলে বাত’, কেউ আবার ‘পোঙ্গল’ নামেও চেনেন। নাম ভিন্ন, স্বাদেও রয়েছে বৈচিত্র।
কোথাও চাল-ডালের মিশ্রণে জুড়তে হয় তেঁতুল, কোথাও স্বাদের জন্য দেওয়া হয় গুড়, কোথাও গাট্টে। কোথাও ফোড়নে থাকে গোলমরিচ, কোথাও আবার কারিপাতা। কোথাও তা সম্পূর্ণ নিরামিষ, কোথাও থাকে মাংসের টুকরো।
ভারতের নানা রাজ্যে চাল-ডালের মিশেলে তৈরি খিচুড়িরও নানা গল্প আছে।
আরও পড়ুন:
পশ্চিমবঙ্গে গোবিন্দভোগ চাল, মুগের ডাল এবং ফোড়নের মিশেলে তৈরি খিচুড়ি পুজো-পার্বণে দেবতার কাছে নিবেদন করা হয় বলে একে ভোগের খিচুড়ি বলে। আবার পেঁয়াজ, রসুন, মুসুর ডাল দিয়ে ‘আমিষ’ খিচুড়িও হয়। আর হয় ঝরঝরে ভুনা খিচুড়ি।
উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম, ভারতের সমস্ত রাজ্যেই খিচুড়ি খাওয়ার চল রয়েছে। তারই মধ্যে একটি হল ‘রাম খিচুড়ি’। গুজরাতের কাঠিয়াবাড় জেলায় এমন খিচুড়ি খাওয়ার চল। চাল, মুগ ডাল, সব্জি এবং মশলার মিশেলে তা তৈরি হয়। তবে কেন নামে ‘রাম’, তা স্পষ্ট নয়।
গুজরাতের পাশাপাশি রাজস্থানের জোধপুর, জয়পুরেও রাম খিচুড়ি খাওয়ার চল রয়েছে। তবে সেই খিচুড়ি হয় ঝরঝরে, তাতে ব্যবহার হয় রাজস্থানি গাট্টে (বেসন দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবার)। মুখ্যত সাধারণ আতপচাল দিয়ে খিচুড়ি রান্নার চল থাকলেও, রাজস্থানে সরু চাল ব্যবহার হয় গাট্টে খিচুড়ি বা রাম খিচুড়ি তৈরির জন্য।
রাজস্থানে বাজরার খিচুড়িও জনপ্রিয়। এই রাজ্যে শীতের মরসুমে ঠান্ডা পড়ে জাঁকিয়ে। তখন শরীর গরম রাখার জন্য বাজরার খিচুড়ি খাওয়ার চল। অত্যন্ত সাদামাঠা রান্না। মশলা, ফোড়ন ব্যবহার হয় না।
আরও পড়ুন:
বাজরা পরিষ্কার করে ধুয়ে মোটা খোসা বাদ দিয়ে জলে নুন দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। বাজরাই মুখ্য, তার সঙ্গে সামান্য একটু চাল, ছোলা এবং মুগডালও মিশিয়ে নেন কেউ কেউ। হলুদের ব্যবহার হয় না। উপর থেকে গাওয়া ঘি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
রাজস্থান, গুজরাতের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতেও নানা নামে খিচুড়ি খাওয়া হয়। কর্নাটকে একে বলে ‘বিসি বেলে বাত’। ‘বিসি’ মানে গরম, ‘বেল’-এর অর্থ ডাল, ‘বাথ’ হল ভাত। চাল-ডাল সহযোগে তৈরি জিনিসটি আদতে খিচুড়ি।
বাঙালির খিচুড়ির চেয়ে বিসি বেলে বাত খানিক আলাদা। এটি মশলাদার এবং খানিক টকও। বিসি বেলে বাত তৈরির জন্য দরকার হয় বিশেষ মশলার। গোটা ধনে, জিরে, বেশি করে শুকনো লঙ্কা, শুকনো নারকেল, মেথি, হিং, এলাচ শুকনো খোলায় নাড়িয়ে গুঁড়িয়ে নিতে হয়।
এই রান্নায় রকমারি সব্জির ব্যবহার হয়। তেলে সব্জি, পেঁয়াজ দিয়ে হালকা নাড়িয়েচাড়িয়ে যোগ করা হয় তেঁতুলের ক্বাথ এবং গুঁড়িয়ে নেওয়া মশলা। মশলার সঙ্গে সব্জি ভাল করে মিশিয়ে, কষিয়ে সেদ্ধ করা চাল-ডাল দেওয়া হয়। ব্যবহার হয় চিনে বা কাজুবাদাম।
তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী খাবার পোঙ্গল আদতে পশ্চিমবঙ্গের খিচুড়ির মতোই, তবে স্বাদে কিঞ্চিৎ ভিন্ন। পোঙ্গলে কেউ মেশানও দুধও। আর থাকে গোলমরিচ ফোড়ন। ভিজিয়ে রাখা চাল এবং মুগের ডাল ঘিয়ে হালকা নাড়াচাড়া করে নুন দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হয়। এই পর্যায়ে জলের সঙ্গে অনেকে দুধও মিশিয়ে নেন।
ফোড়নে কারিপাতা, শুকনো লঙ্কার সঙ্গে অতি অবশ্যই দেওয়া হয় কাজুবাদাম এবং গোলমরিচ। অনেকে রসুন, হিংও ফোড়নে জুড়ে নেন। পোঙ্গলে হলুদের ব্যবহার হয় অতি স্বল্পমাত্রায়। কেউ কেউ হলুদ দেনও না। পোঙ্গল হয় গলা ক্রিমের মতো।
অন্ধ্রপ্রদেশে খিচুড়িতে মিশে যায় কিমাও। হায়দরাবাদে একসময় নিজামরা রাজত্ব করেছেন। মোগল বাবুর্চিরা নিরামিষ খিচুড়িতে জুড়ে দেন মাংসের কিমা। হায়দরাবাদে কিমা খিচুড়ি খাওয়ার চল রয়েছে প্রাতরাশে।
খিচুড়ি হলেও এটি অনেকটা বিরিয়ানির মতো। কেউ মাংসের বদলে বিরিয়ানির মতো করে কিমা দিয়ে রান্নাটি করেন। কেউ আবার কিমা আালাদা করে তৈরি করে ঝরঝরে খিচুড়ির সঙ্গে তা খান। সঙ্গে টক সালান খাওয়ারও চল রয়েছে।
কাশ্মীরি খিচুড়িও পশ্চিমবঙ্গের ভুনা খিচুড়ির মতো ঝরঝরে হয়। তবে খিচুড়ি তৈরিতে এখানে ব্যবহার হয় বাসমতী চাল। আমিষ, নিরামিষ, দুই ধরনের খিচুড়িই খাওয়া হয়। আমিষে পাঁঠার মাংস ব্যবহৃত হয়।
কাশ্মীরের খিচুড়ি রান্না হয় সবুজ মুগ দিয়ে। মুগ রাতভর ভিজিয়ে রাখা হয়। প্রেশার কুকারে ঘি গরম করে হিং, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, দারচিনি ফোড়ন দিয়ে মুগ এবং চাল হালকা নাড়াচাড়া করে নুন-হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে নেওয়া হয়। ঝুরঝুরে হয় খিচুড়িটি।
কালো বিউলির ডাল দিয়ে খিচুড়ি খাওয়া হয় গঢ়বাল হিমালয় অঞ্চলে। উত্তরাখণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশ, দুই জায়গাতেই এই ভাবে খিচুড়ি খাওয়া হয়। খোসা-সহ বিউলি ডাল চালের সঙ্গে সেদ্ধ করা হয়। দেওয়া হয় শীতের রকমারি সব্জিও।
এ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আমিষ, নিরামিষ নানা ধরনের খিচুড়ি খাওয়া হয়। খিচুড়ি স্বাস্থ্যকর খাবার। তবে কোথাও চালের বদলে রাগি, বাজরা ব্যবহৃত হয়। উত্তরপ্রদেশে কেউ কেউ খিচুড়িতে আমলকিও দেন।