অতলান্তিক মহাসাগর। ব্যাপ্তির দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলরাশি। প্রতি বছর এই মহাসাগরের বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে ছোটবড় ঝড়ঝাপ্টা লেগেই থাকে। বিধ্বংসী হ্যারিকেন প্রায়ই অতলান্তিকের উপকূলে তাণ্ডব চালায়। প্রাণহানির পাশাপাশি সম্পদহানিও হয় বিস্তর। কিন্তু এ বছর চিত্রটা বেশ ভিন্ন। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। এখনও সুবিশাল এই মহাসাগরের কোনও প্রান্তে কোথাও একটি হ্যারিকেনও তৈরি হয়নি!
সাধারণ ভাবে অগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর সপ্তাহের মধ্যেই অতলান্তিকে ঘূর্ণিঝড় মাথা তুলতে থাকে। কিন্তু এ বছর এখনও তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। আবহাওয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি একটি নজির বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। প্রাথমিক ভাবে সামুদ্রিক ঝড়ের এই অনুপস্থিতিকে স্বস্তির বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা চিন্তিত অন্য কারণে। তাঁদের কারও কারও মতে, এই রহস্যজনক নিস্তব্ধতার নেপথ্যে বড়সড় কোনও বিপর্যয়ের ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকতে পারে। আগে থেকে সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
১৯৬৬ সাল থেকে আধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে অতলান্তিকে ঘূর্ণিঝড় ‘ট্র্যাক’ করা শুরু হয়। পরিসংখ্যান বলছে, সেই থেকে এখনও পর্যন্ত অতলান্তিকে হ্যারিকেনের এই নজির নেই, যা এ বছর তৈরি হয়েছে। এর আগে সবচেয়ে দেরিতে অতলান্তিক মহাসাগরে হ্যারিকেন তৈরি হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে। ২০০২ এবং ২০১৩ সালে ওই তারিখে প্রথম হ্যারিকেন দানা বেঁধেছিল অতলান্তিকের বুকে, যা এত দিন বিলম্বের নজির ছিল। এ বার সেই তারিখও পেরিয়ে গিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগরকে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য এত ‘শান্ত’ থাকতে কেউ কখনও দেখেননি। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ ও অধ্যাপক মার্শাল শেফার্ড ফোর্বস ম্যাগাজ়িনে এই পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন:
অতলান্তিকের অববাহিকায় ঘূর্ণিঝড়ের মরসুম চলে ১ জুন থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। সাধারণ ভাবে এই সময়ের মধ্যে অন্তত ১৪টি এমন ঝড় আসে, যেগুলির নামকরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে হাওয়ার গতি থাকে ঘণ্টায় ৬৩ কিলোমিটার বা তার বেশি। তার মধ্যে অন্তত সাতটি ঝড়ের ক্ষেত্রে হাওয়ার বেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। প্রতি বছর অন্তত তিনটি হ্যারিকেন আসে ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিবেগে। ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) অগস্টেই জানিয়ে দিয়েছিল, এ বছর সেই মরসুম খুব একটা ঘটনাবহুল হবে না। হ্যারিকেনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার ৭৫ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় এনওএএ।
কিন্তু কেন এমন অস্বাভাবিক রকম ‘শান্ত’ অতলান্তিক? নেপথ্যে এল নিনো-র হাত রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময় দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের উপকূল ঘেঁষে যে উষ্ণ স্রোত বয়ে যায়, তার নামই এল নিনো। এর প্রভাবে মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। শুধু প্রশান্ত মহাসাগর নয়, সারা বিশ্বের জলবায়ুকে প্রভাবিত করে এই স্রোত। এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব পড়ছে অতলান্তিকেও। তার প্রভাবেই ভারত-সহ বিভিন্ন জায়গায় বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টিতে ঘাটতি দেখা গিয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘এল নিনো আমাদের চোখের সামনেই বিশাল আকার ধারণ করছে। পৃথিবী যে এখন একটি অজানা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে এবং ক্রমশ তা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, বিজ্ঞানে এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।’’
আরও পড়ুন:
প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ স্রোতই অতলান্তিকে ঝড় সৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছে। শক্তিশালী স্রোত বায়ুপ্রবাহের ধরনকে এমন ভাবে বদলে দিচ্ছে যে, ঝড় গড়ে উঠতেই পারছে না। কোথাও যদি বা গড়ে ওঠে, তা শক্তি সংগ্রহ করতে পারছে না। অতলান্তিক এই মুহূর্তে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভীষণ ভাবে প্রতিকূল।
হ্যারিকেন একটিও তৈরি হয়নি। কিন্তু অতলান্তিককে এ বছর একেবারে ‘ঝড়বিমুখ’ বলা যাবে না। এই মহাসাগরে চলতি বছরে অন্তত পাঁচটি ক্রান্তীয় ঝড় এসেছে, যদিও তা তুলনামূলক ভাবে অনেক ছোট। এই মহাসাগরে ঝড়ের গতিবিধি প্রায় সাত শতাংশে নেমে এসেছে। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ, অতলান্তিকে ঝড়ের দাপট কমলেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বে়ড়েছে। ইতিমধ্যে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ১৬টি এবং মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ২০টি নামকরণযোগ্য ঝড় তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে অন্তত ছ’টি হ্যারিকেন রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে দু’বার আছড়ে পড়েছে হ্যারিকেন। তার জন্য বিস্তর ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে।
আবহবিদদের মতে, এ বছর এল নিনো আরও শক্তিশালী হচ্ছে। শেফার্ডের মতে, ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর সাক্ষী থাকতে চলেছে গোটা পৃথিবী। কারণ, সাধারণ ভাবে হেমন্তের শেষ দিকে অথবা শীতকালে এই স্রোতের তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছোয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই এল নিনো ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
এ বছর শান্ত থাকলেও অতলান্তিকের পরবর্তী হ্যারিকেন মরসুম অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, মনে করছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) আবহবিদ কেরি এমানুয়েল। তাঁর মতে, মহাসাগরটির জল ক্রমাগত উষ্ণ হচ্ছে। তুলনায় বাতাস তেমন উষ্ণ নয়। এই তাপীয় তারতম্য হ্যারিকেন সৃষ্টির অন্যতম কারণ। তাই আগামী মরসুমে হ্যারিকেনের তীব্রতা বেশি হতে পারে অতলান্তিকের উপকূলে। কেরির মতে, জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য আগেভাগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।