মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও ছবিটা অন্য রকম ছিল। কিন্তু রবিবার ইংল্যান্ডের কাছে হারের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ক্রিকেটের ছবিটা পুরো বদলে গিয়েছে। সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো, প্রধান কোচ ও বোলিং কোচকে সরিয়ে দেওয়া,নির্বাচকের ইস্তফা। সব মিলিয়ে ডামাডোল বাবর আজ়মদের ক্রিকেটে।
ইংল্যান্ডের কাছে পর পর দুই টেস্টে দুরমুশ হয়েছে পাকিস্তান। প্রথম টেস্টে ইনিংস ও ১০৩ রানে ও দ্বিতীয় টেস্টে ১৯৪ রানে হেরেছে তারা। শুধু হার নয়, অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে বাবরদের। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং— তিন বিভাগেই লজ্জার মুখে পড়েছে পাকিস্তান।
ব্যাপক রদবদল হয়েছে পাকিস্তান দলে। শুধু তরুণেরা নন, বাড়ি পাঠানো ক্রিকেটারদের মধ্যে অভিজ্ঞরাও রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য নাম মহম্মদ রিজ়ওয়ান ও সলমন আলি আঘা। রিজ়ওয়ান দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। সলমনও তা-ই। তাঁরা বাদে ইমাম উল হক, আলি উসমান, আমির জামাল, মুহম্মদ আওয়াইস জ়াফর ও খুর্রম শাহজ়াদকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড একটি বিবৃতিতে বলেছে, “পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড টেস্ট দল থেকে সাত ক্রিকেটারকে ছেড়ে দিয়েছে। তাঁদের পরিবর্তও ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে। পরিবর্তদের মধ্যে পাঁচ জন প্রথম বার টেস্ট দলে সুযোগ পেয়েছেন।” বোর্ড আরও বলেছে, “পরিবর্তদের মধ্যে সাইম আয়ুব আট ও আবদুল্লা ফজ়ল দুটো টেস্ট খেলেছেন। স্পিনার-অলরাউন্ডার আরাফাত মিনহাস পাকিস্তানের হয়ে তিনটে এক দিনের ম্যাচ ও চারটে টি-টোয়েন্টি খেলেছেন।”
এই তিন ক্রিকেটার বাদে মহম্মদ ইমরান জুনিয়র, সাদ বেগ, মহম্মদ ইমরান ও রাজ়াউল্লাকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। পাক বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, এবার তরুণদের উপর ভরসা করতে চাইছে তারা। তবে ইংল্যান্ডের পরিবেশে কোনও অভিজ্ঞতা না থাকা ক্রিকেটারেরা কী ভাবে মানিয়ে নেবেন, সেটাই দেখার।
ছাঁটাই করা হয়েছে টেস্ট দলের প্রধান কোচ সরফরাজ় আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকেও। সিরিজ় শেষে তাঁদের ছাঁটাইয়ের জল্পনা চললেও এক টেস্ট বাকি থাকতেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। পাকিস্তানের সাদা বলের প্রধান কোচ মাইক হেসন ও বোলিং কোচ অ্যাশলে নফকে তৃতীয় টেস্টে দায়িত্ব সামলাবেন।
তাঁকে অন্ধকারে রেখে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এই দাবিতে নির্বাচক কমিটি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন মিসবাহ উল হক। তিনি নিজে এই বিষয়ে মুখ না খুললেও পাক বোর্ডের এক সূত্র বলেছে, “হ্যাঁ, মিসবাহ পাক বোর্ডের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।” আপাতত নোটিস পিরিয়ডে ছিলেন মিসবাহ। তার মাঝেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ওই সূত্র জানিয়েছে, সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো বা তাঁদের পরিবর্ত ঘোষণার আগে মিসবাহের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। নির্বাচক কমিটির এক সদস্য হিসাবে এই বিষয় ভাল ভাবে নেননি তিনি। তাই সরে দাঁড়িয়েছেন মিসবাহ।
জোড়া হারের পর ঠিক কী কী গণ্ডগোল হল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ও দলে?
ক্রিকেটারেরা বাদ পড়ার খবর জানতে পারেন সমাজমাধ্যমে
ইংল্যান্ডের দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে তা আরও জটিল করেছে। যে সাত ক্রিকেটার বাদ পড়েছেন, তাঁরা হোটেলেই ছিলেন। হঠাৎ তাঁদের পরিবার ও বন্ধুরা সমাজমাধ্যমের কিছু পোস্টের স্ক্রিনশট তাঁদের পাঠান। সেখানেই তাঁরা জানতে পারেন যে বাদ পড়েছেন।
এই ঘটনায় চমকে গিয়েছেন ক্রিকেটারেরা। তাঁদের দাবি, বাদ দেওয়ার আগে অন্তত তাঁদের বলে দেওয়া উচিত ছিল। প্রত্যেকে পেশাদার ক্রিকেটার। জাতীয় দলের হয়ে খেলেন। সেখানে তাঁদের কিছু না জানিয়ে সমাজমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের অপমান করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন রিজ়ওয়ান, সলমনেরা।
আরও পড়ুন:
অধিনায়ক, কোচের সঙ্গে নেই যোগাযোগ
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমাজমাধ্যমে বাদ পড়ার খবর পেয়ে অনেকেই অধিনায়ক বাবর ও কোচ সরফরাজ়ের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু বাবর, সরফরাজ়ও জানতেন না, কী হতে চলেছে। দলের ম্যানেজমেন্ট তাঁদের কিছু জানায়নি। তাঁরা প্রথমে ভেবেছিলেন, ভুয়ো খবর। কিন্তু পরে বোঝেন, অধিনায়ক ও কোচের সঙ্গে আলোচনা না করেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে, দলরে অন্দরের পরিবেশ কতটা খারাপ।
ইমাম, রিজ়ওয়ানদের কেরিয়ার শেষের পথে
সাত ক্রিকেটারের মধ্যে সবচেয়ে চাপে রয়েছেন ইমাম ও রিজ়ওয়ান। ইমাম চোটের অজুহাত দেখিয়ে খেলতে চাননি বলে দাবি করেছেন অনেকে। অতীতেও এই ঘটনা ইমাম ঘটিয়েছেন। তাই তাঁর বিষয়ে তদন্ত হবে বলে জানা গিয়েছে। ইমাম আবার পাল্টা আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
রিজ়ওয়ানের বয়স হয়েছে। ফর্মও ভাল নেই। ফলে পাকিস্তানের সব ফরম্যাট থেকে তাঁকে ছেঁটে ফেলা হতে পারে। এবার তরুণদের দিকে তাকাতে শুরু করেছেন মহসিন নকভিরা। তাতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু যে ভাবে পুরো বিষয়টি হয়েছে, তাতে বিতর্ক বাড়ছে।