ধারালো নখ নেই। শক্তিশালী চোয়াল নেই। গায়ে খুব যে জোর, তা-ও নয়। তার পরেও বিবর্তনের ইতিহাসে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী জীব (ডমিন্যান্ট স্পিসিজ়) হয়ে টিকে গিয়েছে মানুষ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ হল তার ঘুমের সময় হ্রাস। কম ঘুমিয়েই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে আধুনিক মানুষ। এমনটাই মনে করেন ডেভিড আর স্যামসন।
কানাডার টরন্টো মিসিসগা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্লিপ অ্যান্ড হিউম্যান ইভলিুশন’-এর ডিরেক্টর স্যামসন মানুষের ঘুমের ধরন নিয়ে গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণা নিয়ে পরে বই লিখেছেন— ‘দ্য স্লিপলেস এপ: দ্য স্টোরি অফ স্লিপ ইন হিউম্যান ইভলিউশন’। স্যামসনের মতে, বানর প্রজাতির অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মানুষের ঘুম কম। সে জন্যই সে আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব বলে পরিগণিত হয়। নিজের এই দাবি প্রমাণ করার জন্য দিনের পর দিন বনে-জঙ্গলে ঘুরেছেন স্যামসন। সারা দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন শিম্পাঞ্জি, বানর এবং তানজ়ানিয়ার প্রত্যন্ত জঙ্গলের হাডজ়া জনজাতিদের।
মানুষ কেন বাকি প্রাণীদের থেকে আলাদা? এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজা শুরু করেছিলেন স্যামসন। এই প্রশ্নের উত্তর হল, মানুষের মস্তিষ্ক তার দেহের তুলনায় বড়। তারা সামাজিক প্রাণী। পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করে চলে। ঠিক সে কারণেই ধারালো দাঁত-নখ ছাড়াই মানুষ টিকে গিয়েছে। তার নেপথ্যে রয়েছে তার ঘুমের ধরন। স্যামসনের মতে, মানুষের ঘুমের ধরনে পরিবর্তন না এলে তার টিকে থাকা হয়তো সম্ভব হত না।
শহুরে মানুষজন প্রতিদিন সাত ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকেন। প্রতিদিন তারা মোটামুটি একই সময়ে ঘুমোতে যায়। টানা ঘুমিয়ে পরের দিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠে। যারা এখনও শিকার ধরে পেট ভরায়, সে সব জনজাতির মানুষেরা আরও ৪৫ মিনিট বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকে। তবে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই। এই ঘুমের ধরনই মানুষকে অন্য প্রাণীর তুলনায় আলাদা করেছে, দাবি স্যামসনের। কারণ, মানুষের ঘুম হয় অনেক গভীর।
শিম্পাঞ্জিরা দিনে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা ঘুমোয়। কিছু নিশাচর বানর দিনে ঘুমোয় প্রায় ১৭ ঘণ্টা। মানুষ গড়ে যে সাত ঘণ্টা ঘুমোয়, তার ২৫ শতাংশই হল গভীর (র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম)। যেখানে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী যত ঘণ্টা ঘুমোয়, তার পাঁচ শতাংশ আরইএম। মানুষের এই গভীর ঘুমই তার স্মৃতিশক্তি প্রখর করতে সাহায্য করে। নতুন কিছু শিখতে পারে সে। গভীর ঘুমের কারণেই জেগে উঠলে তার তরতাজা লাগে।
প্রায় এক লক্ষ বছর আগে মানুষ গাছ থেকে নেমে মাটিতে ঘুমোতে শুরু করে। মাটিতে যখন ঘুমোতে লাগল, তখন পশুর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে দলবদ্ধ হয়ে ঘুমোতে থাকে তারা। একটি দল যখন ঘুমোত, তখন আর এক দল পাহারা দিত। এর ফলে তারা নিরাপদে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে শুরু করল।
আরও পড়ুন:
-
বাঁকা চাঁদের গায়ে কী ওই আলোর বিন্দু! গণেশ চতুর্থীর রাতে দেখা যাচ্ছে কলকাতা থেকে কোচবিহারের আকাশে
-
ডাইনোসরের ডিম পাওয়া গেল পৃথিবীর এক অপ্রত্যাশিত প্রান্তে! জুরাসিক যুগের প্রাণীদের অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে নয়া তথ্য গবেষণায়
-
‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে প্রযুক্তির ক্ষমতা?’ এআই দৌড়ে লাগাম টানতে চাইছেন তিন শীর্ষসংস্থার তিন শীর্ষকর্তা
ক্রমে আগুনের আবিষ্কার মানুষের ঘুমের সময় আরও অনেকটা কমিয়ে দেয়। আগুন জ্বালালে হিংস্র পশুরা যেমন ভয়ে পালাত, তেমন রাতের অন্ধকারও দূর হত। শীতকালে ঠান্ডাও কম লাগত। আগুন জ্বেলে তার চারপাশে বসে মানুষ গল্পগুজব করতে শুরু করল। তাতে সামাজিক বন্ধন পোক্ত হল। ভাষা, বুদ্ধিমত্তার প্রসার হল। আগের তুলনায় বেশি সময় জেগে থাকতে শুরু করে মানুষ। ক্রমে সেই সময়টাকে কাজেও লাগাতে শুরু করে। ওই অতিরিক্ত সময়ে তারা অস্ত্র তৈরি করত। শিকারের নতুন কৌশল তৈরি করত। ক্রমে আবিষ্কার করতে শুরু করে মানুষ।
যেখানে অন্য স্তন্যপায়ীরা কেবল দিনের বেলাতেই নিজেদের কাজকর্ম করতে সক্ষম ছিল, সেখানে মানুষ রাতেও অতিরিক্ত অনেকটা সময় পেয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে মানুষ কম ঘুমোনোর কারণে ভাবনাচিন্তার জন্য বাড়তি সময় পেয়েছিল। তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদানপ্রদান বেড়েছিল। যেটুকু সময় তারা ঘুমোত, তা গভীর (আরইএম) হওয়ায় পরের দিনের কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হত তারা। তাদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটেছিল। আর ঠিক সে কারণেই মানুষ আজ রাজত্ব করছে গোটা পৃথিবীতে।