ধুলোগন্ধি সিন্দুক ঝেড়ে একে একে বারকোশ, পদ্মপাত্র, পাথরবাটি, লোহার কড়াই, ডাবু হাতাটা বার করে নেওয়ার পালা। শিউলি গাছ যখন ভরে আসে, শহরতলিতে দিঘির গায়ে যখন কাশের চামর দোলে, তখনই তো মায়ের আবাহন-পর্ব শুরু। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোয় সে সময়ে পুজোর তোড়জোড়, কত মণ চালের খিচুড়ি হবে, পায়েসের জন্য কত সের বাতাসা আসবে বা কোন বাজার থেকে কী কী মাছ আসবে... তার হিসেব নিয়ে বসে পড়েন গৃহকর্তা-কর্ত্রীরা। বছরকার দিনে মেয়ে আসেন বাপের বাড়িতে, তাঁর যত্নে যেন কোনও ত্রুটি না থাকে!
কন্যারূপে পূজিতা যে দেবী
এ বঙ্গে দুর্গাপুজোর সূত্রধর মনে করা হয় সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের। অবিভক্ত বঙ্গে রাজা কংসনারায়ণ যে পুজোর শুরু করেছিলেন, তার শেকড় এখন বাংলাদেশের তাহেরপুরে। সেই দুর্গা অসুরদলনী রূপে পূজিত হতেন। কিন্তু এ বঙ্গে মা দুর্গার যে পারিবারিক রূপ, তার প্রণেতা রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী। ১৬১০ নাগাদ এই পুজোর শুরু। বড়িশা সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সাঁঝের আটচালা বাড়ির ছেলে পার্থ রায়চৌধুরী বললেন, “চার ছেলেমেয়ে নিয়ে মা দুর্গা যে ভাবে পূজিত হন, সেই রূপে তাঁকে কল্পনা করেছিলেন আমাদের পূর্বসুরি লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী। মায়ের মূর্তির পিছনের চালচিত্র ও তাতে দশমহাবিদ্যার চিত্রপটও তাঁরই চিন্তাভাবনার ফসল। এ বঙ্গে মা যে কন্যারূপে পূজিত হন। বছরকার দিনে তাঁর সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি আসেন। তাই মেয়ের মতোই তাঁর যত্নআত্তি হয়।”
সুজলা-সুফলা বঙ্গদেশে ধানের জোগান বেশি, তাই পুজোর বেশির ভাগ নৈবেদ্য চাল, খই, মুড়কি-নির্ভর। তবে এখানেও একটা ভাগ রয়েছে। এ বঙ্গে দুর্গাপুজো বৈষ্ণব ও শাক্ত দুই মতেই হয়। বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ বাড়িতে ভোগ হয় নিরামিষ আর শাক্তবাড়ির মাছ-মাংস আমিষ দেওয়ার চল রয়েছে। শাক্ত বাড়ির পুজোর ভোগে প্রত্যেক দিন মাছ থাকবে। খালবিল-নদীনালায় পুষ্ট বঙ্গদেশে আগাগোড়াই মাছের পাল্লা ভারী। সারস্বত ব্রাহ্মণদের মধ্যে যেমন মাছ খাওয়ার চল রয়েছে। কারণ মাছকে তাঁরা মনে করেন ‘সমুদ্রফলম’। এ বঙ্গেও নদীর ফসল হিসেবে মাছ নিবেদিত হয় মায়ের জন্য। ফলে বঙ্গবাসীর মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্ক নতুন হলেও, এ বঙ্গে মা দুর্গার ভোগে মাছের রমরমা আজকের নয়।
এক সময়ে কোন বাড়ির ভোগ আমিষ আর কোন বাড়ির নিরামিষ তা নির্ধারণ করার মজার উপায় বার করেছিল পাড়ার ছেলেপুলেরা। বৈষ্ণববাড়িতে দুর্গার বাহন সিংহের মুখ অনেকটা ঘোড়ার মতো আর শাক্তবাড়িতে সিংহের আদলেই মুখ। ফলে সিংহের মুখ দেখেই তারা বলে দিতে পারত ভোগ আমিষ না নিরামিষ। বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখাতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। তদুপরি বৈদিক যুগেও মৎস্যকে খাদ্যোপযোগী করে গিয়েছে স্বয়ং অগ্নি। মহাভারত অনুসরণ করলে জানা যায়, “অগ্নি ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন—
মৎস্যাস্তস্য সমাচক্ষুঃ ক্রুদ্ধস্তানগ্নিরব্রবীৎ।
চিংড়ির পদ
ভক্ষ্যা বৈ বিবিধৈ ভার্বৈর্ভবিষ্যথ শরীরিণাম।।”
‘মৎস্যগণ বিবিধ প্রকারে শরীরিগণের ভক্ষ্য হইবে।’ প্রথম দিকে অগ্নিদ্বারা কেবল দুগ্ধসার হবি প্রস্তুত হত, তখনও আহার বিজ্ঞানের এত উন্নতি হয়নি। কিন্তু ক্রমে ক্রমে মানব-বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অগ্নির সাহায্যে নতুন খাদ্যপাকও মানব-আহার্যের শ্রেণিতে উঠে আসে, যার মধ্যে ছিল মাছও। ফলে মানুষের নিজের গ্রহণযোগ্য সর্বাপেক্ষা সেরা খাবারই তো উঠে আসবে ভোগের থালায়। ক্রমে ক্রমে মাছের মধ্যেও শ্রেণিবিন্যাস শুরু হল। সেই কারণেই এখনও দুর্গাপুজোর ভোগে ইলিশ, ভেটকির মতো উচ্চজাতের মাছের অগ্রাধিকার। সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়িতে যেমন পুজোর প্রত্যেক দিন মাছ দেওয়া হলেও, সেই মাছ হতে হবে আঁশযুক্ত। বৃহদ্ধর্মপুরাণ মতে, কেবল আঁশযুক্ত মাছই ব্রাহ্মণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য।
বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগে মাছের নানা পদ
ভোগের ইলিশ মাছ
বর্তমানে রায়চৌধুরী পরিবারের আট শরিকের বাড়িতেই দুর্গাপুজো হয়। এদের ছয়টি বাড়ি বড়িশায় (আটচালা, বড় বাড়ি, মেজো বাড়ি, বেনাকি বাড়ি, মাঝের বাড়ি, কালীকিঙ্কর বাড়ি) ও দু’টি বাড়ি বিরাটিতে (বিরাটি ও নিমতা পাঠানপুর)। পুজো শুরুর আগেই বাড়ির মেয়ে-বৌরা জুটে যান নারকেল নাড়ু, তক্তি, চন্দ্রপুলি বানানোর কাজে। রোজই মায়ের ভোগে হাতে গড়া নানা মিষ্টি থাকে। লুচি, পোলাও, খিচুড়ির সঙ্গে রুই, কাতলা, ইলিশ, ভেটকির মতো নানাবিধ মাছে সাজানো হয় মায়ের থালা। ‘‘আর সন্ধিপুজো শুরুর সময়ে শুকনো তালপাতা, নারকেল পাতার আগুনে চাল-ডাল ফুটিয়ে খিচুড়ি রান্না হয় মাটির সরায়। খিচুড়ি হয়ে গেলে সেই আঁচেই ল্যাটা মাছ পোড়ানো হয়। সন্ধিপুজোয় এই খিচুড়ি ও ল্যাটা মাছ দেওয়া হয় মাকে। বিজয়া দশমীর দিন পান্তা, খেসারির ডাল, কচু শাক, কই মাছের ঝাল ও চালতার অম্বল দেওয়া হয়,” বললেন পার্থ।
বিরাটির রায়চৌধুরী পরিবারের ভোগও প্রায় একই রকম। ভাস্কর রায়চৌধুরীর স্ত্রী অনীতা বললেন, “সপ্তমীর ভোগে খিচুড়ি আর অষ্টমীতে পোলাও। ভোগে রোজই নানা রকম মাছ থাকে। দশমীর দিন যেহেতু মায়ের বিদায়। সে দিন বাড়ির সকলের মনখারাপ। তাই রান্না খুব বেশি হয় না। সে দিন পান্তাভাত-কচুশাক দিয়ে মাকে নিবেদন করা হয়।”
কাশিমবাজার রাজবাড়ির পুজো শুরু হয় প্রায় ১৭৩০-৩৫ সাল নাগাদ। রাজবাড়ির ছেলে পল্লব রায় বললেন, “তখন মুর্শিদাবাদে দুটো বন্দর ছিল, একটা ভগবানগোলা আর একটা কাশিমবাজার। মরাঠা বর্গিদের দৌরাত্ম্যে তখন আমাদের পূর্বসুরিরা কাশিমবাজারে চলে আসেন। সেখানে বাড়ি তৈরি করে ফের পুজো শুরু হয়। কিন্তু আমাদের বাড়ির পুজো আরও আগের। ভগবানগোলার পাশে ফিরোজপুর গ্রামে রায়দের ভিটে বলে সাতমহলা বাড়ি ছিল। সেখানে দুর্গাপুজো হত।” এই পুজোর ভোগে ভাত, খিচুড়ি, পোলাওয়ের সঙ্গে থাকে রুই, বোয়াল, চিংড়ি। রুই দিয়ে মুর্শিদাবাদি মাছের ঝাল রায়বাড়ির ভোগের বিশেষ পদ।
রুই, কাতলা, ইলিশ, ভেটকির নানা পদের ভোগ থাকে কলকাতার হরি ঘোষ স্ট্রিটের দত্তবাড়িতেও। ১৫০ বছর আগে শুরু হয় এই বাড়ির পুজো, নানা কারণে তা মাঝে বন্ধও হয়ে যায়। ষষ্ঠ প্রজন্ম ফের শুরু করে মায়ের আরাধনা। দত্তবাড়িতে দশভুজা পূজিত হন কন্যারূপে। তাই ভোগে চা-কফি থেকে শুরু করে থাকে চকলেট, আইসক্রিমও। পুজোর ক’দিন আমিষ-নিরামিষ পদ মিলিয়ে ৫২ রকম ভোগ দেওয়াহয়। বাড়ির পুত্রবধূ সর্বাণী দত্তবললেন, “সকালে লুচি, আলু চচ্চড়ি থাকে, সন্ধেতে আবার লুচির সঙ্গে ছোলার ডাল, আলুর দম, ধোকার ডালনা দেওয়া হয়। অন্নভোগেখিচুড়ি, পোলাও, সাদা ভাতের সঙ্গে রোজ মাছ দেওয়া হয়। কোনও দিন কাতলা, কোনও দিন পার্শে, রুই, তোপসে মাছ ভাজা, ভেটকির ফিশ ফ্রাই... ঠিক যেমন বাড়ির মেয়েএলে সাজিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের বাড়িতে নিরামিষ মাংসও রান্না করে দেওয়া হয় ভোগে। গুঁড়ো মশলাদিয়ে রান্না এই মাংসে পেঁয়াজ-রসুন পড়ে না।”
খিচুড়িভোগ
মায়ের ভোগ
মণ্ডামিঠাই, তরিতরকারি, মাছ-মাংস... যা-ই দেওয়া হোক না কেন, দুর্গাপুজোর ভোগে খিচুড়ির অগ্রাধিকার চিরন্তন। হবে না-ই বা কেন, যেখানে মনসামঙ্গলে জানা যাচ্ছে স্বয়ং মা দুর্গা ডাবের জল দিয়ে চাল-ডাল ফুটিয়ে খিচুড়ি রেঁধে দিচ্ছেন মহাদেবকে। তা ছাড়া বড় পরিবার হোক বা গ্রামের পুজো... পাত পড়ে বহু মানুষের। গৃহকর্তার চিন্তা থাকে, মায়ের প্রসাদ যেন সকলের জোটে! তাই খিচুড়ি, লাবড়ার মতো পদ বেশি দেখা যায় মায়ের ভোগে।
পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়ে বেলুড় মঠের তৎকালীন অধ্যক্ষ স্বামী বিরজানন্দজীর চিঠিতে নির্দেশ ছিল, ‘‘... কেউ যেন নিরাশ হয়ে ফিরে না যায়। শুধু খিচুড়ি পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যবস্থা হবে। তাতেই শাক-সবজি যা কিছু দেবে। অন্য তরকারি মিষ্টান্ন কিছু দরকার নেই। এ খিচুড়ি মায়ের সামনে হাণ্ডা হাণ্ডা করে বিরাট ভোগ দিয়ে তারপর সর্বহারা নারায়ণদের পরিবেশন করতে হবে।” এই খিচুড়িভোগেই ক্ষুধানিবারণ হয় মায়ের অজস্র সন্তানসন্ততির। প্রকৃত অর্থেই মা শতমুখে খান।