Advertisement
E-Paper

পড়েই ছিল মধ্যযুগের দেহাবশেষ! নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ব্যতিক্রমী এক নারীকে ‘জাগালেন’ গবেষকেরা

প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দুর্গম পথ পার হয়ে স্পেনের বিখ্যাত খ্রিস্টান তীর্থক্ষেত্রে পৌঁছেছিলেন সুইডেনের এক নারী। কী ভাবে সম্ভব হয়েছিল সেই যাত্রা? খুঁজে পার করলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫৩
সুইডেন থেকে স্পেন— মধ্যযুগের ইউরোপে এক জন মহিলার পক্ষে সে এক অভাবনীয় যাত্রা।

সুইডেন থেকে স্পেন— মধ্যযুগের ইউরোপে এক জন মহিলার পক্ষে সে এক অভাবনীয় যাত্রা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তিনি ব্যতিক্রমী! আজ থেকে অন্তত আট শতক আগে মধ্য সুইডেন থেকে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে স্পেনের এক তীর্থক্ষেত্রে। মধ্যযুগের ইউরোপে এক জন মহিলার পক্ষে সে এক অভাবনীয় যাত্রা। পথঘাট দুর্গম শুধু নয়, চরম বিপজ্জনক। তার থেকেও বড় বাধা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠিন নিগড়। তবু তিনি গিয়েছিলেন। উত্তর-পশ্চিম স্পেনের বিখ্যাত খ্রিস্টান তীর্থক্ষেত্র ‘সান্তিয়াগো দে কোম্পোস্তেলা’ থেকে নিয়ে এসেছিলেন পবিত্র স্মারক—একটি বিশেষ সামুদ্রিক ঝিনুক। সুইডেনের ইয়েমতলান্ডের ভেস্টেরহুস কবরস্থান থেকে পাওয়া সেই ঝিনুকই প্রত্নতত্ত্ববিদদের সামনে খুলে দিয়েছে গবেষণার নতুন দরজা। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণার খবর।

গবেষকদের খাতায় সুইডেনের সেই ব্যতিক্রমী নারীর নাম ‘লেডি ৫৬’। ১৯৫২ সালে ভেস্টেরহুসের কবরস্থান থেকে যে ৩৬৪টি দেহাবশেষ উদ্ধার হয়, তিনি তাঁদেরই একটি। ওই কবরস্থানে আলাদা আলাদা জায়গায় সমাহিত করা হয়েছিল তাঁর বাবা-মা, ভাই ও দুই কন্যাসন্তানকে। ‘৫৬’ হল ওই মহিলার প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রমিক সংখ্যা, ক্যা়টালগিংয়ের কাজে লাগে। দেহাবশেষগুলি স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। যদিও প্রযুক্তির অভাবে পরের প্রায় ৭৫ বছর আর বিশেষ কোনও তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। লেডি ৫৬ সম্পর্কে গবেষকদের প্রায় কোনও ধারণাই ছিল না। অন্য দেহাবশেষগুলির মধ্যে কোনগুলি তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানা যায়নি সেটাও।

১৯৮৪ সালে আবিষ্কার হয় প্রাচীন ডিএনএ (অ্যানসিয়েন্ট ডিএনএ বা এ-ডিএনএ) বিশ্লেষণ পদ্ধতি। চলতি শতাব্দীর গোড়া থেকে তা নিয়ে বড় পরিসরে কাজ শুরু করেন গবেষকেরা। সেই প্রযুক্তির সাহায্যে জিনগত বৈশিষ্ট্যের উপরে ভিত্তি করে সম্প্রতি লেডি ৫৬-র মুখাবয়ব পুনর্নির্মাণ করেন স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ও চিত্রকর অস্কার নিলসন। চলতি বছরের জুলাই মাসে সেই চমকপ্রদ ছবি প্রকাশিত হয় স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে।

কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ‘লেডি ৫৬’-র দেহাবশেষের পাশে পাওয়া ‘পবিত্র ঝিনুক’ নিয়ে গবেষণার দ্বার খুলে দিয়েছে নতুন প্রযুক্তি। ঝিনুকটি যে ‘সান্তিয়াগো দে কোম্পোস্তেলা’-র পবিত্র স্মারক সেটা জানা ছিল। এটাও জানা ছিল যে, স্পেনের তীর্থক্ষেত্রে গিয়ে কেউ নিয়ে না এলে মধ্যযুগীয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় (মূলত বর্তমানের ডেনমার্ক, নরওয়ে এবং সুইডেনকে নিয়ে যে অঞ্চল) সেটা কোনও ভাবেই আসা সম্ভব নয়। কিন্তু ১৯৫২ সালে শুধু ওই ঝিনুকের উপর ভিত্তি করে কোনও অনুমানের চেষ্টা বৃথা বলে মনে করেছিলেন গবেষকেরা। এখন দেহাবশেষগুলির পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে সেই অন্ধকার অনেকটাই কেটেছে।

লেডি ৫৬ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের কবরগুলি (প্রত্যেকের দেহ উদ্ধার হয়েছিল আলাদা আলাদা কবর থেকে) ছিল কবরস্থানের লাগোয়া গির্জার একদম কাছে। গবেষকেরা বলছেন, এই পরিবারটিকে ইয়েমতলান্ডে সম্ভ্রান্ত বলেই গণ্য করা হত। তাঁদের বিত্ত ও প্রতিপত্তি দুই ছিল। সেই কারণেই গির্জার সবচেয়ে কাছে কবর দেওয়া হয়েছিল এঁদের।

‘পবিত্র ঝিনুক’টি পাওয়া গিয়েছিল ‘লেডি ৫৬’-র কবর থেকে। গবেষকদের অনুমান, তিনি নিজেই এই স্মারক এনেছিলেন স্পেন থেকে। তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবারের নারীদের দূরদেশের বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্রে যাত্রা করার যে রীতি প্রচলিত ছিল, এই ঝিনুক তারই প্রত্যক্ষ প্রমাণ। পরিবারের বিপুল আর্থিক সচ্ছলতা ও প্রতিপত্তি ছিল বলেই লেডি ৫৬-র পক্ষে অত দুর্গম পথ নির্বিঘ্নে পার হওয়া সম্ভব হয়েছিল, বলছেন গবেষকেরা। তার পরেও সময়ের নিরিখে সেটা যে রীতিমতো দুঃসাহসিক একটি ঘটনা, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ইউরোপীয় মধ্যযুগ সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের ধারণা খুব স্পষ্ট নয়। জিশু খ্রিস্টের জন্মের শ’পাঁচেক বছর পর থেকে হাজারখানেক বছর ধরে ইউরোপে সামাজিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং তার অনুশাসন চরম পর্যায়ে উঠেছিল। ‘অন্ধকার যুগ’ বলে পরিচিত এই সময়কালে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার হার নেমে আসে। কমে যায় লিখিত নথিপত্রও। কিছু সাহিত্য ও ধর্মীয় গ্রন্থাবলি ছাড়া সেই সময়ের নথিপত্র বিশেষ পাওয়া যায় না। মধ্যযুগে বাড়তি সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছিল মেয়েদের উপরে। তার পরেও কয়েক জন ব্যতিক্রমী নারীর উল্লেখ মেলে তৎকালীন সাহিত্যে। খ্রিস্টান সাধ্বী মার্জারি কেম্প তাঁদের এক জন। তাঁর আত্মজীবনী এবং কবিতার বই পাওয়া যায়। জিওফ্রে চসারের ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেল্‌স’-এও মিসেস অ্যালিসন নামের এক তীর্থযাত্রীর গল্প আছে। এ বার সেই অন্ধকার অধ্যায়ে নতুন আলোকপাত করল বৈজ্ঞানিক গবেষণা। বোঝা গেল, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির পক্ষে সম্ভব না-হলেও, উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের তীর্থযাত্রার চল ছিল উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংস্কৃতিতে।

মধ্যযুগীয় ইউরোপ সম্পর্কে শতবর্ষ প্রাচীন এক ভুল ধারণাও ধাক্কা খেয়েছে এই গবেষণায়। একই কবরে শায়িত পূর্ণবয়স্ক মানুষ ও শিশুকে এত দিন মা-সন্তান বা নিকটাত্মীয় বলে ধরে নিতেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। অনুমান করা হত, মহামারিতে গোটা পরিবার উজাড় হয়ে গেলে কিংবা সন্তান মারা গেলে মা-বাবার সঙ্গেই তাকে এক কবরে ঠাঁই দেওয়া হত। কিন্তু স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, সেই অনুমান মোটেও ঠিক নয়!

সুইডেনেরই তিনটি মধ্যযুগীয় কবরস্থানের ১৪২ জন শিশু ও পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল জিন পরীক্ষার জন্য। এদের মধ্যে ইয়েমতলান্ডের ভেস্টেরহুসের কবরস্থানটি গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পাওয়া গিয়েছিল। স্কানের কাছে ফিয়েলকিঙে কবরস্থানটির খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৯৬ সালে। আর স্টকহোলমের কাছে সিগতুনার কবরস্থানটি আবিষ্কৃত হয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে, ২০২১ সালে।

গবেষকদের বিশেষ নজর ছিল এই তিন জায়গার ৫১টি যৌথ কবরের দিকে। যাদের ২৮টিতে একসঙ্গে মিলেছিল পূর্ণবয়স্ক মানুষ ও অপ্রাপ্তবয়স্কের দেহাবশেষ। ১২টি কবর ছিল কেবল শিশুদেরই। শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে বাকি ১১টি কবরে। গবেষণার প্রাণপুরুষ প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসবিশেষজ্ঞ মাজা ক্রজ়েইনস্কির কথায়, ‘‘একই কবরে শিশু ও বয়স্ক মানুষের দেহ মিললেই আমরা ধরে নিতাম তারা মা অথবা বাবা এবং তাঁদের সন্তান। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। যৌথ কবর নির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় রীতিনীতিই প্রধান কারণ ছিল, রক্তসম্পর্ক নয়। পরিবার এক হলেও কবরের স্থান হত আলাদা।’’ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক আন্দার্স গোথেরস্ট্রেম বলেন, ‘‘ইউরোপে মধ্যযুগে শিশুদের আলাদা কোনও শ্রেণি হিসেবে দেখা হত না, পূর্ণবয়স্ক মানুষের সমতুল্য ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়ম মেনেই তাদের কবর দেওয়া হত।’’

এর আগে মূলত কোমরের হাড় দেখে নিশ্চিত করা হত দেহাবশেষটি নারী না পুরুষের। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাড় দেখে নির্ভুল ভাবে লিঙ্গ নির্ধারণ করা সম্ভব হত না। এ বার ডিএনএ বিশ্লেষণ প্রযুক্তির সাহায্যে শিশুদের নিখুঁত লিঙ্গ নির্ধারণ করে সম্ভব হয়েছে। তাতেই ফুটে উঠেছে কবর নির্দিষ্ট করার এক সুস্পষ্ট বিধি। ভেস্টেরহুসে গির্জার উত্তর দিকে শুধু পুরুষ এবং দক্ষিণ দিকে শুধু নারীদের কবর দেওয়া হত। যৌথ কবর পাওয়া গিয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে। গবেষকদের অনুমান, এর পিছনে মৃতের সামাজিক অবস্থানের ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। ‘লেডি ৫৬’-র পরিবারকে একই জায়গায় কবর দেওয়া হয়েছিল। সেটা তাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে হয়ে থাকতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রেও কবর দেওয়ার এই নিয়ম কঠোর ভাবে মানা হত। এর থেকেই গবেষকদের অনুমান, মধ্যযুগে একটি শিশু জন্মানোমাত্রই তার সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয় সুনির্দিষ্ট হয়ে যেত, এবং মৃত্যুর পরেও এই পরিচয়ই প্রাধান্য পেত।

Europe DNA Medieval Period Science

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy