ক্রিটেশাস যুগের সবচেয়ে হিংস্র ডাইনোসরদের মধ্যে অন্যতম ছিল ওরা। টির্যানোসরাস রেক্স (সংক্ষেপে টি রেক্স)। নিজেদের সময়ের দুর্দান্ত শিকারি। কিন্তু তারা কী ভাবে চলাফেরা করত, তা নিয়ে এত দিন কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কারণ, তাদের চলাফেরার কোনও পথ এতদিন চিহ্নিত ছিল না। এ বার সেই ধোঁয়াশা কাটল। এই প্রথম বারের মতো কোনও প্রাপ্তবয়স্ক টি রেক্সের চলাচলের পথ (ট্র্যাকওয়ে) খুঁজে পাওয়া গেল।
ডাইনোসরের পায়ের ছাপ বললে অনেকেরই মাথায় আসে স্টিফেন স্পিলবার্গ পরিচালিত জুরাসিক পার্ক সিনেমার সেই দৃশ্য। সবুজ ঘাসের একটি মাঠের মধ্যে অভিযাত্রীদের দল আবিষ্কার করেছিল বিশাল পায়ের ছাপ। কিন্তু বাস্তবে ডাইনোসরের পায়ের ছাপ আবিষ্কার মোটেও সহজ কাজ নয়। কারণ, পায়ের ছাপগুলি ভাল ভাবে সংরক্ষিত হওয়ার আগেই মাটি ক্ষয়ে যেত। তাই ক্রিটেশাস যুগের সেই বিলুপ্ত ডাইনোসরদের প্রচুর জীবাশ্ম আবিষ্কার হলেও তাদের পায়ের ছাপ সেই তুলনায় খুব কমই পাওয়া গিয়েছে।
এত দিন পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক টি রেক্সের মাত্র দু’টি পায়ের ছাপ আবিষ্কার হয়েছে। দু’টিই আমেরিকায়। প্রথমটি ১৯৯৮ সালে, নিউ মেক্সিকো প্রদেশে। দ্বিতীয়টি ২০০৮ সালে, মন্টানা প্রদেশে। কিন্তু দু’টিই বিচ্ছিন্ন পায়ের ছাপ। এই প্রথম বার জীবাশ্মবিদেরা টি রেক্সের এমন কিছু পায়ের ছাপের সন্ধান পেলেন, একটির সঙ্গে অন্যটি যেখানে সম্পর্কিত, যা এই হিংস্র শিকারিদের চলাচলের পথের দিকে ইঙ্গিত দেয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর ‘জার্নাল অফ ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি’ জার্নালে এই আবিষ্কারের খবর প্রকাশিত হয়।
প্রথমে দু’টি পায়ের ছাপ আবিষ্কার হয়। তার পরে আরও দু’টি। ২৩ ফুট জুড়ে ছড়িয়ে মোট চারটি পায়ের ছাপ। এক একটি পায়ের ছাপ প্রায় ৩ ফুট লম্বা এবং ২.৬ ফুট চওড়া। তা থেকে জীবাশ্মবিদদের অনুমান, ডাইনোসরটি ওই সময়ে ঘণ্টায় ৫.৬-৭ কিলোমিটার গতিতে হাঁটছিল।
আরও পড়ুন:
উত্তর ডাকোটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মন্টানা সীমান্তের কাছের এলাকা থেকে এই পায়ের ছাপগুলি আবিষ্কার হয়েছে। এখানে ‘হেল ক্রিক ফর্মেশন’ থেকে আগেও ক্রিটেশাস যুগের বিভিন্ন জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়েছে। তবে এই আবিষ্কারটি বেশ অন্যরকম। এই পায়ের ছাপগুলি খুঁজে পেয়েছেন কলোরাডোর নর্থগ্লেনের এক হাই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক তথা ‘ডেনভার মিউজ়িয়াম অফ নেচার অ্যান্ড সায়েন্স’-এর গবেষক কেন্ট হাপস। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি প্রথমে দু’টি পায়ের ছাপের জীবাশ্ম দেখতে পান। দু’টি ছাপের প্রতিটিরই তিনটি অংশ তিন দিকে মুখ করে ছিল। হাপসের কথায়, শিকারি প্রাণীদের পায়ের ছাপের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। এ ক্ষেত্রে তেমনই ছিল। যা থেকে তিনি অনুমান করেন, এগুলি কোনও মাংসাশী প্রাণীর পায়ের ছাপ।
পায়ের ছাপগুলি আবিষ্কারের পর হাপস নিজেই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। “আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল— এ তো অবিশ্বাস্য! আমি কিছুক্ষণ বসে ওগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ধাতস্থ হওয়ার পরে বিশ্বাস করতে পেরেছিলাম যে এটি আদৌ কোনও পায়ের ছাপ,” বলেন হাপস। গবেষণায় দেখা যায়, ওই পায়ের ছাপগুলি ৬ কোটি ৬৫ লক্ষ বছর আগের।
এই পায়ের ছাপগুলি জীবাশ্মবিদদের কাছে ছিল একটি ‘টাইম মেশিনের’ মতো। ক্রিটেশাস যুগের এই শিকারি প্রাণীদের আচরণ, তাদের হাঁটার ভঙ্গি বোঝা যেতে পারে এই ছাপগুলি থেকে। এ বিষয়ে আরও বিশদে বোঝার জন্য ‘ডেনভার মিউজ়িয়াম অফ নেচার অ্যান্ড সায়েন্স’-এর কিউরেটর টাইলার লাইসনের সঙ্গে যৌথ ভাবে একটি গবেষণা শুরু করেন হাপস। তাঁদের অভিযানে ওই এলাকায় আরও দু’টি পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। প্রতিটি ছাপেরই সামনের দিকে তিনটি করে সরু আঙুল ছিল। তার মধ্যে মাঝের আঙুলগুলি ছিল বাকিগুলির চেয়ে লম্বা।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে সময়ে টি রেক্সটির পায়ের ছাপ বসেছিল মাটিতে, তখন সেটি ঘণ্টায় ৫.৬-৭ কিলোমিটার গতিতে হাঁটছিল। তবে এটিই যে তার সর্বোচ্চ গতি, এমনটা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মনে করছেন ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের জীবাশ্মবিদ টমাস হোল্টজ় জুনিয়র। তার মতে, এই পায়ের ছাপগুলি সম্ভবত ভেজা মাটিতে তৈরি হয়েছিল। ভেজা মাটির তুলনায় শক্ত মাটিতে ডাইনোসরটি আরও জোরে হাঁটতে পারত বলে ব্যাখ্যা করছেন তিনি।
আজ থেকে সাড়ে ছ’লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত যত ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত পৃথিবীতে, তাদের মধ্যে অন্যতম হিংস্র প্রজাতি এই ‘টি-রেক্স’। ডাইনোসর যুগে ঠিক কোন সময়ে টির্যানোসরাসদের আবির্ভাব হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। জীবাশ্ম তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, প্রায় সাত কোটি বছর আগে থেকে তাদের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে। তারও আগে ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনও প্রমাণ্য তথ্য নেই। নিজেদের সময়ের অন্যতম বৃহৎ মাংসাশী ডাইনোসর বা শীর্ষস্থানীয় স্থলচর শিকারি ছিল টি-রেক্স। লাতিন ভাষায় ‘রেক্স’ শব্দের অর্থ রাজা। ডাইনোসর যুগে তাদের যে তেজ এবং দাপট ছিল, তার সঙ্গে সাজুয্য রেখেই নামকরণ হয়েছে টি-রেক্স।