কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল হয়তো এক উল্কা। তাতেই ছিল এক কণা শর্করা বা চিনির দানা। সেই দানাই হয়তো পৃথিবীতে প্রাণ আনতে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ গবেষণার পরে এমনটাই মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।
জীববিদ্যায় যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু বলা হয়, তা হল আরএনএ। জীবের শরীরে এই আরএনএর একটি অংশ তৈরি করে রিবোস (পাঁচ-কার্বন বিশিষ্ট শর্করা চিনি)-এর মতো জৈব শর্করা। কিন্তু রাসায়নিক ভাবে এই রিবোস ভঙ্গুর। সহজেই ভেঙে যায়। তাই বিজ্ঞানীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিলেন, কী ভাবে সেই রিবোস দীর্ঘ সময় টিকে ছিল এবং তার পরে প্রাণ তৈরিতে অংশগ্রহণ করেছিল!
‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন— ‘দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ রিবোস অন বোরেট মিনারেল সলিউবিলিটি’। সেই প্রতিবেদনেই বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রিবোস শর্করা এবং বোরেট খনিজের মধ্যে কী সম্পর্ক, তা-ও খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, উল্কায় থাকা জৈব শর্করা রিবোস একা ছিল না। সঙ্গে ছিল খনিজ পদার্থ বোরেট।
আরও পড়ুন:
বোরেট জলে মিশে যায়। কিন্তু সেই বোরেট আর রিবোসের মিশ্রণ হলে তা সহজে ক্ষয়ীভূত হয় না। বিজ্ঞানীদের মতে এই দুইয়ের মিশ্রণের দীর্ঘ দিন পৃথিবীর বুকে টিকে ছিল রিবোস শর্করা। মিশ্রণটি শর্করা রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করেছিল। সেই সুরক্ষার কারণে পৃথিবীর বুকে দীর্ঘদিন টিকে ছিল রিবোস শর্করা। তার পরে ক্রমে জন্ম হয়েছিল জীবের।
আরএনএ জিনের সঙ্কেত বহন করে। এই সঙ্কেতগুলি নাইট্রোজেন বেসগুলির সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের মধ্যে থাকে। আরএনএর মেরুদণ্ড বলা যাতে পারে রিবোসকে। সৃষ্টির আদিতে এই শর্করাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। আরএনএর গঠন একটি শিকলের মতো। এই শিকলের মূল কাঠামোটি তৈরি হয় রিবোজ শর্করা এবং ফসফেট গ্রুপের পর্যায়ক্রমিক সংযোগের মাধ্যমে। একটি রিবোজের সঙ্গে ফসফেট যোগ হয়ে পরের রিবোজের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।
রিবোজের রাসায়নিক গঠনের কারণেই ডিএনএর তুলনায় আরএনএ অনেক বেশি সক্রিয়। সে কারণে তারা সহজে কোষে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। উল্কাপিণ্ডে পাওয়া রিবোজ শর্করাটি হল সেই ভিত্তি, যার উপর ভর করে আদিম পৃথিবীতে জীবনের প্রথম জিনগত উপাদান আরএনএ গড়ে উঠেছিল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় দেখেছেন, শুধু পৃথিবীতে নয়, তার বাইরেও থাকতে পারে প্রাণের উপাদান। ১৯৬৯ সালে ভিক্টোরিয়ায় আছড়ে পড়েছিল একটি উল্কা। তা পরীক্ষা করে তার উপাদানগুলি বুঝেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০২৫ সালে বেন্নু নামে একটি উল্কার নমুনা পরীক্ষা করে সেখানে শর্করার উপস্থিতি লক্ষ করেন বিজ্ঞানীরা। তার পরেই শুরু হয় পরীক্ষানিরীক্ষা। বিজ্ঞানীদের মনে হয় যে, পৃথিবীর বাইরের কোথা থেকেও হয়তো এই গ্রহে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে জীবের অণুর অন্যতম উপাদান শর্করা। তবে তা নিয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। পৃথিবীতে এসে পড়া উল্কা থেকেই প্রাণের জন্ম হয়েছিল কি না, এখনও পরীক্ষা করে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।