বরফে ঢাকা সুবিস্তৃত মহাদেশ আন্টার্কটিকা পৃথিবীর মূল জনবহুল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। দূরে, সাধারণের নাগালের বাইরে আছে বলেই হয়তো তাকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল আরও বেশি। সেই কৌতূহলই একের পর এক নতুন গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে বিজ্ঞানীদের। সম্প্রতি তেমনই এক গবেষণায় জানা গিয়েছে আন্টার্কটিকার বরফের নীচে চাপা পড়ে থাকা আদিম পর্বতরহস্য!
আন্টার্কটিকা মহাদেশ এমনিতেই রহস্যে ঠাসা। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, পুরু বরফের চাদরের নীচে এখনও অনেক কিছু লুকিয়ে আছে, যা তাঁদের গোচরে আসেনি। পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সৃষ্টির আদিলগ্নে সমগ্র পৃথিবী মূলত দু’টি ভূখণ্ডে বিভক্ত ছিল। টেথিস সাগরের দক্ষিণে অবস্থিত গন্ডোয়ানাল্যান্ড ধীরে ধীরে আরও দক্ষিণে সরে গিয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাদেশের বিভিন্ন অংশের জন্ম দিয়েছে। ২০২২ সালের আগে একটি গবেষণায় দাবি করা হয়, প্রায় ৬৫ থেকে ৪৫ কোটি বছর আগে, গন্ডোয়ানাল্যান্ড যখন তৈরি হচ্ছিল, সেখানে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল পর্বতমালা। টেথিসের উত্তরের ভূখণ্ডে হিমালয় পর্বতমালার মতোই ছিল তার উচ্চতা এবং বিস্তৃতি। হিমালয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবেই যেন ওই পর্বত মাথা তুলেছিল দক্ষিণের ভূখণ্ডে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন পর্বতমালার নিদর্শন আন্টার্কটিকার নীচে খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আরও পড়ুন:
জার্মানির রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সের চিনা গবেষক বেই চেন এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক আয়ান এইচ ক্যাম্পবেল সম্প্রতি আন্টার্কটিকার ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্র গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে ‘আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্স লেটার্স’ জার্নালে। ওই গবেষণায় দাবি, হিমালয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী গন্ডোয়ানাল্যান্ডের সেই প্রাচীন পর্বতমালা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে একসময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার ‘শিকড়’ এখনও লুকিয়ে আছে আন্টার্কটিকা মহাদেশের বরফস্তরের নীচে। শুধু তা-ই নয়, ওই ক্ষয়প্রাপ্ত পর্বতই পৃথিবীতে জটিল প্রাণের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল বলে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন।
পৃথিবীর শিলাস্তরের ক্ষুদ্র খনিজকণা জ়িরকন বিশ্লেষণ করে আন্টার্কটিকার নীচে প্রাচীন পর্বতের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন গবেষকেরা। এই বিশেষ ধরনের খনিজকণা অল্প পরিমাণে হলেও পৃথিবীর সমস্ত শিলাস্তরে থাকে। এটি অত্যন্ত টেকসই একটি প্রাকৃতিক খনিজ, যাকে পৃথিবীতে আবিষ্কৃত খনিজের মধ্যে প্রাচীনতম বলেও উল্লেখ করেন কেউ কেউ। জ়িরকনের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা শিলার বয়স নির্ধারণ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রেও সেই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। আন্টার্কটিকার ৯৯.৫ শতাংশের বেশি ভূখণ্ড বরফে ঢাকা। তাই সরাসরি সেখান থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করা কঠিন। মহাদেশ সংলগ্ন সমুদ্র থেকে বিজ্ঞানীরা ১৭০০টির বেশি জ়িরকন নমুনা সংগ্রহ করেন। সেখানেই ৬৫ থেকে ৪৫ কোটি বছর আগের সময়কালের প্রমাণ মিলেছে, যে সময় তৈরি হচ্ছিল গন্ডোয়ানাল্যান্ড!
আরও পড়ুন:
জ়িরকন নমুনাগুলিতে উঁচু পর্বতের অবশিষ্টাংশের রাসায়নিক চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। শিলার উপর প্রচণ্ড চাপের নিদর্শনই পর্বতের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, প্রাচীন পর্বতটি আকারে আজকের হিমালয়ের প্রায় সমান ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। পর্বতের এই ক্ষয়ীভবনই প্রাণিজগতের জন্য শাপে বর হয়েছিল বলা যায়। কারণ, এর ফলে গন্ডোয়ানা সংলগ্ন সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ পলি, পাথর জমা হয়। তার কিছুটা আন্টার্কটিকার বরফের নীচে এখনও চাপা পড়ে আছে, মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
ক্ষয়প্রাপ্ত পর্বতমালা ফসফরাস, লোহা-সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান সমুদ্রে নির্গত করে। বিজ্ঞানীদের দাবি, তার মাধ্যমেই জটিল প্রাণের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছিল পৃথিবীতে। গন্ডোয়ানার সেই পর্বতমালা প্রাণের বিকাশের উপযোগী পরিবেশ সমুদ্রের নীচে তৈরি করে দিয়েছিল। বিপুল পরিমাণ জৈব কার্বন ও পাইরাইট সমৃদ্ধ শিলা ওই সময় সমুদ্রে চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীতে প্রাণিজগতের সৃষ্টির জন্য আন্টার্কটিকার ওই পর্বতমালাই দায়ী, বিজ্ঞানীরা এ কথা জোর দিয়ে বলছেন না। তাঁরা মনে করেন, পর্বতের ক্ষয় অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছিল মাত্র। তা জটিল প্রাণের বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠেছিল। বরফে ঢাকা আন্টার্কটিকার নীচে প্রাচীন সেই পর্বতের অস্তিত্ব এখনও বর্তমান। সমগ্র প্রাণিজগৎ তার কাছে ঋণী।